নির্বাচনের আগে-পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেন জরুরি

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা ও নারী ইস্যুতে অগ্রহণযোগ্য বক্তব্যের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ২ ফেব্রুয়ারি

সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতায় বলেন, ‘আপনারা এই দেশ ছেড়ে যাইয়েন না, দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়, আরেক ভাই ঠিকমতো বাঁচতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হিন্দু আর মুসলমান, বাঙালির দুই হাত। একটা হাত চলে গেলে আরেকটা হাত ঠিকমতো কাজ করে না। যত দিন আমি আছি, যত দিন আমার বয়স আছে, আপনারা থাকেন।’ এই বক্তৃতার ভিডিওতে দেখা যায়, সামনে বসে থাকা এক হিন্দু বৃদ্ধ চোখ মুছছিলেন, কান্না আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন।

নির্বাচনী জনসভায় যখন একজন প্রার্থী এমন কথা বলেন, তখন এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সমাজে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় আছে, আশঙ্কা আছে। যদি ভয় না থাকে, তবে কাউকে তো এভাবে আশ্বস্ত করতে হয় না। এই ভয় শুধু আবেগ নয়, এর পেছনে অনেক স্তরের অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের সমাজে সংখ্যালঘুদের প্রতি নিত্যদিনের ছোট ছোট পৃথকীকরণ খুব সহজেই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

যেমন সম্প্রতি নামকরা এক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত এক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকটি পদে নিয়োগের জন্য ‘শুধুমাত্র পুরুষ’ ও ‘প্র্যাকটিসিং মুসলিম’ প্রার্থীদের আবেদন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একটি বড় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির চাকরিতে নারী ও অমুসলিম নাগরিকদের আবেদন করার সুযোগ না দেওয়া, এসব সাংবিধানিক নিশ্চয়তার সরাসরি বিরোধিতা করে।

আরেকটা উদাহরণ দেখি। বাংলাদেশের তিনটি বড় পত্রিকা একসঙ্গে প্রায় একই ভাষায় শিরোনাম করেছে, ‘ধামরাইয়ে স্বামীকে খুঁটিতে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ হিন্দু যুবকদের।’ খবরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, হিন্দু–অধ্যুষিত গ্রামে এক মুসলিম গৃহবধূ স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে হিন্দু যুবকদের দ্বারা রাতভর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু বাস্তব ঘটনা কী ছিল? দ্য ডিসেন্ট এ ঘটনায় সরেজমিনে অনুসন্ধান করেছে। তারা ‘ধামরাইয়ে “মুসলিম গৃহবধূ ধর্ষণের” খবর: সরেজমিনে যা জানা গেল’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এই প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, ধামরাইতে এ ধরনের কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি এবং প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সত্য নয়। কিন্তু যতক্ষণে এ খবর আমাদের কাছে এসেছে, ততক্ষণে ওই বিতর্কিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দুবিরোধী ক্যাম্পেইন চলেছে। ‘হিন্দু বাড়ি’, ‘মুসলিম গৃহবধূ’ শব্দগুলো দিয়ে পত্রিকার প্রতিবেদন সস্তা সাম্প্রদায়িক ফ্রেম ব্যবহার করেছে। এ ধরনের ফ্রেমিংয়ের জন্য আমাদের পত্রিকাকে তেমন কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।

আরও পড়ুন

ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসের উদাহরণ দেখি। দীপু চন্দ্র এক তরুণ পোশাকশ্রমিক, যাঁকে ‘নবী অবমাননা’র অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে তাঁর মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের তদন্তের বেরিয়ে এসেছে, দীপু ‘নবীকে গালাগাল করেছেন’, এ রকম কোনো প্রমাণ নেই। এ ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ডিসেন্ট, ‘শাতিম হত্যায় উসকানি: কী বলছেন আলেমরা’ শিরোনামে। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে দীপুর হত্যাকে অনলাইনে ‘শাতিমে রাসুলের বিচার’ হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়েছে; কেউ কেউ ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ভবিষ্যতে এভাবেই বিচার করা হবে।

এসব ঘটনা কি খুব বিচ্ছিন্ন কিছু? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি প্রচারণা মেলালে আমরা বুঝতে পারব, এগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ‘টিএমডি’ বা ‘টোটাল মালাউন ডেথ’ শিরোনামে এক ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খুব ধীরে ধীরে এই ক্যাম্পেইন বড় হচ্ছে, যেখানে সরাসরি ‘মালাউনদের খতম করা’র কথা বলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দুদের টার্গেট করে অনেক সময় ভুল তথ্য ও মিথ্যা গল্প দিয়ে ধর্মীয় ঘৃণা প্রচার করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের সপ্তাহে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এক খোলাচিঠিতে জানায়, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৫২টি জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর ২০৫টি হামলা, নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। যদিও সরকার এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছে এবং এই সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করেছে।

একদিকে সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলোর এ ধরনের পরিসংখ্যান, অন্যদিকে সরকারঘনিষ্ঠ ফ্যাক্ট চেকিং বডির পাল্টা দাবি, তার সঙ্গে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা আর বাংলাদেশের ভেতরের ‘সবই মিথ্যা’ বয়ানের লড়াই, এই পুরো ছবিটা আসলে একটা জিনিসই দেখায়, সংখ্যালঘুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপে আমাদের মধ্যে গভীর অস্বস্তি আছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এই আলাপ এড়িয়ে যাই।

বিবিসি বাংলার ফ্যাক্ট চেকের ওপর ভিত্তি করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অনেক ছবি, ভিডিও, স্ট্যাটাস, যা হিন্দু নির্যাতনের কথা বলেছে, তার অনেকগুলোই আসলেই ভুয়া। আবার অনেক ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল, ধর্মীয় কারণ মুখ্য ছিল না। এসব দুর্বলতার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের সরকারি বয়ানে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাসংকটের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। একদিকে সরকার আর তার ঘনিষ্ঠ মহল বলেছে, এসব হামলার বড় অংশ ‘কমিউনাল নয়, রাজনৈতিক’, অথবা ‘অতিরঞ্জিত’। আবার আরেক দল বলেছে, ‘সবই ভারতীয় ভুয়া খবর’।

সরকারি ভাষায় এখানে বার্তা স্পষ্ট, ‘আপনারা যে প্রতিটি হামলাকে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বলে দেখাচ্ছেন, আমরা তা মানি না।’ আবার ঐক্য পরিষদ ও অন্য সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর ভাষায় আরেকটা বার্তা, ‘হামলা যে হয়েছে, সেটা অস্বীকার করবেন না। কারণ, মানুষ বাস্তবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, রাতে মন্দির পাহারা দিয়েছে, চাকরি হারিয়েছে।’

একদিকে সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলোর এ ধরনের পরিসংখ্যান, অন্যদিকে সরকারঘনিষ্ঠ ফ্যাক্ট চেকিং বডির পাল্টা দাবি, তার সঙ্গে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা আর বাংলাদেশের ভেতরের ‘সবই মিথ্যা’ বয়ানের লড়াই, এই পুরো ছবিটা আসলে একটা জিনিসই দেখায়, সংখ্যালঘুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপে আমাদের মধ্যে গভীর অস্বস্তি আছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এই আলাপ এড়িয়ে যাই।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে একাধিক নির্বাচনের আগে-পরে আমরা সহিংসতা দেখেছি। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুবিরোধী সহিংসতা হয়েছে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের রায়ের পর মন্দির-বাড়িঘরের ওপর আক্রমণ হয়েছে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের পর নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে, ২০১৬ সালে নাসিরনগরের সহিংসতা এবং ২০২১ সালে দুর্গাপূজার সময় সহিংসতা হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যে ফজলুর রহমানের নির্বাচনী ভাষণকে যদি আবার দেখি, তাহলে এটা স্পষ্ট হয় যে তিনি আসলে সংখ্যালঘুদের ভয়কে অ্যাড্রেস করার চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রকে এই ভয় বিবেচনা করতে হবে, আমরা যেন আমাদের সহনাগরিকদের প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতাকে এড়িয়ে না যাই। পূর্বের ইতিহাস বিবেচনা করে নির্বাচনের পূর্বে ও পরে অবশ্যই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

  • আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। ই-মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব