মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৬ জানুয়ারিবিষয়ক তদন্ত কমিটি এক হাজার জনের বেশি সাক্ষাৎকার নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তার উপসংহারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই তদন্তে ট্রাম্পের নিজের বিশ্বস্ত কর্মীদের কাছ থেকে কিছু জঘন্য প্রমাণও উঠে এসেছে। ওই কমিটির রিপাবলিকান ভাইস চেয়ার লিজ চেনি তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, ‘৬ জানুয়ারি সহিংসতার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করেছেন, তা করার মানসিকতা যিনি পোষণ করতে পারেন, তাঁকে কি আমাদের মহান দেশে কোনো কর্তৃত্বের পদে বসানোর বিষয়ে বিশ্বাস করা যায়?’

তবে বেশির ভাগ রিপাবলিকান, বিশেষ করে যাঁরা চেনিকে বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করেন, তাঁদের কাছে এ প্রশ্নের দৃঢ় উত্তর হলো, ‘হ্যাঁ, তাঁকে বিশ্বাস করা যায়।’ প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা কেভিন ম্যাকার্থি কমিটির এ তদন্তের সত্যতা মানতে অস্বীকার করেছেন। সাম্প্রতিক একটি জরিপ অনুসারে, ৪০ শতাংশ রিপাবলিকান বিশ্বাস করে, ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যা ঘটেছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। একই অনুপাত মনে করে, ক্যাপিটলে সহিংস হামলা একটি বৈধ রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল।

তবে অর্ধেকের বেশি আমেরিকানের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়। ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্টতই এমনটা ভাবেন না এবং অনেক দলনিরপেক্ষ লোক বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরও এত রিপাবলিকান সমর্থকের আস্থা ও ভালোবাসার ওপর এই সাবেক প্রেসিডেন্টের ক্রমাগত দখলের পেছনে কী কারণ রয়েছে?

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার কাজ হারিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া উন্মত্ত শ্রমিকশ্রেণি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁরা বন্দুক বা ধর্ম বা তাঁদের মতো নয় এমন লোকদের প্রতি বিদ্বেষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।’ এই লোকগুলোই মূলত ট্রাম্পের সমর্থক। শিক্ষিত উদারপন্থীরা এই শ্রেণির লোকদের যত বেশি নিন্দা করবে, সাধারণ ট্রাম্প সমর্থকেরা তত বেশি তাদের নিজেদের উগ্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিশ্বাসে অটল হবে।

৬ জানুয়ারির ঘটনার তদন্ত সম্পর্কে জনতার অজ্ঞতা এবং আগ্রহের অভাব এর একটি কারণ হতে পারে। তবে যদি তাই-ই হয়, তাহলে সেই অজ্ঞতা হচ্ছে একটি ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতা। কারণ, ৬ জানুয়ারি সম্পর্কে সব তথ্য খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। কমিটির ওই শুনানি সরাসরি বিভিন্ন মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়েছে। যদিও ফক্স নিউজ তা সম্প্রচার করতে অস্বীকার করেছিল।

কিন্তু শুধু দৃশ্যমান বাস্তবতা সম্পর্কে কথা বললে আসল অনেক কথা না বলাই থেকে যাবে। মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের অনেক সমর্থকের কাছে ট্রাম্প শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন। তাঁরা মনে করেন, তিনি কখনোই প্রকৃতপক্ষে রাজনীতিবিদ ছিলেন না। কিছু লোক তাঁকে একধরনের মসিহ বা ত্রাতা হিসেবে অভিহিত করেছে। তাঁরা কেবল তাঁকে সমর্থন করেন না, তাঁরা তাঁকে এমন একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করেন, যিনি তাঁদের আত্মমর্যাদা উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন।

ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে একটি শ্রেণিভিত্তিক অনুভূতি কাজ করে। যেসব শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান গ্রামীণ এলাকায় বাস করেন এবং উচ্চশিক্ষা পাননি; যাঁরা মনে করেন তাঁরা শহুরে আমেরিকানদের অবজ্ঞার শিকার হচ্ছেন; যাঁরা শহুরে অভিজাতদের অবজ্ঞা, এমনকি ঘৃণা করেন, তাঁরাই ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত সমর্থক।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার কাজ হারিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া উন্মত্ত শ্রমিকশ্রেণি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁরা বন্দুক বা ধর্ম বা তাঁদের মতো নয় এমন লোকদের প্রতি বিদ্বেষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।’ এই লোকগুলোই মূলত ট্রাম্পের সমর্থক। শিক্ষিত উদারপন্থীরা এই শ্রেণির লোকদের যত বেশি নিন্দা করবে, সাধারণ ট্রাম্প সমর্থকেরা তত বেশি তাদের নিজেদের উগ্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিশ্বাসে অটল হবে।

ট্রাম্প এটি ভালো করেই বোঝেন এবং এই শ্রেণির লোকদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার কারণেই নিজের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তিনি অভিজাতদের বিরক্তির শিকার হয়ে থাকেন। তিনি যেসব ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে ‘সিরিয়াল পাপ’ করেন, সেই পাপকে তাঁর অনেক অনুসারী তাঁদের নিজেদের পাপ বলে দাবি করেন এবং তাঁকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে সেগুলো তাঁদের বিভ্রান্ত করে না। কারণ, দিন শেষে অধিকাংশ মানুষই পাপী।

আমেরিকার উদারপন্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর তুলনায় রিপাবলিকান অধ্যুষিত রাজ্যে বিবাহবিচ্ছেদ এবং কিশোরীদের গর্ভধারণের হার বেশি। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা যত বেশি তাঁকে ব্যভিচারী, গোঁড়া এবং মিথ্যাবাদী বলে সমালোচনা করেন, তাঁর অনুসারীরা তত বেশি তাঁকে সমর্থন দিতে থাকেন। ঠিক সেই কারণেই ৬ জানুয়ারি কমিটি যেসব তথ্য তুলে ধরেছে, তা ট্রাম্প সমর্থকদের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।

মূল বিষয় হলো ট্রাম্প হলেন বাকপটু সেই জননেতাদের একজন, যাঁদের কথা শুনে কোণঠাসা শক্তিহীন বোধ করা লোকদের সম্মিলিত শক্তির অনুভূতি দেয়। তিনি ‘তাদের’ বিরুদ্ধে ‘আমাদের’— ধরনের একটি যুদ্ধংদেহী মনোভাব জাগিয়ে তোলেন। অশ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু, অভিবাসী এবং সমকামীদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া অভিজাত শহুরেদের বিরুদ্ধে ‘দেশপ্রেমিকদের’ রুখে দাঁড়ানোর উদ্দীপক হিসেবে তিনি কাজ করেন।

এ ধরনের নির্জলা বিশুদ্ধ অনুগতদের কাছে ট্রাম্পের স্থায়ী জনপ্রিয়তা কি তাঁকে আবার প্রেসিডেন্ট হতে দেবে? এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা বোকামি হবে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তিনি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে আছেন। আমেরিকানদের একটি ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ভোটার তাদের দলগত পছন্দের বাইরে গিয়ে তাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেবেন। অনেকেই ট্রাম্পকে পছন্দ করেন না। সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের নিয়োগ করে যাওয়া প্রতিক্রিয়াশীল বিচারকেরা নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে পারেন—এমন একটা চিন্তায় পড়ে গেছেন। তাঁরাও ট্রাম্পকে চান না।

ট্রাম্পের জন্য আরও খারাপ খবর হলো রিপাবলিকান-সংলগ্ন মিডিয়ার মধ্যে তার সমর্থনে ভাটা পড়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং নিউইয়র্ক পোস্ট–এর মতো রক্ষণশীল সংবাদপত্রও এখন ৬ জানুয়ারিতে তাঁর আচরণের সমালোচনা করছে, এমনকি ফক্স নিউজও আর তাঁর নির্ভরযোগ্য ‘চিয়ারলিডার’ নয়।

তবে এর মানে এই নয় যে বেশির ভাগ রিপাবলিকান ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এখনো অনেকে বিশ্বাস করেন জো বাইডেন কারসাজি করে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু রিপাবলিকানদের একটি ক্রমবর্ধমান সংখ্যক লোক বলেন, প্রায় দুই বছর আগে যা ঘটেছিল, তা নিয়ে ট্রাম্প ড্রোনিং করতে করতে তাঁরা ক্লান্ত; তাঁরা চান তঁাদের দল এগিয়ে যাক।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প আবার দলের প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন কি না, তা এখনো বেশ অনিশ্চিত।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইয়ান বুরুমা দ্য চার্চিল কমপ্লেক্স: দ্য কার্স অব বিয়িং স্পেশাল এবং উইনস্টন অ্যান্ড এফডিআর টু ট্রাম্প অ্যান্ড ব্রেক্সিট বইয়ের লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন