এরদোয়ানের দীর্ঘ শাসনকালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অস্বীকার করা হয়েছে। এ সময়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর জনগণের অবিশ্বাস বেড়েছে এবং সমাজে মেরুকরণ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা এক্সসাইটসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশটির ৮২ শতাংশ মানুষ সংবাদমাধ্যমের খবর বিশ্বাস করে না। ১৮-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যেই অবিশ্বাসের হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করত, ‘সংবাদমাধ্যম অসৎ তথ্য দেয়।’

সংবাদমাধ্যমের এই মুখবন্ধ দশায় তুরস্কের জনগণ এখন সংবাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে ইউটিউব এখন একেবারে সামনের কাতারে চলে এসেছে। অনেক সাংবাদিকই সংবাদপত্র, টেলিভিশনের সাংবাদিকতা ছেড়ে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলছেন। সংবাদ উপস্থাপক নেভসিন মেনগু প্রাইমটাইম টেলিভিশন ছেড়ে যে ইউটিউব চ্যানেল খুলে অসামান্য সফলতা পেয়েছেন। তাঁর চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার এখন পাঁচ লাখের বেশি। এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে তুরস্কে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এখনো মরে যায়নি। এটা কেবল যাত্রা শুরু করেছে।

তুরস্কে এখন আইনসিদ্ধ সংবাদের ওপরও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এমনকি সেগুলো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত রোববার ইস্তাম্বুলে সন্ত্রাসী বোমা হামলার ঘটনায় তুরস্কের রেডিও ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এ সংবাদ সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা প্রচারে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে এ রকম নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে, সরকারি ভাষ্যের বাইরে যেন অন্য কোনো বয়ান তৈরি না হয়।

এরদোয়ানের একেপি দলের জন্য এটি মাথাব্যথার একটা কারণ। কম নিয়ন্ত্রণ ও বেশি স্বাধীনতা, ইন্টারনেটের ধরন এমনটাই। সে কারণে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজছিলেন এরদোয়ান। মিথ্যা তথ্য আইন (তুরস্কের অনেক বিশ্লেষক যেটিকে সেন্সরশিপ আইন বলছেন) এরদোয়ানের সেই প্রচেষ্টারই অংশ। দৃষ্টান্ত হিসাবে ৭৪১৮ নম্বর আইনের ৩৪ অনুচ্ছেদটির কথা ধরা যাক। এতে ফেসবুক, টুইটার ও গুগলের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর আগে, ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস (ইন্টারনেট প্রটোকল) দেওয়া ও না দেওয়ার ক্ষেত্রে বাছাইয়ের স্বাধীনতা ছিল প্ল্যাটফর্মগুলোর। কিন্তু নতুন আইনে তুরস্ক সরকারের হাতে এমন ক্ষমতা দেওয়া হলো যে এ ধরনের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে সরকার সেই সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দিতে পারবে।

সরকারের আবেদনে সাড়া দিতে এসব প্ল্যাটফর্ম যদি ব্যর্থ হয়, তবে বিজ্ঞাপনের থেকে রাজস্ব আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকি তুরস্কের কোনো কোম্পানি সেখানে বিজ্ঞাপন দিলে জরিমানা গুনতে হবে তাদের। এ আইনের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদ আরও বেশি ভয় উদ্রেক করে। কোনো ব্যক্তি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য শেয়ার করে, তাহলে তাকে তিন বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এর কোনোটিই নতুন কোনো ঘটনা নয়। এ ধরনের ঘটনায় তুরস্ক এরই মধ্যে অসংখ্য সাংবাদিক ও নাগরিকদের জেলে পাঠিয়েছে। ২০১৪ সালে গায়ক ও জনব্যক্তিত্ব আতিলা তাসকে একটি টুইটের জন্য সাজা দেওয়া হয়। তাঁর টুইট ছিল, ‘এডিসন যদি আজকের দিনে বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি আলোকবাতি (লাইট বাল্ব) আবিষ্কার করতে যেতেন না।’ এরদোয়ানের দল একেপির প্রতীক আলোকবাতি। বিষয়টি নিয়েই খোঁচা দিয়েছিলেন তাস। কিন্তু ফাতাউল্লাহ গুলেনের সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আছে, সেটার প্রমাণ হিসাবে এই টুইটকে বিবেচনা করা হয়েছে। তুরস্কের সরকার গুলেনের সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মনে করে।

তুরস্কে এখন আইনসিদ্ধ সংবাদের ওপরও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এমনকি সেগুলো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত রোববার ইস্তাম্বুলে সন্ত্রাসী বোমা হামলার ঘটনায় তুরস্কের রেডিও ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এ সংবাদ সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা প্রচারে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে এ রকম নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে, সরকারি ভাষ্যের বাইরে যেন অন্য কোনো বয়ান তৈরি না হয়।

কিন্তু সব প্রচেষ্টার পরও সেটা ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের কোনো ঘটনার সময়ে সংবাদমাধ্যম থেকে সেই খবর হাওয়া করে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, জনমনে অস্বস্তির জন্ম হওয়া। তাতে সরকারের প্রতি অবিশ্বাসটা আরও গাঢ় হবে।

গত দুই দশকে তুরস্কে সংবাদমাধ্যমের অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে ভুল সংবাদ ও গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য স্বাধীন সংস্থা গড়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। দরোলক পাইয়ে ও তিয়িত এ ধরনের দুটি সংস্থা। গত মাসে তিয়িত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ৫টি পত্রিকা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভুল তথ্য প্রচার করেছে। সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ইসলামি রক্ষণশীলদের পত্রিকা ইয়েনি একিত এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। পত্রিকাটি এ পর্যন্ত ১১৭টি ভুল সংবাদ প্রকাশ করেছে। একেপি-সমর্থিত পত্রিকা সাবাহ ৭৩টি মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

এরদোয়ান সরকার যখন স্বাধীন ব্লগার, অনলাইন সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য চড়াও হচ্ছে, তখন সরকার-সমর্থিত সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে একেপি রাজনৈতিক মতের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে চাইছে। নতুন এই আইন তারা করেছে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যেই।

এ ক্ষেত্রে তুরস্কের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। রিপাবলিকান পিপলস পার্টি আইনসভায় দ্বিতীয় বড় দল। তাদের ১৩৪ জন আইনপ্রণেতা থাকলেও ‘মিথ্যা তথ্যবিরোধী’ আইন পাসের সময় মাত্র ৪০ জন আইনসভায় উপস্থিত থেকে এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির ৫৬ জনের মধ্যে ১৫ জন উপস্থিত ছিলেন। একেপি বাক্‌স্বাধীনতার ওপর চড়াও হলে তার দায় বিরোধীদের ওপরও বর্তাবে।

গত দুই দশক সাংবাদিকদের জেলে পুরে, সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে এবং বাক্‌স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করে একেপির নেতারা এখন ভাবছেন, তাঁরা সংবাদও নিয়ন্ত্রণ করবেন। তুরস্কের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাতে যদি নির্বোধের মতো সম্মতি দিয়ে যেতেই থাকে, তাহলে খারাপের আর বাকি থাক কি?

  •  আলেকজান্দ্রা ডি ক্রেমার ইস্তাম্বুলের সাংবাদিক
    এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজে থেকে অনুবাদ মনোজ দে