‘আমেরিকান ক্রুসেডের’ বিপদে বিশ্ব

গত মাসে ন্যাশভিলে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান মিডিয়া কনভেনশনে হেগসেথ। ছবি: সেথ হেরাল্ড/রয়টার্স

ওভাল অফিসের সেই বিখ্যাত ‘রেজলুট ডেস্ক’-এর পেছনে বসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাতে নিয়েছেন বি-টু বোমারু বিমানের একটি খুদে মডেল। তিনি বিমানটির মডেলটি নেড়েচেড়ে দেখছেন, বিমানটির আকারের প্রশংসা করছেন এবং এর বিধ্বংসী ক্ষমতা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করছেন। তিনি গর্ব করে জানাচ্ছেন, যখন তিনি সত্যিকারের এই যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিলেন, তখন প্রতিটি বোমা একদম নিশানামতো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছিল।

তাঁর কথায় কোনো যুদ্ধরত নেতার দায়ভার বা গাম্ভীর্য নেই। বরং তাঁর প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত আনন্দ। এমন আনন্দ কেবল প্রিয় কোনো খেলনা হাতে পাওয়া শিশুর মধ্যেই দেখা যায়। একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের আচরণের চেয়ে একে খেলনায় মত্ত কোনো বালকের কাণ্ড বললেই বেশি মানায়। আর এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর আতঙ্ক।

ট্রাম্প যুদ্ধকে কোনো ট্র্যাজেডি বা কঠোর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে যুদ্ধ মানেই হলো বড় কোনো প্রদর্শনী, শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ কিংবা চরম এক আনন্দ। বারবার তিনি জাহির করেন যে আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এবং অন্য কোনো দেশ তাদের ধারেকাছেও নেই। বোমাগুলো কীভাবে নর্দমার নলের ভেতর দিয়ে একদম নির্ভুল নিশানায় পৌঁছায় এবং আকাশে প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটায়, সেই বর্ণনা তিনি দেন পরম তৃপ্তির সঙ্গে।

কয়েক দিন আগেও এনবিসি নিউজকে ইরান নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বুক ফুলিয়ে দাবি করেন যে আমেরিকা চাইলে আবার আক্রমণ চালাতে পারে স্রেফ মজা করার জন্য।

মজা করার জন্য যুদ্ধ! এখানে সহিংসতা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একধরনের লালসা। কোনো বড় দায়িত্ব নয়, বরং কেবল একপ্রকার ক্ষুধা। কোনো আবশ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং স্রেফ একটা খেলা।

আরও পড়ুন

ওভাল অফিস থেকে পেন্টাগন, সর্বত্র ভাষার এমন ব্যবহার একদম একই রকম। নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তীব্র উত্তেজনা নিয়ে ঘোষণা করেন যে আকাশে সব সময় বি-টু ও বি-৫২ বোমারু বিমান থেকে ধ্বংসলীলা ঝরতে থাকা উচিত। তাঁর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের নীতি হওয়া উচিত মার্কিন শক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করা। এটি কেবল অনিচ্ছাকৃত কোনো অসংলগ্ন কথা নয়, বরং এটিই এখন আমেরিকার মূল নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্ব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পশ্চিমা আধিপত্য পুনঃ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে এক জোট হওয়ার আহ্বান জানান, যাতে নতুন একটি ‘পশ্চিমা শতাব্দী’ গড়ে তোলা যায়। উপনিবেশবিরোধী যেকোনো চেতনাকে তিনি স্রেফ দুর্বলতা বলে খারিজ করে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের চালিকা শক্তি কেবলই পেশিশক্তি। তারা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব প্রতিষ্ঠান আমেরিকা নিজে গড়ে তুলেছিল, সেগুলোকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে। এমনকি মার্কিন সামরিক শক্তির প্রধান করা হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে নারী নিপীড়নের নানা অভিযোগ রয়েছে। পিট হেগসেথের নিজের মা-ও তাকে ‘নারী নির্যাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হেগসেথের শরীরে খোদাই করা বিভিন্ন ট্যাটু বা উলকিও এক চরম উগ্রপন্থাকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে ‘কাফির’ বা ‘অবিশ্বাসী’ শব্দটি যেভাবে তাঁর শরীরে মুদ্রিত, তা অন্য ধর্মের প্রতি তাঁর আজন্ম ঘৃণা ও সংঘাতময় মানসিকতার পরিচয় দেয়। তাঁর কাছে রাজনীতি হলো সভ্যতা ও ধর্মের লড়াই এবং পুরো আধুনিক বিশ্বই একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একমাত্র শত্রু হলো ইসলাম।

কূটনীতির চেয়ে আত্মীয়তা বড়

ক্ষমতার বলয়ে থাকা ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা আরও রহস্যজনক। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার কিংবা বন্ধু স্টিভ উইটকফ—কারোরই কোনো বিশেষ প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ নেই। পরমাণু আলোচনা সামলানোর মতো দক্ষতাও তাঁদের নেই। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক সব সিদ্ধান্ত এখন তাঁদের হাতেই ন্যস্ত।

(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ফাইল ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্প আজ যেন অনেকটা রোমান সম্রাট নিরোর আধুনিক সংস্করণ। সামনে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চলছে আর তিনি সেই দাউদাউ আগুনে মত্ত হয়ে আনন্দের মেলা বসাচ্ছেন। বিশ্ব আজ এই দৃশ্য দেখে সত্যিই আতঙ্কিত।

এটি কোনো প্রচলিত পদ্ধতি নয়। ক্ষমতার খুব কাছের মানুষেরাই বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ কূটনীতিকদের স্থান দখল করে নিচ্ছেন। যোগ্যতার বদলে এখন প্রধান মানদণ্ড হলো ব্যক্তিগত আনুগত্য। কোনো কোনো কূটনীতিক তো এমনও মন্তব্য করেছেন যে ইরানের সঙ্গে মার্কিন আলোচনার প্রতিনিধিরা আদতে ইসরায়েলি এজেন্টদের মতোই কাজ করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য মার্কিন স্বার্থ নয়; বরং ইসরায়েলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে সম্ভবত ইরান সংক্রান্ত সমঝোতার ব্যাপারে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতির বড় কর্তারা এখন মূলত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হয়ে কাজ করছেন। এর প্রমাণ মেলে যখন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ করেন যে ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল এবং ইরান ট্রাম্পের সব দাবি মেনে নিতেও রাজি ছিল। অথচ আমেরিকা সেই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ইচ্ছাকৃতভাবে সব ভেস্তে দিয়েছে।

একই আলাপ উঠে এসেছে ব্রিটিশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মুখেও। তিনিও মনে করেন ইরানের দিক থেকে সরাসরি কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছিল না এবং স্রেফ সঠিক কূটনীতির অভাবে একটি কার্যকর চুক্তি অধরাই থেকে গেল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে মিত্রদেশগুলোও মনে করছে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি এখন নিজের হাতে নেই; বরং একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে তা জিম্মি হয়ে পড়েছে।

ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমর্থনে একটি অজ্ঞাত স্থান থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিমিটজ-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেকে ওড়ানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে মার্কিন মেরিন কোরের একটি এফ-৩৫সি লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান। ৩ মার্চ, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

শক্তির আস্ফালন

ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা এখন জনকল্যাণের চেয়েও ব্যক্তিগত সম্পদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার আর বন্ধুদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এই শাসনের মূল ভিত্তি। এর ভেতরে কূটনীতি তার সহজাত পথ হারিয়েছে। মার্কিন নৌশক্তি কিংবা বোমারু বিমানকে এখন অন্য রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মার্কিন রাজনীতি এখন একধরনের ‘ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী’ সুলভ সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে পেশিশক্তি ও দমন-পীড়নই একমাত্র ভাষা। সাম্রাজ্যবাদী অহংকার আর আগ্রাসী দম্ভ একসময় প্রান্তে থাকলেও এখন তা রাষ্ট্রীয় শক্তির একদম কেন্দ্রে অবস্থান করছে। আমেরিকার জাহাজ ও কামান যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁরা কথা বলছেন অনেকটা গ্যাংস্টারদের স্টাইলে। ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় ইরানের ধ্বংসের ডাক দিয়ে লিখেছেন, তাঁর মিত্ররা যদি তাঁর এই ধ্বংসের নেশায় যোগ না দেয়, তবে তাদেরও চরম মূল্য দিতে হবে।

এটি কোনো রণকৌশল নয়। এটি স্রেফ ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার নামান্তর। ট্রাম্প আজ যেন অনেকটা রোমান সম্রাট নিরোর আধুনিক সংস্করণ। সামনে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চলছে আর তিনি সেই দাউদাউ আগুনে মত্ত হয়ে আনন্দের মেলা বসাচ্ছেন। বিশ্ব আজ এই দৃশ্য দেখে সত্যিই আতঙ্কিত।

  • সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিশেষজ্ঞ

    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত