বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিবছর সংসদের প্রথম অধিবেশন ও সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠক বা অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সেই ভাষণ নিজের বুদ্ধিবিবেক অনুযায়ী দিতে পারেন না। তাঁকে ক্ষমতাসীন দলের লিখিত ভাষণ পড়তে হয়। এই রেওয়াজই চলে আসছে। কেউ পাল্টানোর কথা বলছেন না। এ কারণেই আমরা অতীতে বিএনপির রাষ্ট্রপতির মুখে আওয়ামী বুলি শুনেছি। আর এবার আওয়ামী রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির বুলি শুনলাম।
সংসদের প্রথম দিন যেসব আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর দুই পক্ষের আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, বিশেষ কমিটিসহ সাতটি কমিটি গঠিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এসব কমিটিই সংসদ পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রথা অনুযায়ী বিগত সংসদ ও বর্তমান সংসদের মধ্যকার সময়ে যেসব সাবেক জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়। এই শোকপ্রস্তাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও জুলাই শহীদদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামও আছে। এসব নিয়ে কেউ আপত্তি করেননি। বরং মুক্তিযোদ্ধা স্পিকার বিনা বাক্য ব্যয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, সব নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
বিরোধী দল জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, তাঁরা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে চান না। বরং তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন আনতে চান। কিন্তু সমস্যা হলো ক্ষমতাসীন বিএনপির সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কোনো প্রস্তাব যে সংসদে পাস হবে না, তা তাঁরাও জানেন। এ জন্যই যখন রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করেন, তখন তাঁরা সমস্বরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং ওয়াকআউট করেন।
অতীতেও সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের উদাহরণ আছে। কিন্তু জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্তে যেভাবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের একাংশ নিজ নিজ আসনে বসে থাকলেন, সেটা অনেককে আহত করেছে। তাঁদের দাবি, সে সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে তাঁরা জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়টি শুনতে পাননি। যদিও পরবর্তী মুহুর্তে তাঁরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি পদটি সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এই পদে যাঁরা আসীন হন, তাঁদেরও সেই মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি পদটিকে বরাবর ‘আজ্ঞাবহ’ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে।
আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত মো. সাহাবুদ্দিন যে ভাষণ জাতীয় সংসদে দিলেন, সেটা ছিল বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুমোদিত।
ফলে এই ভাষণে যে বিএনপি সরকারের ভূয়সী প্রশংসা ও আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট
দল ও আওয়ামী লীগ শাসনকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তিনি বিএনপির আমলে চারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলতে পারেননি।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা অন্য কোনো নেতার নাম বলেননি। তাঁর ভাষায় তাঁরা হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ‘সকল নেতা’। এই রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে বিএনপি ও এর সহযোগীদের দেশবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেবার তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করে ষড়যন্ত্র ও গুজব রটনাকারীদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলেছিলেন দেশবাসীকে।
রাষ্ট্রপতি পদটি সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এই পদে যাঁরা আসীন হন, তাঁদেরও সেই মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি
পদটিকে বরাবর ‘আজ্ঞাবহ’ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে।
আমরা যদি সংসদকে দলমত–নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করি, তাহলে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল বা সরকারের লিখিত ভাষণ পাঠ করানোর অগণতান্ত্রিক রীতি বদলানো উচিত। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রপতি স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেননি। তিনিও সংসদে সরকারি দলের লিখিত ভাষণ পড়ার পাশাপাশি নিজের বক্তব্যও তুলে ধরতেন।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে যাঁরা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেছেন, তাঁরা কেউ সরকারি দলের লিখিত ভাষণ নিয়ে প্রশ্ন করেননি। প্রশ্ন করেছেন স্বৈরাচারের দোসর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে। ভবিষ্যতে যদি বিএনপি–দলীয় রাষ্ট্রপতি আসেন, তাঁকে দিয়েও একই কাজ করানো হবে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ছাড়া যেসব মৌলিক বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ আছে, সেগুলো কীভাবে সুরাহা হবে, তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল না সংসদের প্রথম অধিবেশনে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। সরকারি দল বলছে আপত্তিসহ তাঁরা জুলাই সনদে সই করেছেন। আর জনগণ তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে এর বাইরের কিছু গ্রহণ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের ভিত্তিতে যে সাংবিধানিক আদেশ হয়েছে, তার পুরোটা বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা গণভোটের মাধ্যমে জনগণ জুলাই সনদকে দাঁড়ি–কমাসহ গ্রহণ করেছে।
মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। তাঁদের মধ্যে দু–একজন ব্যতিক্রম বাদে কেউ নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পারেননি। ব্যতিক্রম হিসেবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা যায়, যাঁরা ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করেননি।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করেছেন সরকারি দলের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধের কারণে ২০০২ সালে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হয় কয়েক মাসের মাথায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দুবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। আর দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। কোনোবারই তাঁর বিদায় সম্মানজনক হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দেখিয়েছে, এ রকম উদাহরণ কম। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ পূরণ করলেও আওয়ামী লীগের চরম বিরাগভাজন হয়েছিলেন ২০০১ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দুই সরকারের আমলে ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হলেন। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি সংসদে দেওয়া ভাষণ আর চলতি বছরের ১২ মার্চ সংসদে দেওয়া দুটি ভাষণ মিলিয়ে দেখলে আমাদের গণতন্ত্র ও রাজনীতির প্রকৃত ব্যাধিটি ধরা পড়বে। আগের ভাষণে তিনি ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের জয় ও যুগান্তকারী ঘটনা বলে উল্লেখ করেছিলেন।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যবৃন্দকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাঁদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।’
এক যাত্রায় দুই ফলের কথা শুনেছি। এবার দেখা গেল রাষ্ট্রপতির পদে আসীন একই ব্যক্তির দুই বয়ান।
● সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি
* মতামত লেখকের নিজস্ব
