পশ্চিমাদের চোখে ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ইসরায়েলি গোয়েন্দা মহলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো গভীরভাবে পড়লে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। ইরানের অভ্যন্তরে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার এখনই পতনের দিকেও যাচ্ছে না।
এই মাঝামাঝি অবস্থা তেহরানকে একটি নিরাপত্তা ধূসর বা ‘গ্রে সিকিউরিটি’ অঞ্চলে নিয়ে পরিণত করেছে। এর ফলে ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের হিসাবি দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সেই দ্বিধাই ইরানের জন্য পরিণত হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে। সেই সম্পদ হলো সময়।
ইরানের রাজপথের অস্থিরতা কেন শাসকের সময়কেন্দ্রিক রাজনীতির পক্ষে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে তেল আবিবের দৃষ্টিকোণ থেকে হুমকির যুক্তি নতুন করে পড়তে হবে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ২০২৫ সালে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ইরান যেন আগের অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি, কারণ এতে ইরান চুক্তিহীন অবস্থার ছায়া এবং কম নজরদারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে।
তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এক জটিল কৌশলগত সংকটে পড়েছেন। তারা যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আবার আক্রমণ না করলে ইরান এই অবকাশকে ব্যবহার করে নিজেকে পুনর্গঠনের সময় পায়।
প্রচলিত সামরিক যুক্তি অনুযায়ী, এমন হুমকির জবাব হওয়া উচিত আগাম হামলা অথবা অন্তত সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ, যাতে প্রতিপক্ষ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে ইনস্টিটিউটটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে ইরানের শাসনব্যবস্থার বৈধতা কমে গেলেও ক্ষমতাকাঠামো এখনো অটুট রয়েছে।
ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তেহরানের রাজপথের বাস্তবতা বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, অসন্তোষ থাকলেও এসব বিক্ষোভের এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব নেই এবং তাৎক্ষণিকভাবে সরকার উৎখাত করার সক্ষমতাও তৈরি হয়নি।
আট বছরব্যাপী ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বড় ধরনের বিদেশি হামলা জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে পারে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সতর্ক করে বলেছে, একটি সামরিক হামলা বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে। বিভাজন আরও গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন যেকোনো ভিন্নমতকে চিহ্নিত করে দমন করার অজুহাত পাবে।
ফলে তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এক জটিল কৌশলগত সংকটে পড়েছেন। তারা যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আবার আক্রমণ না করলে ইরান এই অবকাশকে ব্যবহার করে নিজেকে পুনর্গঠনের সময় পায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৌশলের ভেতরে কেবল টিকে থাকার চেয়েও শক্তিশালী একটি গোপন লক্ষ্য লুকিয়ে আছে। নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিশৃঙ্খলা বজায় রেখে তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজের কাঁধ থেকে তেল আবিবের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ সতর্ক ও উদ্যোগী অবস্থানে, এখন তারা কৌশলগত বিভ্রান্তিতে নেমে এসেছে। এই বিভ্রান্তি শুধু ইসরায়েলি হামলা বিলম্বিত করছে না, বরং তেহরানের জন্য হামলার উদ্যোগ নেওয়ার একটি সুযোগও খুলে দিচ্ছে।
ইরানি কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য নিয়মিতভাবে মোসাদের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করছে। এর একটি দ্বিমুখী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। দেশের ভেতরে এটি বিক্ষোভকে অবৈধ প্রমাণ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলার জন্য একধরনের বয়ানগত বৈধতা তৈরি করে। অস্থিরতাকে বাইরের আগ্রাসনের ফল হিসেবে তুলে ধরে তেহরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি বা পরোক্ষ আঘাতকে জাতীয় আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে।
আইএনএসএসের নথিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে একসঙ্গে চুক্তি আর সামরিক হুমকির কৌশল নিতে হবে। কিন্তু ইরানের ভেতরের অস্থিরতার কারণে এটা বাস্তবে করা কঠিন। কোনো দেশ যখন দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় থাকে, যা দেশকে ভেঙে পড়তে দেয় না, আবার পুরোপুরি স্থিরও হতে দেয় না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো শক্তিগুলো হামলায় যেতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার জন্য। এই অপেক্ষার অবস্থাটাই তেহরানের জন্য সবচেয়ে লাভজনক।
আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আইএনএসএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে অসম পুনর্গঠনের কৌশলের ওপর ভর করে এগোচ্ছে। প্রক্সি শক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায়, তেহরান এখন ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের সংখ্যা এবং পারমাণবিক সীমারেখা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
কম তীব্রতার বিক্ষোভ গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নজরদারিকে রাস্তায় ব্যস্ত রাখে, আর সেই আড়ালে ইরানি প্রযুক্তিবিদেরা সরবরাহ লাইন মেরামত করেন এবং সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যান। ইরান ও রাশিয়ার পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ইরান এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্ত করছে, যা সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সম্ভব হতো না।
তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে তৈরি কৌশলগত নথিগুলো পর্যালোচনা করলে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরি করে দেওয়ার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল ইরানের সক্ষমতা ক্ষয় করতে চায়, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি নিয়ে তারা শঙ্কিত।
বিষয়টি বুঝে তেহরান এই ধূসর পরিসরকে শুধু পুনর্গঠনের জন্য নয়, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতি উল্টে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করছে। এ কারণে বিক্ষোভ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধকে নিশ্চিত ঘটনা থেকে সরিয়ে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ সম্ভব হলেও ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি খুব বেশি।
মাহদি মোতলাঘ নীতি বিশ্লেষক ও গবেষক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত