বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার কি শুধুই প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশ বর্তমানে এক বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করে যে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কার শুধুই এক নিয়মতান্ত্রিকতা নয়; বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের নাগরিক ও নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও তীব্র প্রত্যাশা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে লিখেছেন আল মাসুদ হাসানউজ্জামান

রাজনৈতিক সংস্কার বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বহুল আলোচিত কিন্তু স্বল্প প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের খসড়া থেকে শুরু করে ’২৪-এর ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান এবং ’২৬-এর নির্বাচন ও দেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ গঠন পর্যন্ত রাজনৈতিক রূপান্তরের পর্যায়গুলোতে অর্থপূর্ণ সংস্কারের দাবি ক্রমাগতভাবে উত্থাপিত হয়েছে। তবে এ দেশে সংস্কারকে প্রায়ই সক্রিয় ও সমন্বিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়ামূলক ও খণ্ডিত রূপে দেখা গেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বারবার সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ সত্ত্বেও এই দেশ গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও কর্তৃত্ববাদী প্রত্যাবর্তনের এক চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্নটি আর এই নয় যে বাংলাদেশে ব্যাপকধর্মী সংস্কার প্রয়োজন কি না; বরং রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর কাছে তার প্রকৃত বাস্তবায়নের ইচ্ছা, শক্তি বা সক্ষমতা রয়েছে কি না। কাজেই এ দেশে সংস্কারসাধন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, চরম দলীয় মেরুকরণ ও বিভক্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও কাঠামোয় দৃশ্য ও অদৃশ্যমান অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে।

২.

পরিবর্তনশীল সমাজের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার বিশেষ গুরুত্ববহ। কারণ, সময়ের পরিক্রমায় সমাজের পরিবর্তন, নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও কাঠামোগত বিন্যাস সাধন জরুরি বলে বিবেচিত হয়। এভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সরকারকাঠামোর মধ্যে ঈপ্সিত ও পরিকল্পিত পরিবর্তনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, প্রতিনিধিত্ব ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন লক্ষে৵ পরিণত হয়, যাতে অন্তভু৴ক্ত হয় রাষ্ট্রীয়-প্রতিষ্ঠানগত নীতিমালা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির বিষয়, অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জনকল্যাণে রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিশ্চিতকরণ। সংস্কার প্রচেষ্টায় অবিচার ও বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য নিরসন, শ্রম অধিকার, লিঙ্গবৈষম্য হ্রাস ইত্যাদিও এজেন্ডাভুক্ত থাকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পাবলিক পলিসি ডিসকোর্সে ‘রাজনৈতিক সংস্কার’ প্রপঞ্চটি ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হলেও এটি বিতর্কিত ধারণা। সংস্কারের সংজ্ঞায়ন পরিসর, ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত, আদর্শিক অবস্থান এবং তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন রকম হয়। উদারবাদী, মার্ক্সবাদী, প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদী ও উত্তর উপনিবেশবাদী—গবেষকেরা রাজনৈতিক সংস্কারকে ভিন্নভাবে, যেমন আধুনিকায়ন, গণতন্ত্রীকরণ, শ্রেণি সমন্বয় বা রাষ্ট্রের পুনর্গঠন হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।

৩.

বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের পর থেকে রাজনৈতিক সংস্কারগুলো রাষ্ট্র গঠনের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যের প্রতিফলন ঘটায়। প্রাথমিক পর্যায়ে সংস্কারে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবাদী চেতনার প্রকাশ থাকলেও অন্যদিকে রাষ্ট্রকে সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে কেন্দ্রীকরণ একদলীয় কর্তৃত্ব, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এবং বহুত্ববাদ চর্চার দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করে। রাষ্ট্রের কাঠামোগত ভিত্তিও অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্দেশ করে এবং এমন এক কর্তৃত্ববাদমূলক শাসন চক্রের সূচনা করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রতিটি সরকার বা ‘রেজিম’ বিভিন্ন রূপে অনুসরণ করে এসেছে।

► এ দেশে সংস্কারকে প্রায়ই সক্রিয় ও সমন্বিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়ামূলক ও খণ্ডিত রূপে দেখা গেছে। সংস্কার আন্দোলন সত্ত্বেও এই দেশ গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও কর্তৃত্ববাদী প্রত্যাবর্তনের এক চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। ► গবেষকেরা রাজনৈতিক সংস্কারকে ভিন্নভাবে, যেমন আধুনিকায়ন, গণতন্ত্রীকরণ, শ্রেণি সমন্বয় বা রাষ্ট্রের পুনর্গঠন হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। ► লক্ষণীয় হলো, রাজনৈতিক দল ও পক্ষগুলো কতখানি আন্তরিকতার সঙ্গে উল্লিখিত সংস্কারগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে, তার ওপর।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৫-৯০ সময়ে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তির পুনঃসংজ্ঞায়ন ঘটে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও বর্ণিত সমাজতন্ত্রের স্থলে ধর্মভিত্তিক ও ভূখণ্ডগত জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করা হয়। এই আদর্শিক সংস্কারে মেরুকরণের ওপর নব৵ জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও সেই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক কাঠামোতে বেসামরিক আবরণ নির্মিত হয়, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘প্রিটোরিয়ান প্রাতিষ্ঠানিকায়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

একে নিয়ন্ত্রিত বহুত্ববাদের প্রক্রিয়ায় বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টা বলে। সংস্কারের ভাষ্য আবর্তিত হয় স্থিতিশীলতা, দক্ষতা এবং অংশগ্রহণ ও জনমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডভিত্তিক বয়ানে। গ্রামীণ সমাজে রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের জন্য ঘটে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কাঠামোগত সমন্বয় সাধন।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হয়। দীর্ঘ সময়ের প্রিটোরিয়ান শাসনের পর সংসদীয় কাঠামোয় প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ’৯১-পরবর্তী সময়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, মেরুকৃত রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বের সংস্কৃতি দ্বারা আবিষ্ট বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও রাজনৈতিক সংস্কার আনয়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হয়।

৪.

দেশের সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীসহ সংসদীয় কাঠামোতে সংস্কার, বৈশ্বিক নব্য উদারনৈতিক ধারায় সমন্বয়মূলক নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ইতিবাচক পথ নির্দেশ করে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও সংস্কার বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখলেও বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক শাসনকাঠামো আমলাতন্ত্রসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে রাজনীতিকরণ ঘটাতে থাকে।

নির্বাচনী সুশাসনের অভাবের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন বিরোধী পক্ষের কঠোর আন্দোলনের ফলে নির্বাচনী সংস্কার হিসেবে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬ সাল–পরবর্তী সরকারও প্রশাসনিক ও গর্ভন্যান্স সংস্কার আনয়নে ব্রতী হয়।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি দীর্ঘদিনের প্রান্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অভিযোগ সমাধানে গুরুত্ববাহী হলেও এর প্রকৃত বাস্তবায়ন অধরা থেকে যায়। ২০০১-০৬ সালের সংস্কারের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, অবকাঠামো নির্মাণ ও দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচি। এ সময়ের সংস্কার পথ অভিজাত প্রাধান্যমূলকই থাকে, যেখানে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, তবে সেগুলো খুব কমই দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা হয়।

৫.

এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংস্কারে রাজনৈতিক দলের আবশ্যিক নিবন্ধন, জবাবদিহি ইত্যাদিসহ বিচার বিভাগের পৃথক্​করণ জারি হয়। এ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকে। এ দীর্ঘ সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা নৈর্বাচনিক ব্যবস্থার ওপর জন-আস্থা বিনষ্টে ভূমিকা রাখে।

সরকার ব্যাপক অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ করে এবং ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার সংস্কার অনুসরণ করে। যদিও এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রের সক্ষমতা জোরদার করে এবং উন্নয়নমূলক লক্ষ৵ অর্জনে সহায়তা করে; তবু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যক্তিগতকরণ বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিতকরণ ও বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণের অভিযোগসহ পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের বৈধতা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এভাবে দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা চরম উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

৬.

’২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে জনদাবির প্রেক্ষাপটে সর্ব-অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারপ্রক্রিয়ার প্রচেষ্টা চলে। প্রধানত সংস্কার, বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচন—এই তিন লক্ষ্য নির্ধারিত হয়।

এভাবে গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সংস্কারপ্রক্রিয়া চালু করে। শুরু হয় বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং লক্ষ্য থাকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন ও নির্বাচনোত্তর বাস্তবায়ন পর্যায়।

সমান্তরালভাবে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, শ্রম ও নারীবিষয়ক এবং স্বাস্থ্য খাত-সম্পর্কিত সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশগুলোকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।

ওই সুপারিশ থেকে রাজনৈতিক সমঝোতা আনয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি অত্যাবশ্যক হওয়ায় আয়োজিত সিরিজ সংলাপে মতামত বিনিময় ঘটে। অবশেষে ২০২৫ সালে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণীত হয় এবং পরে তা কিছু ক্ষেত্রে মতবিরোধসহ ২৬টি দল দ্বারা স্বাক্ষরিত হয়; যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর একটি সুনির্দিষ্ট নকশা প্রদান করে।

সনদ বাস্তবায়নকল্পে একটি আদেশ জারি করা হয় এবং ২০২৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনে একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের (প্রায় ৭০ শতাংশ) অনুমোদন লাভ করে।

৭.

১৩তম জাতীয় সংসদ গঠনের পর সনদের আইনগত রূপান্তরে জটিলতা দেখা যায়। এতে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে।

সরকারি দল ধাপে ধাপে সনদের বাস্তবায়নের কথা বলে আর বিরোধী পক্ষ গণভোট অনুযায়ী জনগণের অভিপ্রায় মোতাবেক সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দাবি করতে থাকে। অর্জিত ঐকমত্যের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং নির্বাচন ও সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তিত হলে আগের সমঝোতা দুর্বলতর হয়ে পড়ে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয় না, ফলে এসব অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করা হয়।

সংসদে রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এসব অধ্যাদেশ আইনে রূপলাভ না হওয়ায় সচেতন মহল ও নাগরিকদের মধ্যে গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে জাতীয় সংসদে অনুমোদন বা অননুমোদন করা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই শেষে নতুন বিল আনার কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, জুলাই সনদ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনাসহ সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং একটি জাতীয় রোডম্যাপ বা পথরেখা নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারপ্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মোড় নির্দেশ করে। এতে দৃশ্যমান হয় যে দেশের সংকটময় মুহূর্তে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

কিন্তু স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতায় সেই অর্জিত ঐকমত্য ধরে রাখা রীতিমতো কঠিন। সংসদে সংস্কার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে অন্তর্নিহিত চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের সমস্যা।

৮.

বাংলাদেশ বর্তমানে এক বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করে যে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কার শুধুই এক নিয়মতান্ত্রিকতা নয়; বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের নাগরিক ও নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও তীব্র প্রত্যাশা।

লক্ষণীয় হলো, রাজনৈতিক দল ও পক্ষগুলো কতখানি আন্তরিকতার সঙ্গে উল্লিখিত সংস্কারগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে, তার ওপর। পরিশেষে বলা যায় যে অর্থবহ সংস্কার ছাড়া শুধু বাহ্যিক বা খণ্ডিত সংস্কার বাংলাদেশকে আবার কর্তৃত্ববাদী পথ অনুসরণের এক নতুন চক্রে নিয়ে যেতে পারে।

ড. আল মাসুদ হাসানউজ্জামান সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব