বার মাসে তেরো পার্বণের এই বাংলাদেশে আমাদের উৎসব লেগেই থাকে। উৎসব শুধু আমাদের আনন্দ দেয় না, এটি আমাদের অপ্রচলিত অর্থনীতির মূল চালিকা কিন্তু এই প্রায় ট্রিলিয়ন টাকার লেনদেনকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ চরমভাবে ব্যর্থ।। বর্তমান সরকার তার ইশতেহারের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি এবং ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণ করতে চাইলে এই খাতকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এই উৎসব অর্থনীতি যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারে।
ঈদুল ফিতর
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই বছর ঈদুল ফিতরকে ঘিরে বাজারের আকার ২ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। যদি তাই হয় শুধু পোশাক খাতেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিক্রি হবে। খুচরা পোশাক ব্যবসার প্রায় ৬০ শতাংশ বার্ষিক বিক্রি দুই ঈদকে কেন্দ্র করে সম্পন্ন হয়। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ মনে করেন, ‘সারা বছর যে পরিমাণ খাবার ও অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনা হয়, এর প্রায় ৪০ শতাংশ হয় ঈদের সময়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ আসে ঈদ উৎসবে।’
অর্থাৎ একটি মাস পুরো বছরের খুচরা অর্থনীতিকে টেনে নেয়। কিন্তু এই বিপুল চাহিদার কতটা দেশীয় উৎপাদনে ধরা পড়ে? কসমেটিকস, খেলনা, গিফট আইটেম, ইলেকট্রনিক্স, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজএ-সবের বড় অংশই আমদানি-নির্ভর। ফলে বাজার বড় হলেও শিল্পভিত্তি শক্ত হয় না। এখানে মুল সমস্যা আমাদের লজিস্টিকসের। কারন দেশে উৎপাদিত পোশাক অন্য দেশের থেকে খরচ বেশি পড়ে। সাথে আমাদের ক্রিয়েটিভিটি কম বলে আধুনিক ডিজাইনে পিছিয়ে। ভারতে 'মেক ইন ইন্ডিয়া' ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ঈদ ও দিওয়ালির মৌসুমে দেশীয় পণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও 'মেড ইন বাংলাদেশ' ব্র্যান্ডিংকে উৎসব মৌসুমের সাথে কৌশলগতভাবে যুক্ত করা দরকার।
ঈদুল আজহা
ঈদুল আজহায় পশু কেনাবেচা, পরিবহন, কসাইখরচ, ফ্রিজ-গৃহস্থালি সামগ্রী মিলিয়ে অর্থনৈতিক লেনদেন ১ ট্রিলিয়ন টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। গ্রামীণ অর্থনীতি এ সময় চাঙ্গা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হয়।
কিন্তু কোরবানির ঈদের সবচেয়ে বড় শিল্প-সুযোগটি কোথায়? চামড়া। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়। একসময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল বিলিয়ন ডলারের বেশি। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৮০০-৯০০ মিলিয়ন ডলারের ঘরে।
কোরবানির সময় সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার একটি অংশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ট্যানারি শিল্পাঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না হওয়ায় বহু আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশি চামড়া এড়িয়ে চলে। কারন আমাদের ট্যানারি গুলা সরিয়ে নিয়ে যেতে যেয়ে আর আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে পারছি না। সুযোগে পাশের দেশে পাচার হয়ে আমাদের চামড়াতে তারা সুযোগ নিচ্ছে। হাজার কোটি টাকার কাঁচা সম্পদ আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে রূপ নিতে পারে না।
চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভ্যালু অ্যাডেড জুতার বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারিনি। অথচ একই সময়ে ভিয়েতনাম জুতার রপ্তানিতে ২০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। পার্থক্যটি উৎপাদন সক্ষমতা, ব্র্যান্ডিং ও কমপ্লায়েন্সে।
জাকাত
উৎসব অর্থনীতির সাথে জাকাতকে একসাথে ভাবার কারণ আছে: রমজান-ঈদ মৌসুমে নগদ প্রবাহ ও দান-সাহায্য সর্বোচ্চ হয়। একটি একাডেমিক গবেষণায় ২০১৮ সালের ভিত্তিতে বাংলাদেশে সম্ভাব্য জাকাত প্রায় ৮৮৪ বিলিয়ন টাকা দেখানো হয়েছে যা জিডিপির ৩.৭৯ শতাংশ। অথচ বাস্তবে সংগঠিতভাবে সংগ্রহ হয় এর সামান্য একটি অংশ মাত্র। বাকিটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে বিতরণ হয়ে যায়, যার কোনো হিসাব থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মতে, প্রতিবছর ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা। এই বিশাল সম্ভাবনাকে আমরা শক্তি ব্যবহার করতে পারছি না, সচেতন পরিকল্পনার অভাবে। সরকারি জাকাত ফাউন্ডেশনে জাকাতের টাকা দিলে কর ছাড়ের সুযোগ থাকলে, ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের আস্থা না থাকাতে সবাই ব্যক্তি উদ্দ্যেগে জাকাত দেয়। ফলাফল, যে এই বছর ও জাকাত নিচ্ছে, সে আগামী বছর ও নিচ্ছে। দারিদ্র দূর হচ্ছে না শুধু মাত্র স্বচ্ছতা না থাকার জন্য। কিন্তু ঠিক মতো জাকাত ব্যবহার করতে পারলে হয়তো ৫ বছরের মধ্যে এই দেশে হয়তো জাকাত নেয়ার লোক খুজে পাওয়া যেত না।
দুর্গাপূজা
সারা দেশে ৩০ থেকে ৩৫ হাজারের উপর পুজামন্ডপ বসে। দুর্গাপুজাতেও আমাদের মোট বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। পুজা মন্ডপ, পোশাক, বিভিন্ন হস্ত শিল্প, মিষ্টান্ন দ্রব্য সহ বিভিন্ন ভাবে এই টাকা দেশের অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।
থিম-ডেকর, লাইটিং, ডিজাইন সামগ্রীর বড় অংশ আমদানি-নির্ভর। আমরা পূজা-ভিত্তিক ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারিনি। অথচ আমাদের কুমারপাড়ার মৃৎশিল্প, ঢাকির দল, আলোকসজ্জার কারিগররা আন্তর্জাতিক মানের কাজ করতে সক্ষম। শুধু প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পণ্যের নিবন্ধন।
পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাগুন, ভালোবাসা দিবস বা বড়দিন
লাল শাদা পোশাক, হস্তশিল্প, মেলা সব মিলিয়ে এই খাতের বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহে ফুলের বাজারে প্রতিদিন ৫০-৬০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে পহেলা ফাগুন, ভালোবাসা দিবস ও ভাষা দিবস উপলক্ষে। অথচ নেদারল্যান্ড ফুলকে রপ্তানি শিল্পে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশেও যদি কোল্ড-চেইন, গ্রেডিং ও রপ্তানি মান নিশ্চিত করা যেত, তবে ফুল শিল্প কয়েকশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারত।
সাথে লাল বা হলুদ বা সাদা, কাল রঙ্গের পোশাক তো আছেই। এই কয়দিনের মোট খরচ রেস্টুরেন্ট, গিফট সহ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার উপর। বড় দিনে ও উপহার, পোশাক, আলোক সজ্জা সহ একরকমই লেনদেন হয়।
বাংলাদেশের উৎসব অর্থনীতির সমস্যা মূলত চারটি: আমদানি নির্ভরতা, অপচয়, অসংগঠিত ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনেক পোশাক ভারত, পাকিস্তান বা চীন থেকে আমদানি। চামড়া সেক্টরে ঈদুল আজহায় বছরের ৫০-৬০ শতাংশ চামড়ার কাঁচামাল আসে, কিন্তু অপচয়ের কারণে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
দুর্গাপূজা বা পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবে হস্তশিল্প এবং স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু পর্যটনের অভাবে এর সম্ভাবনা সীমিত। জাকাতের টাকা দারিদ্র্য হ্রাসে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু বেশিরভাগ অসংগঠিতভাবে বিতরণ হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উৎসবের রাজনীতিকরণও এই অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
উৎসবের বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো প্রায় ৭-৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম নিম্ন। অর্থাৎ উৎসবের সময় লক্ষ কোটি টাকার কেনাকাটা হলেও তার খুব সামান্য অংশই কর-রাজস্বে প্রতিফলিত হয়।
আবার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। ফলে উৎসব অর্থনীতির বড় অংশ ব্যাংকিং ও ডিজিটাল চ্যানেলের বাইরে থেকে যায়। ফুটপাত বা ছোট দোকানগুলোতে যে লেনদেন হয়, তা ব্যাংকিং চ্যানেলে না আসায় সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায় না।
থাইল্যান্ডের সঙক্রান উৎসব বা ভারতের দিওয়ালি যেভাবে বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করে, আমাদের পহেলা বৈশাখ বা দুর্গাপূজাও সেভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু সুপরিকল্পিত ব্র্যান্ডিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
আমরা যদি এই সব বিবেচনাতে নিয়ে এই উৎসবের অর্থনীতিকে নিজেদের স্বনির্ভরতা এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে রুপান্তর করতে পারি, এই দেশের জিডিপি অন্তত ৪ শতাংশ বাড়ানো, এই খাতেই সম্ভব। চাহিদা আছে। নগদ প্রবাহ আছে। সামাজিক পুঁজি আছে। উৎসবের অর্থনীতি কেবল আনন্দের নয়, এটি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তিরও হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এখন দরকার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, ডিজিটাল ফরমালাইজেশনের মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনকে মূলধারায় আনা এবং সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
সুবাইল বিন আলম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশ রিসার্চ এনালাইসিস এবং ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক