রাজধানী ঢাকার লক্কড়ঝক্কড় বাস নিয়ে সম্প্রতি প্রথম আলোতে দুই পাতার বিশেষ আয়োজন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনটি পড়ে মনে হলো, লোকাল বাসে নিজের অভিজ্ঞতাটাও বলা দরকার।
রোববার রাতে (২৬ এপ্রিল) টেকনিক্যাল মোড় থেকে উঠলাম গাবতলী-যাত্রাবাড়ী রুটের ৮ নম্বর বাসে। উঠেই খেলাম এক ধাক্কা। ছয় ফুট মানুষের ‘চির–উন্নত মম শির’ উঁচু রাখার মতো জায়গা এখানে নেই। মাথা নত করেই মাঝখানে গিয়ে একটি সিটে বসলাম। বসার পর শুরু হলো আসল পরীক্ষা।
শোনা যায়, লম্বা মানুষের বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে থাকে। বুদ্ধির চাপে হাঁটুর আকারও বোধ হয় একটু বড় হয়। আমারও সেই দশা। দুই সিটের মাঝখানে কোনোভাবেই দুই হাঁটু ধরছে না। শেষমেশ এক হাঁটু সিটের বাইরে, আরেকটি ৪৫ ডিগ্রি কোণে ভেতরে রেখে একটি ‘আপসের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করলাম। ভাবলাম, সমস্যা হয়তো মিটেছে। ঠিক তখনই বাইরের হাঁটুতে খেলাম এক ধাক্কা। রাশভারী কণ্ঠের একজন ভদ্র কিংবা আধা ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘এক্সকিউজ মি ভাই, পা–টা ভিতরে নেন।’
বিনম্রভাবে জবাব দিলাম, ‘ভাই, ভেতরে পা ঢোকানোর জায়গা নেই।’ তিনি একবার আমার দিকে, একবার সিটের দিকে তাকালেন। তারপর কিছু না বলে পাশের ফাঁকা সিটে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, তাঁরও এক হাঁটু সিটের বাইরে। পাশাপাশি বসে আমাদের হাঁটুর মধ্যে একপ্রকার নীরব সন্ধি হয়ে গেল। বাস চলতে লাগল। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে রাতের ঢাকা। ঝিমুতে থাকা সিএনজি ড্রাইভার, চায়ের দোকানের ভিড় আর এই বাস—ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। যেন প্রতিটি মোড়ে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে।
বাসটার বয়স কত ছিল? কুড়ি? পঁচিশ? বলা কঠিন। তবে প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার প্রায় ৩০ শতাংশ বাসের বয়স ২০ বছরের বেশি। ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই। তবু চলছে বহাল তবিয়তে। এই বাসগুলো যেন মৃত্যুঞ্জয়ী। কোনো নিয়ম এদের দমাতে পারেনি, কোনো সরকার পারেনি, কোনো অভিযান পারেনি।
সরকার বদলায়, নীতিনির্ধারক বদলায়, স্টিয়ারিং ধরার হাত বদলায় কিন্তু বাস বদলায় না। এই অমরত্বের রহস্যটা সেদিনই বুঝলাম। বিআরটিএ নতুন বাসের দামে ভাড়া নির্ধারণ করে। কিন্তু রাস্তায় চলে ২০ বছরের পুরোনো বাস। অর্থাৎ আমরা নতুনের ভাড়া দিই, পুরোনোতে চড়ি। অর্থনীতির ভাষা জানি না, তবে আমাদের ভাষায় একে বলে—ঠগবাজি।
পারবেই–বা কীভাবে? সরকার বদলায়, নীতিনির্ধারক বদলায়, স্টিয়ারিং ধরার হাত বদলায় কিন্তু বাস বদলায় না। এই অমরত্বের রহস্যটা সেদিনই বুঝলাম। বিআরটিএ নতুন বাসের দামে ভাড়া নির্ধারণ করে। কিন্তু রাস্তায় চলে ২০ বছরের পুরোনো বাস। অর্থাৎ আমরা নতুনের ভাড়া দিই, পুরোনোতে চড়ি। অর্থনীতির ভাষা জানি না, তবে আমাদের ভাষায় একে বলে—ঠগবাজি।
এরই মধ্যে কারওয়ান বাজার মোড়ে বাস থামল। প্রায় ফাঁকা বাস মুহূর্তেই কানায় কানায় ভরে গেল, যেন পুরো কারওয়ান বাজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজ এই বাসেই যাবে!
তারপর শুরু হলো এক অদ্ভুত আচার। প্রত্যেক নতুন যাত্রী আমার পাশ দিয়ে ভেতরে যাওয়ার সময় আমার হাঁটু তাঁদের অভ্যর্থনা জানাল—গুঁতো দিয়ে। কেউ থামলেন। চোখ রাঙিয়ে বললেন, ‘পা গুটায়া বসেন ভাই, মানুষ চলাচল করতে পারতেছে না।’ কেউ কিছু বললেন না, শুধু বিরক্তির এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। যার ভেতরে লুকানো তীব্র ভর্ৎসনা।
আর কেউ কেউ শুধু চোখের ভাষায় জানিয়ে দিলেন—আমি এবং আমার হাঁটু, দুজনই এই বাসে অবাঞ্ছিত। প্রতিবারই বিনম্র স্বরে বললাম, ‘ভাই, জায়গা নেই।’ তবে কেউ সেটা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হলো না।
প্রথম আলোর গত সোমবারের (২৭ এপ্রিল) ‘সরকার বদলায়, বাস বদলায় না’ শিরোনামের প্রতিবেদনে হাঁটুর এই রহস্যের সমাধান পেলাম। ৪১ সিটের বাসে গুঁজে দেওয়া হয়েছে ৪৬টি সিট। পাঁচটি বাড়তি সিটের হিসাব মেলাতে গিয়ে যা কমেছে, তা হলো পায়ের জায়গা। অর্থাৎ আমার হাঁটু বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি গাণিতিক অনিবার্যতা।
প্রতিদিন এই পাঁচটি বাড়তি সিটের মাশুল গুনছে হাজার হাজার যাত্রীর হাঁটু।
শুধু এই বাস নয়, রাজধানীর প্রায় সব রুটেই একই চিত্র। মালিক পাঁচটি সিট বাড়িয়ে প্রতিদিন কিছু বাড়তি আয় করেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দেখে বা না দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। আর আমরা যাত্রীরা হাঁটু বাইরে রেখে বসি, গুঁতো খাই, বকুনি শুনি, তারপর চুপ করে থাকি।
এভাবেই চলে ঢাকার গণপরিবহন। সরকার আসে, যায়। পরিকল্পনা হয়, ঘোষণা আসে, অভিযান শুরু হয়। সাত দিন, দশ দিন পর সব থেমে যায়। আর আমরা ঢাকার যাত্রীরা হাঁটু ভাঁজ করে, মাথা নত করে, ৪৫ ডিগ্রি কোণে বসে টিকে থাকি।
দেখতে দেখতে বাস থেকে নামার সময় হয়ে গেল। ঘাড় নিচু করে কোনোরকমে মাথা বাঁচিয়ে নামতে নামতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের এক যাত্রীর কথা মনে পড়ল, ‘সরকার তো আইল-গেল, কিছু তো হইল না।’ মনে মনে বললাম, হয়তো হবে, হয়তো হবে না। তত দিন পর্যন্ত আমার হাঁটু দুটোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ, ঢাকায় বাঁচতে হলে হাঁটু শক্ত রাখতে হয় আর মাথা নিচু।
● সৈয়দ রিফাত মোসলেমপ্রথম আলোর প্রতিবেদক
