ওরা কেন ভোট দিতে পারে না

নির্বাচনের দিন বেলা ১১ টায় কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনজন দিনমজুরপ্রথম আলো

সারা দেশে ভোট চলছে। বহু প্রতীক্ষা, বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই ভোট। বহু বছর পর মানুষ নিজেদের হাতে রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছে। বহু বছর পর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে ভোটাধিকার। এ ঘটনা নিঃসন্দেহে আনন্দের। এই আনন্দ নিয়ে সকাল সকাল বের হয়েছিলাম ভোট দিতে। ঢাকার প্রায় ৮৫ লাখ ভোটারের মধ্যে আমিও একজন। আনন্দের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে একটা শঙ্কাও সামনে এল। ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা আমরা অর্জন করলাম, কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা সক্ষম হলাম কতটা?

এই শঙ্কার বার্তাবাহক ছিলেন একজন রিকশাচালক। তাঁর নাম হাসিব ইসলাম। হাসিবের রিকশায় চড়ে মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। একা রিকশায় চড়লে পুরোনো অভ্যাসবশত রিকশাচালকদের সঙ্গে গল্প করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছাই। এতে প্রথমত সময়টা ভালো কাটে। দ্বিতীয়ত, রিকশাচালকদের কথায় দেশ ও জাতি নিয়ে এমন অনেক গল্প উঠে আসে, যা সাংবাদিকতার ফ্রেমে সাধারণত আঁটে না। ক্যামেরার লেন্সে যা সাধারণত ধরা পড়ে না।

হাসিবও এ বিষয়ে হতাশ করেননি। তাঁর বয়স ২৮। বসতভিটা কুড়িগ্রামের উলিপুরে। ঢাকার মিরপুরে স্ত্রী ও তিনি থাকেন। স্ত্রী পোশাকশ্রমিক। তিনি বা তাঁর স্ত্রী ভোট দিতে যেতে পারেননি।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভোট দিতে কেন গেলেন না? হাসিব জানালেন, ঢাকা থেকে ভোট দিতে যাওয়া–আসা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচের বিষয়। তাঁর পরিবারের এই খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। ভোট দিতে না যেতে পারা নিয়ে তাঁর ভেতরে আফসোস আছে। কারণ, হাসিবের মতে, এর আগের দুটি নির্বাচনে আরও লাখ লাখ মানুষের মতো তিনিও ভোট দিতে পারেননি।

গতকাল বুধবার দেশের নানান জায়গায় ভোটারদের মধ্যে নগদ অর্থ বিলি করার অভিযোগে রাজনৈতিক দলগুলোর বহু কর্মী আটক হয়েছেন। জনরোষের কবলে পড়েছেন অনেক স্থানীয় নেতা। হাসিবকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, কোনো প্রার্থী ভোট দিতে যেতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না? আর্থিক দুরবস্থার বিষয়টা বিবেচনা করতে চেয়েছেন কি না? এই ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত হাসিব খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। সম্ভবত আমি অজান্তেই তাঁর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে ফেলেছিলাম।

হাসিব দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘কেউ টাকা সাধলেই কি টাকা নিতাম? সামর্থ্য থাকলে নিজের পয়সা খরচ করেই ভোট দিতে যাইতাম। কারও কথায় ভোট দিতে কেন যাব, টাকা কেন নেব?

হাসিবের মতে, নির্বাচন কমিশন বা ভোট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর মতো দরিদ্র ও ভোটকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে থাকা ভোটার বিষয়টি কখনোই বিবেচনায় রাখেননি। তিনি জানেন, প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সুযোগ যদি দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষও পেতেন, তাহলে ভোটের পরিবেশ ও ভোটের সংখ্যা—দুটিই আরও উৎসবমুখর হতে পারত। হাসিব আশাবাদী, নির্বাচিত সরকার পরবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁদের কথা অবশ্যই বিবেচনা করবে।

সামর্থ্যের কাছে সীমাবন্ধ এই দুর্দশার চিত্র কেবল হাসিবের নয়। বাসা থেকে অফিসে আসার পথে নিম্নবিত্তের ৯ জন মানুষের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁরা প্রত্যেকেই ভোটার। কিন্তু ভোট প্রয়োগ করার সক্ষমতা থেকে এখনো অনেক দূরে। হাসিবের রিকশা থেকে নেমে যখন মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে দাঁড়ালাম, সেখানে উৎসবের আমেজ চলছে। স্কুলটি ঢাকা–১৫ আসনের নারীদের অন্যতম বড় ভোটকেন্দ্র।

স্কুলের একটু দূরেই নিজের ফ্লাস্ক আর বিস্কুটের ঝুড়ি নিয়ে ব্যস্ততার ভেতর ছিলেন রবিউল ইসলাম। ৪০ বছর বয়সী রবিউল ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ হলেও কর্মসংস্থানের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের যে বিশাল স্রোত তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভৌগোলিক বিন্যাসের সমন্বয় হয়নি। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় লাখ লাখ মানুষ কাজের প্রয়োজনে বসবাস করছেন, কিন্তু তাঁদের ভোটার এলাকা রয়ে গেছে নিজ নিজ জেলায়। ফলে ভোট দেওয়া তাঁদের কাছে রাজনৈতিক অধিকার নয়, অর্থনৈতিক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০ বছর ধরে ঢাকায় থাকলেও ভোটার এলাকা বদল করা হয়নি। প্লাস্টিকের কাপে চা ঢালতে ঢালতে রবিউল আক্ষেপ করে বললেন, ‘ভাই, দোকানের সামনে দিয়ে মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে, এটা দেখে কলিজাটা হু হু করে। আমার এলাকা হলে তো আজ আমি কোনো লাইনের ধার ধরতাম না, বুক ফুলায়া গিয়া সিল মারতাম। কিন্তু আমার এলাকা তো ভাই অনেক দূরে। মা-বউ আছে গ্রামে। যাইতে–আসতে কমপক্ষে তিন হাজার টাকা। এক দিন চা বিক্রি না করলে পরের দিন ঘরে চাল ওঠে না। আমি কি তিন হাজার টাকা খরচ কইরা ভোট দিতে যাওয়ার শখ–আহ্লাদ করতে পারি?’

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে মেট্রো স্টেশনের নিচে দেখা মিলল ষাটোর্ধ্ব মোজাম্মেল মিয়ার। একটি ভ্যানে শুয়ে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটালাম।

মোজাম্মেল মিয়ার ভোট নীলফামারীতে। শেষবার ২০০৮ সালে তিনি ভোট দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের অনভ্যাস আর সক্ষমতার অভাবে এবারও তিনি ঢাকায় থেকে গেছেন পেটের দায়ে।

মোজাম্মেল মিয়া খুব শান্ত, কিন্তু কঠোর ভাষায় বললেন, ‘ভোট দিতে কার না মন চায়, বাজান? ভোট দিতে পারা মানে নিজেরে দেশের মানুষ মনে হওয়া। আমরা তো কুলি-মজুর। আমরা কাজ করলে খাই, না করলে উপাস থাকি। আমগো মতো মাইনষের ভোট তো শুধু আঙুলের ছাপ না, এটা হইলো কয় দিনের কামাইয়ের লগে লড়াই।'

রাজধানীর মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একটি পুরুষ কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছেন এই ব্যক্তি। ছবিটি সকাল সোয়া আটটার দিকে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

'আমার নীলফামারী যাইতে-আসতে যে ট্যাকা খরচ হয়, হেইডা দিয়া আমি ১৫ দিনের চাউল কিনতে পারি। তাইলে বোঝেন, পেটের ক্ষুধার সাথে ভোটের লড়াইটা কেমন! আমার একটা বাড়তি টাকার নোটও।’

যখন প্রশ্নটা উঠল, আসলে সমাধানের পথ কী হতে পারত? তিনি একটু নড়েচড়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সরকার তো কত কামই করে। গরিব মাইনষের বেলা কোনো একটা ব্যবস্থা কি হইতে পারত না? মনে করেন, যারা এমন বহু দূরে থাকে আর কাম কইরা খায়, সরকার যদি বিশেষ দিনগুলোয় আমগো যাতায়াত বা আসা-যাওয়ার একটা সুযোগ কইরা দিত; তাইলে দেখতেন এই দিনমজুর, কুলি-মজুরে নীলফামারী, রংপুর সব ভরে গেছে। যদি আমগো আনা-নেওয়ার কোনো ইনতেজাম থাকত, তাইলে আজ আমি নীলফামারীর কেন্দ্রে গিয়া হাসিমুখে সিলটা দিতাম।’

সংকটের এই মেঘ কেবল দিনমজুরবর্গের ওপরেই নয়, সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণের এই দিন নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বহু বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, অনিশ্চয়তা আর আত্মত্যাগের পর নাগরিকেরা আবারও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু মাঠে ঘুরে, ভোটকেন্দ্রের বাইরের বাস্তবতা দেখে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেই কি ভোট প্রয়োগের সক্ষমতাও নিশ্চিত হয়?

হাসিব, রবিউল, মোজাম্মেলদের কণ্ঠে যে বঞ্চনার সুর শোনা গেল, তা কেবল আর্থিক অক্ষমতার বিবরণ নয়, এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দলিল। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ হলেও কর্মসংস্থানের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের যে বিশাল স্রোত তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভৌগোলিক বিন্যাসের সমন্বয় হয়নি। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় লাখ লাখ মানুষ কাজের প্রয়োজনে বসবাস করছেন, কিন্তু তাঁদের ভোটার এলাকা রয়ে গেছে নিজ নিজ জেলায়। ফলে ভোট দেওয়া তাঁদের কাছে রাজনৈতিক অধিকার নয়, অর্থনৈতিক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভোট দেওয়ার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন তরুণ ভোটারেরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্র থেকে তোলা

নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ডাকযোগে ভোটের সুযোগ দিয়েছে, যা প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত শ্রমশক্তির জন্য কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র নির্বাচন, কর্মস্থলভিত্তিক বিশেষ ভোট, আগাম ভোট বা পোস্টাল ব্যালটের মতো পদ্ধতি নিয়ে এখনো কার্যকর আলোচনা শুরু হয়নি।

তবে সংকট শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী, কারখানার তদারকি কর্মী, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্স, সংবাদকর্মী, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতের জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা আজ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। কেউ রাতভর ডিউটিতে, কেউ মাঠে রিপোর্টিংয়ে, কেউ জরুরি অস্ত্রোপচারে। রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে তাঁরা ভোটের দিনটিকে ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে পেশাগত দায়বদ্ধতার কাছে সমর্পণ করেছেন। এই আত্মত্যাগের কোনো পরিসংখ্যান নেই, কোনো আলাদা তালিকাও নেই।

এখানে একটি নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। রাষ্ট্র কি শুধু ভোট গ্রহণের দিনকে সফল করতে চায়, নাকি প্রত্যেক নাগরিককে ভোট প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়? কতজন ভোট দিতে চেয়েও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় পারেননি, সে অদৃশ্য সংখ্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র শ্রমিকের জন্য তিন হাজার টাকা মানে পনেরো দিনের খাদ্যনিরাপত্তা। জরুরি পেশার কর্মীর জন্য ভোটের দিন মানে পেশাগত দায়িত্বে অবিচল থাকা। এ দুই বাস্তবতাই গণতন্ত্রের নীরব আত্মত্যাগের অংশ।

আরও পড়ুন

নিশ্চয়ই এ সমস্যার সমাধান অদূর ভবিষ্যতের জন্য অসম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর রিমোট ভোটিং, আগাম ভোটের সুযোগ, কর্মস্থলভিত্তিক অস্থায়ী কেন্দ্র, আন্তজেলা ভোটার স্থানান্তরের সহজ প্রক্রিয়া কিংবা বিশেষ যাতায়াতের সুবিধা নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এসব উদ্যোগ শুধু ভোটের হার বাড়াবে না; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে আরও আস্থাভিত্তিক করবে।

যে মানুষগুলো নিজেদের সামর্থ্য, সময় ও শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রকে সচল রাখছেন, অথচ ভোটের দিনে লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না, তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র কীভাবে করবে? নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিৎ এই অদৃশ্য নাগরিকদের দৃশ্যমান করা। রাষ্ট্র যদি প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই বহু প্রতীক্ষিত ভোট সত্যিকার অর্থে জনতার হবে।

নয়তো ভোটের উৎসবে লাখো নাগরিকের মনের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার কয়েকটির লাইন—

‘আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ,

নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান ভেজা চোখ,

আমাকে গ্রহন কর।’

  • সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

    ই-মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব