যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি কোনো শান্তিচুক্তি নয়। এমনকি শান্তিচুক্তির একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো বলেও একে ধরা যায় না। সমালোচকদের এক উচ্চকণ্ঠ অংশ দ্রুত এটিকে অপমানজনক বলে আখ্যা দিতে চেয়েছে। তাঁদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হয়েছে এবং তিনি এমন একটি দুর্বল চুক্তি করেছেন, যেখানে ইরান কৌশলে তাঁকে হারিয়ে দিয়েছে।
অনেকেই যেভাবে বিষয়টা দেখছেন, সেটা আসলে পুরো সত্য নয়। এই সমঝোতা অনেকটা মরীচিকার মতো। মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প প্রশাসন না বুঝেশুনে এই আলোচনায় যায়নি। তারা ভালো করেই জানত, ইরানের সরকার কী চায়, কীভাবে কাজ করে, আর তাদের সঙ্গে করা চুক্তির মূল্য কতটুকু। আলোচনায় থাকা কারোই এমন ধারণা ছিল না যে ইরান এমন প্রতিশ্রুতি মানবে, যা তাদের মূল লক্ষ্যকে আটকে দেয়।
তাই এই সমঝোতা কোনো স্থায়ী শান্তি আনার চেষ্টা নয়। এটা আসলে দুই পক্ষেরই বোঝাপড়া করে নেওয়া একটা বিরতি। এটি কিছুটা সময় নেওয়ার কৌশল। এখানে বিশ্বাসের জায়গা নেই, বরং দুপক্ষই নিজেদের দরকারে একটু সময় নিচ্ছে।
ইরানের অতীত আচরণের দিকে তাকালেই এ বিষয়টি বোঝা যাবে। এটি কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং নথিভুক্ত ইতিহাস। ইরান বহুবার চুক্তি করেছে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু যখনই সেই প্রতিশ্রুতি তাদের উদ্দেশ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখনই তা ভঙ্গ করেছে। এই ধারাবাহিকতা এতটাই স্পষ্ট যে এটি যেন একধরনের নীতিতে পরিণত হয়েছে। চাপের মুখে ইরান আলোচনা করে, চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় চুক্তি করে এবং বিপদ কেটে গেলে আবার আগের পথে ফিরে যায়।
২০১৫ সালের তথাকথিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি এ প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য হিসেবে একে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে এটি ছিল ইরানের জন্য একপ্রকার স্বস্তির বিরতি। এই সময়কে তারা নিজেদের সম্পদ সুসংহত করতে, মিত্রগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করতে এবং কৌশলগত কর্মসূচি এগিয়ে নিতে ব্যবহার করেছে। এই চুক্তি ইরানের আচরণ বদলায়নি; বরং তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাশ ও সম্পদ জুগিয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতি এসেছে। তাদের ধারণা, এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে কূটনৈতিক সুযোগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বরং এমন চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তাদের কাছে বিকল্প পথ না থাকে।
এই সমঝোতা ইরান সমস্যার সমাধান নয়, এবং সেটি হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। এর মেয়াদ শেষ হলে, অথবা ইরান মনে করলে যে এর প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তখন তারা আবার তাদের কর্মসূচি এগিয়ে নেবে। তাদের মিত্রগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হবে এবং হরমুজ প্রণালি আবারও উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
নতুন এ সমঝোতা ইরানের পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয় না। তাদের লক্ষ্য আগের মতোই—টিকে থাকা এবং বিস্তার ঘটানো। পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা কৌশল বদলায়। চাপ বাড়লে আলোচনা করে, চাপ কমলে আবার এগিয়ে যায়। তাদের আলোচকেরা প্রয়োজনীয় আশ্বাস দিতে প্রস্তুত—তা রক্ষা করার কোনো ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক। এটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; বরং এ ধরনের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে আলোচনার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রেই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে স্বচ্ছ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বারবার। কিন্তু বাস্তবে তারা পরিদর্শনে বাধা দিয়েছে, গোপন স্থাপনা তৈরি করেছে, প্রমাণ নষ্ট করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করেছে। এটি বিচ্ছিন্ন লঙ্ঘন নয়; বরং ধারাবাহিক প্রতারণা, যার লক্ষ্য একটিই—পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন।
যে দেশ কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করতে চায়, তার জন্য ব্যয়বহুল অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির প্রয়োজন পড়ে না। এই জ্বালানি অনেক কম খরচে এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি না করেই সহজেই অন্য দেশ থেকে কেনা যায়। তবু ইরান এই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে। কারণ, তাদের কাছে সমৃদ্ধকরণ কোনো মাধ্যম নয়; সেটিই মূল লক্ষ্য। তাদের শাসকগোষ্ঠী পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং এই লক্ষ্য সময়, ব্যক্তি বা পরিস্থিতির পরিবর্তনে বদলায়নি।
ইরানের এই লক্ষ্য আলোচনার মাধ্যমে বদলানো যাবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, ইরানের শাসকদের সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ধর্মীয় ও কৌশলগত বিশ্বাস, যা সাধারণ আলোচনার সীমার বাইরে।
তারা জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয় না। নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যে পড়েছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভেঙে পড়েছে, ওষুধ ও সুযোগ-সুবিধার অভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু এসবের কোনোটাই শাসকদের অবস্থান বদলায়নি।
অথচ চাইলে তারা পরিস্থিতি পাল্টাতে পারত। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করা—এসবই সম্ভব ছিল। বিনিময়ে যা দরকার ছিল, তা নাগালের বাইরে নয়: পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করা, আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন বন্ধ করা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা। কিন্তু তারা বারবার এই পথ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে বুঝতে হবে। এটিকে দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির প্রমাণ হিসেবে দেখা ভুল হবে। যারা সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর চাপ প্রয়োগ করেছে, তারা এই প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অজ্ঞ নয়।
ট্রাম্প এই বিরতিতে প্রবেশ করেছেন জেনেই যে ইরান প্রকৃতপক্ষে সীমাবদ্ধ করে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। তিনি এমন কোনো প্রত্যাশাও করছেন না। দুই পক্ষই সম্ভবত এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। ফলে ‘খারাপ চুক্তি’ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক।
যে চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না বলে আগেই ধরে নেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রতারিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এ সমঝোতা মূলত একটি কৌশলগত বিরতি—দুই পক্ষের জন্যই প্রয়োজনীয় সময়ের সুযোগ। ইরানের দরকার অর্থনৈতিক স্বস্তি। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং খালি কোষাগারের মধ্যে তারা সময় কিনতে চায়, শক্তি সঞ্চয় করতে চায় এবং অপেক্ষা করতে চায়।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের হাতে আর প্রায় আড়াই বছর সময় আছে। এই সময়টুকু টিকে থাকতে পারাই তাদের কাছে একধরনের সাফল্য।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ভিন্ন। হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে; পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের কাজ করছে। সাম্প্রতিক অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত বিকল্পগুলো প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে একটি বিরতি, যা তাদের পুনর্গঠনের সুযোগ দেয় এবং অনুকূল নয় এমন সময়ে সংঘর্ষ এড়ায়, সেটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং প্রস্তুতির অংশ।
ট্রাম্প বরাবরই ইরানকে একটি কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখেছেন এবং সেই হুমকি দূর করার বিষয়ে তার অবস্থান অপরিবর্তিত। এ সমঝোতা সেই অবস্থান বদলায়নি। এখন প্রশ্ন একটাই—ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্য ও দৃঢ়তা অতিক্রম করতে পারবে? অতীতে তারা এ চেষ্টা করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরের মতোই দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। অনেক দেশ ইরানকে থামানোর আহ্বান জানাবে, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেবে না। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমালোচনা করবে—তা সক্রিয় হোক বা নিষ্ক্রিয়।
ট্রাম্প এ বাস্তবতা বোঝেন। তাই তিনি জোটের ক্ষেত্রে সব সময় চান, অংশীদার দেশগুলো যেন নিজেদের দায়িত্বও পালন করে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে।
এই সমঝোতা ইরান সমস্যার সমাধান নয়, এবং সেটি হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। এর মেয়াদ শেষ হলে, অথবা ইরান মনে করলে যে এর প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তখন তারা আবার তাদের কর্মসূচি এগিয়ে নেবে। তাদের মিত্রগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হবে এবং হরমুজ প্রণালি আবারও উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
এ পরিস্থিতি সম্ভাবনা নয়; বরং প্রায় নিশ্চিত। একমাত্র প্রশ্ন হলো—সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা কতটা প্রস্তুত থাকবে।
আদোলফো ফ্রাঙ্কো একজন রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ, পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সাবেক মুখপাত্র।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ