পুরোনো মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরানো কেন

বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটা একটা ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে। ১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি মালিকানার ব্যাংকের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১।

ওয়াকিবহাল মহল বহুদিন ধরে বলে চলেছে যে দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো অনেকগুলো বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার আমলে।

হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারন’ এ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি-লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছিল। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বারবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও এমন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে হাসিনাকে নিবৃত্ত করা যায়নি।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তাঁরা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে দেদার ঋণ নিতে পারেন।

এভাবে তাঁরা বাংলাদেশের মোট ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে ফেলেছেন। দেশের খেলাপি ব্যাংকঋণের প্রায় ৮২ শতাংশ তাঁদের কাছে আটকে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাঁদের সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রবার ব্যারনদের’ বাংলাদেশি সংস্করণ হিসেবে আখ্যায়িত করা সমীচীন না হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন শাসক মহলের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর ২০১৮ সালের এক জরিপ মোতাবেক বিশ্বের মধ্যে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের উত্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অন্যতম চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে দিয়েছে এ দেশের ৩৫৫ জন কোটিপতি ধনাঢ্য ব্যক্তি। আমার মতে, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ব্যাংকঋণ লুণ্ঠন।

আরও পড়ুন

এ দেশের একটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ প্রদান করা হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। হাসিনার আমলে আরেকজন ব্যবসায়ী এস আলমকে দেশের সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর জন্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের ‘সুয়োমোটো’ রুলকে সুপ্রিম কোর্টের ‘চেম্বার জজের’ আদেশে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

শেখ হাসিনার আত্মীয়স্বজন বেশ কয়েকটি ব্যাংকের মালিক হয়ে গেলেও তাঁরা কীভাবে মালিক হওয়ার শর্ত ন্যূনতম ২০ কোটি টাকা জমা দিয়েছিলেন, তার হদিস মেলেনি। হয়তো অন্য ব্যবসায়ী ব্যাংক-পরিচালকেরা এই আত্মীয়দের পক্ষে দেনা টাকা শোধ করে দিয়েছেন! হাসিনার আমলে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে ব্যাংক-মালিক ও পরিচালকদের এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মেয়াদ বাড়ানো ‘কালচারে’ পরিণত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এ দেশে অনায়াসে কোটিপতি হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ব্যাংক মালিকানা ও পরিচালক হওয়ার সুযোগ।

২০০৯-২০২৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত, যার ফলে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। এই ১১টি ব্যাংকের মধ্যে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন সাতটি ব্যাংক—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ্‌ইসলামী ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সম্প্রতি লুটে নেওয়া পাঁচটি ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে একীভূত করে একটি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ চালু করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে অধিকাংশই দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানত জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ছিল। ওই সময় ওটা ছিল দেশের প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৃহত্তম ব্যাংক। দেশে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্সপ্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ রকম একটা শক্তিশালী ব্যাংককে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় স্বৈরশাসক হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও মদদে।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাত বছরে এস আলম বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক থেকে লুট করে নিয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। এস আলম তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। এস আলমেরই ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয় পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আরও পড়ুন

সম্প্রতি লুটে নেওয়া পাঁচটি ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে একীভূত করে একটি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ চালু করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে অধিকাংশই দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর গত পৌনে দুই বছরে অর্থনীতিবিদদের কাছে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়ে চলেছে যে স্বৈরশাসক হিসেবে ক্ষমতা না হারালেও ‘অর্থনৈতিক মেল্টডাউন’–এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারতেন না হাসিনা। এদিক থেকে দেখলে আমাদের আরেকটি শ্রীলঙ্কা হওয়ার লজ্জা থেকে রেহাই পাওয়া গেছে বৈকি। কিন্তু বিদেশে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ আদৌ দেশে ফেরত আনা যাবে কি না, তা নিয়ে বড় সন্দেহ রয়েছে।

আরও পড়ুন

বর্তমান সরকার হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের পথ ধরে রপ্তানি আয় এবং ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্সপ্রবাহের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনকে থামিয়ে রাখতে সক্ষম হবে, কিন্তু কয়েক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পুঁজি-পাচারকারীদের মাধ্যমে যে হারিয়ে গেল, সেটা জাতি কখনোই ফিরে পাবে না। বরং হাসিনা সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ সরকার যে ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে, তার বেশির ভাগই যেহেতু পাচার হয়ে গেছে, তাই এই পাচারকৃত অর্থের মাধ্যমে হাসিনা, তাঁর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন, কয়েকজন অলিগার্ক ব্যবসায়ী এবং কয়েক হাজার অর্থ পাচারকারী তাঁদের বাকি জীবন বিদেশে আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিতে পারবেন!

আরও পড়ুন

এখন বিএনপি সরকার ব্যাংকগুলোর মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে এসব পুঁজি পাচারকারীর জীবনকে আবারও রমরমা অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিচ্ছে। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথ ধরতে যাচ্ছে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের ৩১ শতাংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের ব্যাপারে যে বর্তমান সরকার মনোযোগী হবে না, তারই সংকেত কি পাওয়া গেল ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিক চক্রের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে?

  • মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব