ট্রাম্পের ‘নীলনকশা’, কিউবা কি পারবে টিকে থাকতে

মার্কিন অবরোধের বিরুদ্ধ কিউবার নাগরিকদের প্রতিবাদফাইল ছবি

গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইওয়া অঙ্গরাজ্যে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোশমেজাজে দেখা দিলেন। তবে খোশমেজাজে থাকা ট্রাম্প কিউবার ‘স্বল্পমেয়াদি ভবিষ্যৎ’ নিয়ে বেশ গুরুতর ফরমান ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘কিউবা শিগগিরই ধ্বংসের মুখে পড়বে। কিউবা এমন একটি দেশ, যেটা সত্যিই ভেঙে পড়ার পথে।’

নিঃসন্দেহে কিউবার পতন নিয়ে ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী এবারই প্রথম নয়। ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬৭ বছর ধরে চেষ্টা করে আসছে। এর শুরু হয়েছিল ১৯৫৯ সালে কিউবার কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় থেকেই। এই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশটির নিষ্ঠুর ডানপন্থী স্বৈরশাসক ও মার্কিনদের বিশ্বস্ত বন্ধু ফুলজেনসিও বাতিস্তা উৎখাত হয়েছিল।

তবে এবার ট্রাম্পের হুমকিটা একটু বেশি গুরুত্ব বহন করছে। কেননা, গত মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর অপহরণ করেছে।

এই সম্পূর্ণ বেআইনি এবং উন্মাদের মতো কর্মকাণ্ডের জন্য এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে কোনোভাবে দায়ী করা হয়নি। মঙ্গলবার ট্রাম্প এ ঘটনাকেই কিউবার পতনের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘তাদের অর্থ এসেছে ভেনেজুয়েলা থেকে। তাদের তেল এসেছে ভেনেজুয়েলা থেকে। এখন আর তা তারা পাচ্ছে না।’

স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়েছিল, কিউবার স্বঘোষিত মিত্ররা অন্তত দ্বীপদেশটিকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্ষা করার কথা ঘোষণা দেবে কিংবা অন্তত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা জানাবে।

কিন্তু বাস্তবে কিউবা পেয়েছে শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক সমর্থনসূচক বক্তব্য। যেমন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম। তিনি তাঁর পূর্বসূরি বামপন্থী প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজ ওব্রাদরের মতোই, মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অভিনয় করেছেন, অথচ কার্যত সেই গ্রিঙ্গোদের (আমেরিকান ও ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের বিদ্রূপ করে স্প্যানিশ ভাষায় গ্রিঙ্গো বলা হয়) ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করছেন।

মেক্সিকো সম্প্রতি মার্কিন চাপে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর পর থেকে শেইনবাউম বারবার বলছেন, তেল সরবরাহ করার ব্যাপারটি ‘সার্বভৌম সিদ্ধান্ত’। একই সঙ্গে তিনি বলছেন, মেক্সিকো ‘কিউবার পাশে রয়েছে’।

এখন কিউবার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, কিউবার স্বঘোষিত বন্ধুরা তাদের ঘাড় সত্যিকার অর্থে সোজা রাখতে পারে কি না দেশটির ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ঠেকাতে।

সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোর নেতা এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর খুব কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে মানবিক কারণে কিউবাকে মেক্সিকো বছরের পর বছর ধরে তেল সরবরাহ করেছে, সেই ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কিউবায় বহু বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চলছে। এর ফলে সেখানে জিনিসপত্রের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আমি ২০২২ সালে কিউবায় গিয়ে বাস্তবে সেটাই দেখেছিলাম। সেটি ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ৬০তম বছর। কিউবায় কফি ও দুধের মতো মৌলিক জিনিসপত্রের ঘাটতি ছিল।

যে দেশ দশকের পর দশক ধরে বিনা মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবা, মানবিকতা এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিল, সেখানেই এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্যের অভাব দেখা দিচ্ছে। হাভানার সমুদ্রসৈকতের ওয়াকওয়েতে দৌড়াতে গিয়ে আমি পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলাম। ফার্মেসির কর্মীরা আমার রক্তমাখা হাঁটু দেখেও শুধু অনুতাপ জানিয়ে সাবান ও পানি দিয়ে সেটা পরিষ্কার করে আমাকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন।

ঠিক একই চিকিৎসার পরামর্শ আমাকে দিয়েছিলেন ৪৩ বছর বয়সী কিউবান এরাউডিস। তিনি সমুদ্রপারের প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখান থেকে আমার পড়ে যাওয়া দেখেছেন। সেই প্রাচীরের পাশে লিওনার্ড উডের একটি ফলক আছে। তিনি ছিলেন কিউবার সাবেক মার্কিন সামরিক গভর্নর। উড ১৯০১ সালে সমুদ্রপারের ওয়াকওয়ে নির্মাণ তদারক করেছিলেন। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের গভর্নর জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এরাউডিসের বাড়ি আসলে কিউবার গুয়ানতানামো প্রদেশে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনি কারাগার ও নির্যাতন কেন্দ্র রয়েছে। আর ১৯ বছর বয়সে মার্কিন ঘাঁটির বাইরে একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এরাউডিসের দুই পা দুই উড়ে গিয়েছিল।

তিনি আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন যে পা না থাকার কারণে আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারছেন না। পা পিছলে পড়ে যাওয়ায় আমি যেমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম, তিনি আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। নিঃসন্দেহে তাঁর এ কাজ মেক্সিকোর মানবিক সহায়তা দেওয়ার দাবির চেয়ে অনেক বড়  ‘মানবিক’ কাজ।

অবশ্য কেবল মেক্সিকোয় নয়, আরও অনেক দেশই প্রত্যাশামাফিক কিউবার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। যখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে কিউবাকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করছেন, তখন গোটা লাতিন আমেরিকা ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের বাকি দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মঙ্গলবার, ট্রাম্প যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসিখুশি অবস্থায় কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক সেই দিন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স অ্যাকাউন্টে কিউবার ওপর ‘অতিসত্বর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের’ আহ্বান জানায়।

চীন ঘোষণা করেছে, ‘কিউবাকে সমর্থন এবং সহায়তা অব্যাহত রাখবে’, পুনর্ব্যক্ত করেছে যে ‘কিউবার পার্টি ও সরকারের শক্তিশালী নেতৃত্বে কিউবান জনগণ এই সংকট অতিক্রম করবে।’ ভারতের কলকাতায়ও একটি অনুষ্ঠানে কিউবার প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এখন কিউবার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, কিউবার স্বঘোষিত বন্ধুরা তাদের ঘাড় সত্যিকার অর্থে সোজা রাখতে পারে কি না, দেশটির ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ঠেকাতে।

কিউবা যদি ধ্বংস হয়—এবং ট্রাম্প যদি সেখানে সরকার পরিবর্তন করতে সক্ষম হন—তাহলে এটা বলা যায়, পৃথিবীর কোনো দেশই সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা থেকে নিরাপদ নেই।

এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন, তা হলো কিউবার প্রতি প্রকৃত সহমর্মিতা। কারণ, কিউবা যদি ব্যর্থ হয়, তবে তা কেবল কিউবার নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ব্যর্থতা।

  • বেলেন ফার্নান্দেজ আল–জাজিরার কলাম লেখক

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত