রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: বিলম্ব, ব্যয় ও অব্যবস্থাপনার দায় কার

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রফাইল ছবি: প্রথম আলো

নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়সূচি থেকে ইতিমধ্যে তিন বছরেরও বেশি পিছিয়ে গেছে। এই বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাশিয়ার রোশাটমকে বাংলাদেশকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এই বিলম্বের জন্য দায়ী রাশিয়া নাকি বাংলাদেশ—সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। আমার জানামতে, এটি একটি টার্নকি প্রকল্প। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রকল্পটি ক্রয়কারী পক্ষকে বুঝিয়ে দেবে—এটাই প্রচলিত রীতি। কিন্তু চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি নির্মাণকাজ শেষ না হয়, তাহলে বিলম্বের দায়ে বাংলাদেশ কেন অতিরিক্ত সুদের বোঝা বহন করবে—এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে।

প্রায়ই শোনা যায়, রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অমুক মাসে শুরু হবে। কিন্তু দ্বিতীয় ইউনিটের বিষয়ে তেমন কোনো স্পষ্ট সময়সূচি চোখে পড়ে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বেরও একটি সীমা থাকা প্রয়োজন। আবার যদি বিলম্বের কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা হয়, তাহলে সেটিও স্বচ্ছভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত না হওয়ার কারণে কেন্দ্রটি কমিশনিং করা যাচ্ছে না। কিন্তু কয়েক মাস ধরে আবার শোনা যাচ্ছে, সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত রয়েছে।

এবার আসা যাক এই বিলম্বের অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়ে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রকল্পের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ৬ টাকা ধরা হয়েছিল (তৎকালীন মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ৮০ টাকা ধরে), সেখানে বর্তমানে তা প্রায় ১০ টাকায় পৌঁছেছে (২০২৬ সালে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরে)। এ ছাড়া দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যন্ত্রপাতির কার্যকর আয়ুষ্কালও কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনবলের বেতন-ভাতা পরিশোধের অতিরিক্ত চাপও রাষ্ট্রীয় রাজস্বের ওপর পড়ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রকল্পটি সময়মতো চালু হলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমপরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করার প্রয়োজন হতো না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ কমত।

এ পর্যন্ত আলোচনা হলো প্রকল্পের বিলম্ব এবং এর অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে। এবার আসা যাক প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি মূলত মানুষের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুণগত মানের ওপরই পারমাণবিক নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

এই বিবেচনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সব সময় পরামর্শ দেয় যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি এবং নেতৃত্ব নির্বাচন অবশ্যই যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে।

সংস্থাটির নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, যেখানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, সততা ও পেশাদারত্বের ঘাটতি থাকে, সেখানে নিরাপত্তা সংস্কৃতির চর্চাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি, জবাবদিহির অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বসহ নানা প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরের প্রথম ইউনিটের প্রাক্‌-নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে নিরাপত্তা সংস্কৃতির চর্চায় ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা কর্মকর্তারা যদি একে একে চলে যান, তাহলে রূপপুরের টেকসই মানবসম্পদ কাঠামো কোথায় দাঁড়াবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ৩২টি দেশে পরিচালিত প্রায় ৪৪০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোথাও এমন নজির পাওয়া যায় না।

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রকল্পে একটি স্বাধীন, যোগ্যতাভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই মানবসম্পদ কাঠামো গড়ে ওঠা সবার প্রত্যাশা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ–সংক্রান্ত নানা অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে।

এমনকি কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই সেখানে কর্মরত অনেক তরুণ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতি ও নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট।

এ ছাড়া দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে রাশিয়ায় নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চার থেকে ছয় বছর পড়াশোনা করে দেশে ফেরার পর অনেক শিক্ষার্থীই বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ পাননি। প্রশ্ন হলো—রূপপুর কোম্পানির মতো উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হচ্ছে?

আরও পড়ুন

এর ফলে প্রকল্পের ভেতরে একধরনের হতাশা ও অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি পারমাণবিক স্থাপনার জন্য কাম্য নয়। ইতিমধ্যে অনেকেই স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন কিংবা বিদেশে চলে গেছেন। আবার অনেকেই বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন।

রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা কর্মকর্তারা যদি একে একে চলে যান, তাহলে রূপপুরের টেকসই মানবসম্পদ কাঠামো কোথায় দাঁড়াবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ৩২টি দেশে পরিচালিত প্রায় ৪৪০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোথাও এমন নজির পাওয়া যায় না।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ভাষায়, এটি একটি অন্তর্নিহিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, যা প্রথমে দৃশ্যমান না হলেও সময়ের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটিই দায়ী ছিল না; দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত তদারকি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য ফলাফল বহুমাত্রিক। প্রথমত, নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি বহু প্রজন্মকে বহন করতে হয়। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। যখন যোগ্যতা ও পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, তখন দক্ষ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা দেশ বা প্রকল্প ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, প্রকল্পটির শুরু থেকেই দক্ষ ও টেকসই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে যথাযথ নজরদারির অভাবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশিকা ও আন্তর্জাতিক রীতি পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে যদি স্বচ্ছ মানবসম্পদ কাঠামো ও যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় কী? প্রথমত, রূপপুর প্রকল্পে একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানবসম্পদ নিরীক্ষা জরুরি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনার আলোকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির কাঠামো, নিয়োগ ও পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া একটি বহুপেশাজীবী কমিটির মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পদের জন্য সুস্পষ্ট দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে তা স্বচ্ছভাবে অনুসরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সংস্কৃতির চর্চা জোরদার করতে এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন জুনিয়র কর্মকর্তা নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশ্ন তুললে সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হবে। একই সঙ্গে অন্যদেরও প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য সমস্যার গভীরে গিয়ে তার যথাযথ সমাধান বের করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুগত্য বা প্রশাসনিক ঘনিষ্ঠতা নয়; যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারত্বই হওয়া উচিত মূল মানদণ্ড। রাষ্ট্র যদি সত্যিই রূপপুরকে একটি টেকসই, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সংস্কারসহ সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে—যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির ওপর নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করেন। বাস্তবতা হলো, সফলতা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির চেয়েও বেশি নির্ভর করবে মানুষের ওপর—তাদের সৎ নেতৃত্ব, পেশাদারত্ব এবং দক্ষতার ওপর; এবং আমরা সেই মানুষগুলোকে কীভাবে নির্বাচন, মূল্যায়ন ও আস্থাভাজন করব, তার ওপর।

  • ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র। ই–মেইল: [email protected]
    *মতামত লেখকের নিজস্ব