যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যেও প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন

রিয়াদে সি চিন পিং ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেখা হচ্ছে
ছবি: এএফপি

সৌদি আরব ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল, সংক্ষেপে জিসিসি) অন্য সদস্যদের সঙ্গে ৯ ডিসেম্বর একটি সম্মেলনে যোগ দিয়ে চীন একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। ওই বিবৃতিতে ইরানকে আঞ্চলিক ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের মদদদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিডল ইস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এমইআরআই) বিবৃতিটির একটি অংশ প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বলা হয়েছে। যেমন: ইরানের পারমাণবিক তৎপরতা চালানোর বিষয়টি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অস্থিতিশীল আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার বিষয়টি সব পক্ষকে আমলে নিতে হবে বলে বলা হয়েছে।

ইরান সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং অবৈধ সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রেখেছে—এই ভাষ্যকেও ঠিক বলে মানতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নৌচলাচল ও তেল স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের বিস্তার থেকে সরে আসতে হবে এবং এ–সংক্রান্ত জাতিসংঘের প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।’

জিসিসি-চীন এবং আরব-চীন শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী বিবৃতিতে আরও ঘোষণা করা হয়েছে, তাইওয়ানের যেকোনো ধরনের স্বাধীনতার দাবিকে এই জোটের সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাইওয়ানকে তারা চীনা ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। একই সঙ্গে হংকং ইস্যুতে তারা চীনা অবস্থানকে সমর্থন করে এবং ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ কাঠামোর মধ্যে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখাকে সমর্থন করে।

আরব দেশগুলো এসব স্বীকৃতি দেওয়ায় তার বিনিময়ে চীন ইরানের দখলে থাকা তিনটি দ্বীপের মালিক হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানা দাবিকে সমর্থন দিয়েছে। ইরানের আনা নিউজ এজেন্সি বলেছে, ‘ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেছেন, ইরানের তিনটি দ্বীপ নিয়ে চীন ও সৌদি আরবের বক্তব্যের ব্যাপারে তেহরান তীব্রভাবে অসন্তুষ্ট। তবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তাঁরা ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করেন এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই তাঁদের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সম্প্রতি রিয়াদ সফর করেছেন।

কিছু পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টগুলো যা বলছে, তার বিপরীতে গিয়ে নিক্কেই-এর তালা তসলিমি ১৩ ডিসেম্বর লিখেছেন, ‘এই অঞ্চলের প্রতি চীনের নীতির পরিবর্তন হয়নি, বিশেষ করে মার্কিন উপস্থিতি হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে চীনের হস্তক্ষেপ আগের চেয়ে বেড়েছে।’ প্রায় এক দশক আগে, আমি ‘মধ্যপ্রাচ্যে চীনের শান্তিচেষ্টা’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। সে লেখার উপসংহারে বলেছিলাম, ‘দৃশ্যমান তথ্যগুলো এটি স্পষ্ট করে যে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত প্রভাব প্রয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে এবং দেশটির সেখানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীন আগ্রহ রয়েছে।’

বিপরীতে চীন থেকে সৌদি আরবের আমদানি প্রায় একই মাত্রায় বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হলেও মধ্য এশিয়ায় প্রভাব খাটানোর বিষয়ে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। তুরস্কে চীনের রপ্তানি অক্টোবর মাসে সাড়ে তিন শ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ পুরো অঞ্চলে ভারসাম্য ঠিক রাখতে চীন সবার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছে।

এটি এখন স্পষ্ট যে চীন কৌশলগত প্রভাব প্রয়োগ না করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে না। চীনা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে চীনের নীতির কিছুই পাল্টায়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ১২ ডিসেম্বর বলেছেন, ‘জিসিসি দেশগুলো ও ইরান—সবাই চীনের মিত্র এবং চীন-জিসিসি সম্পর্ক কিংবা চীন-ইরান সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে গড়ে উঠছে না। চীন ভালো প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বের নীতির ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণভিত্তিক সহযোগিতা পরিচালনায় বিশ্বাসী এবং এর ভিত্তিতেই পারস্য উপসাগরে যৌথভাবে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রচারে জিসিসি দেশগুলোকে সমর্থন করে। চীন এ ব্যাপারে গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক।’

চীন হয়তো পরিবর্তিত হয়নি, কিন্তু বিশ্ব বদলে গেছে এবং সে কারণেই চীন অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলভাবে আমেরিকার চলে যাওয়া এবং কাবুলে একটি জিহাদি শাসনের উত্থানের পর চীন পারস্য উপসাগর দিয়ে তার তেল আনা–নেওয়ার সামনে থাকা হুমকি এবং তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সামনে থাকা ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে পারে না।

ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে প্রথম স্বাক্ষর করা দেশ চীন ইউক্রেন যুদ্ধকে পশ্চিমা ঔদ্ধত্যের মুখে রাশিয়ান নীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। রাশিয়া ও ইরানের সমঝোতা হলে তা তেহরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তিসহ আরও অত্যাধুনিক অস্ত্রের জোগাতে পারে এবং বেইজিংয়ের পক্ষে সেটি ভালো কিছু হবে না।

জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের গত নভেম্বরের বেইজিং সফরকে প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়া দুই মাস আগে প্রেসিডেন্ট সি কাজাখস্তানে পুতিন যাতে হস্তক্ষেপ না করেন, সে জন্য তাঁকে সতর্ক করেছিলেন।

২০১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিযোগ করেছিলেন, চীন পারস্য উপসাগরে একটি ‘ফ্রি রাইডার’ হয়ে চষে বেড়াচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে তার তেল সরবরাহকারী জাহাজকে পাহারা দেওয়া বাবদ বাড়তি নৌবহরের খরচ বহন করতে বাধ্য করে। তাঁর অভিযোগটি ন্যায্য ছিল। ২০১৫ সালে বেইজিংয়ে আমি একটি ইসরায়েলি ফাউন্ডেশন আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে একজন চীনা কৌশলবিদ ইরান এবং সৌদি আরবের কাছে চীনের অস্ত্র বিক্রির বিস্তারিত বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ইরান চীনের কাছ থেকে আরও ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল, কিন্তু সৌদি আরব আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র কিনছিল। চীনা বিশ্লেষক বলছিলেন, চীন শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল।

তারপর থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ইরানের স্ববিচ্ছিন্নতা তেলের বাজারে তার প্রবেশাধিকার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। চীন থেকে ইরানের আমদানি ২০১৬ সালে যেখানে প্রতি মাসে ছিল দেড় শ কোটি ডলার, সেখানে ২০২২ সালে তা মাত্র ৫০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন

বিপরীতে চীন থেকে সৌদি আরবের আমদানি প্রায় একই মাত্রায় বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হলেও মধ্য এশিয়ায় প্রভাব খাটানোর বিষয়ে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। তুরস্কে চীনের রপ্তানি অক্টোবর মাসে সাড়ে তিন শ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ পুরো অঞ্চলে ভারসাম্য ঠিক রাখতে চীন সবার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • ডেভিড পল গোল্ডম্যান মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও লেখক