যুদ্ধে রাশিয়ার সেনাদের তুলনায় ইউক্রেনের সেনারা কেন ভালো করছেন, সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এসব বিষয়ই বলে আসছে। চীনের বিশ্লেষকদের কণ্ঠে এখন সেই ব্যাখ্যার প্রতিধ্বনি শোনা গেল।

১৫ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সমরখন্দে সি চিন পিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান নিয়ে সি চিন পিং প্রশ্ন তোলেন, উদ্বেগও জানান। এরপর থেকেই চীনের সংবাদমাধ্যমের সুর বদলাতে শুরু করে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন চলাকালে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সেখানে তিনি বলেছেন, প্রতিটি দেশ প্রত্যাশা করে, তার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি যেন সম্মান দেখানো হয়।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহ চীনের সংবাদমাধ্যমে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর অভিযান নিয়ে ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল। রাশিয়ার সেনাবাহিনী খুব দ্রুত ও অনায়াস জয় পেতে চলেছে, এমন ধারণা তখন দেওয়া হতো। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর বিপর্যয় বাড়তে শুরু করলে মার্চ মাসের শেষ দিকে চীনের সংবাদমাধ্যম আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ইতিবাচক-নেতিবাচক, দুই ধরনের খবরই প্রকাশ করতে শুরু করে।

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক চিন ক্যান-রাং লিখেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি পুতিনকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে গোটা বিশ্বের জন্য তা হবে বড় বিপর্যয়। রাশিয়ার সেনা সমাবেশের সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, রাশিয়া যদি সেনা সমাবেশ করে এবং তাদের রিজার্ভ থেকে তিন লাখ সেনা ইউক্রেনে মোতায়েন করে, সেটা কেবল মস্কোর অধিকৃত এলাকায় প্রতিরক্ষা দিতে পারবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে নিরপেক্ষ অবস্থান দেখিয়েছে। প্রথম থেকেই বেইজিং বিবদমান পক্ষগুলোকে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। সমরখন্দে সি চিন পিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার বৈঠকের পর বেইজিং তাদের দেওয়া বিবৃতিতে দুই নেতার মধ্যে ইউক্রেন নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করা হয়নি।

কিন্তু রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, পুতিন বলেছেন, ‘ইউক্রেন সংকটে আমাদের চীনা বন্ধুদের ভারসাম্যমূলক অবস্থান’ উচ্চ প্রশংসার যোগ্য। পুতিন আরও বলেছেন, এ বিষয়ে চীনের প্রশ্ন ও উদ্বেগকে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে রাশিয়া।

এরপর ২১ সেপ্টেম্বর টেলিভিশন ভাষণে পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেন। মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি আছে—এমন দাবি করে তিনি বলেন, রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত। পুতিন জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি কিন্তু মোটেই বাখোয়াজি করছি না।’

এ সপ্তাহে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ায় যোগ দেবে কি না, সে প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ওই চার অঞ্চল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হয়ে যায়, তাহলে সেখানে কোনো আক্রমণ হলে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানো কিংবা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে পারবে ক্রেমলিন।

তবে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে বেশির ভাগ বিশ্লেষক পুতিন সত্যি সত্যি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত গ্লোবাল টাইমস পত্রিকার সাবেক প্রধান সম্পাদক হু চি চিন বলেছেন, এটা সত্য যে কৌশলগত বা জয়-পরাজয় নির্ধারক পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটালে যুদ্ধে রাশিয়া সুস্পষ্টভাবে সুবিধা পাবে।

কিন্তু তাতে পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি এবং বিশ্বশান্তির বারোটা বাজবে। চীনের এই প্রভাবশালী বিশ্লেষক লিখেছেন, ‘কার দোষ, সেটা বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ও রাশিয়া বিশ্বকে জীবন-মৃত্যুর মতো একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে না।’

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক চিন ক্যান-রাং লিখেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি পুতিনকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে গোটা বিশ্বের জন্য তা হবে বড় বিপর্যয়। রাশিয়ার সেনা সমাবেশের সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, রাশিয়া যদি সেনা সমাবেশ করে এবং তাদের রিজার্ভ থেকে তিন লাখ সেনা ইউক্রেনে মোতায়েন করে, সেটা কেবল মস্কোর অধিকৃত এলাকায় প্রতিরক্ষা দিতে পারবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

২০ সেপ্টেম্বর চীনের মূলধারার সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটে একটি নিবন্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। নিবন্ধটির শিরোনাম হলো, ‘এই যুদ্ধে মানুষ জেনেছে বিশ্বে রাশিয়ার মাত্র দুটি প্রকৃত বন্ধু আছে’। নিবন্ধটিতে রাশিয়া ফেডারেশন কাউন্সিল কমিটির পররাষ্ট্র বিষয়ে চেয়ার গ্রেগরি কারাজিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, রাশিয়ার এখন কেবল দুটি প্রকৃত বন্ধু—ইরান ও উত্তর কোরিয়া। ইরান কেবল রাশিয়ার কাছে ড্রোন বিক্রি করতে রাজি হয়েছে। আর উত্তর কোরিয়া রুশ নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে পুনর্গঠনের কাজে শ্রমিক পাঠাতে চেয়েছে।

চীনের সেই নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাশিয়া যে চীনকে ‘প্রকৃত বন্ধু’ বলেনি, সেটা ভালো একটা বিষয় হয়েছে। যদিও নিবন্ধটি পরে ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চীনের ইন্টারনেট ও সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কারণে এ ধরনের কোনো নিবন্ধ প্রকাশ হওয়া সত্যিই বিস্ময়ের।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • জেফ ফাও এশিয়া টাইমস–এর চীন বিষয়ে সম্পাদক