বিশ্বজুড়ে এই উষ্ণায়ন হ্রাস করতে ‘ফিট ফর ফিফটি ফাইভ’, যা মূলত প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পটভূমিকে সামনে রেখে তৈরি হয়েছিল। এই পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস বা নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। আর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আগামী দশকগুলোয় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ কার্বন নির্গমন কমানোর ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে জার্মানিসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ আবার কয়লা ও পারমাণবিক চুল্লি দীর্ঘ সময় চালু রাখার কথা ভাবছে।

যুদ্ধকালে এই সংকট ইউরোপের সর্বোচ্চ জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ জার্মানিতে পুনরায় কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র থেকে আসা জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জার্মানির জ্বালানি রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় সর্বমোট ১৮টি পারমাণবিক চুল্লি থেকে আসা জ্বালানি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সবশেষ সিদ্ধান্তে ২০২২ সালের মধ্যে অবশিষ্ট তিনটি পারমাণবিক চুল্লি ও ২০২৪ সালের মধ্যে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধ আপত্কালীন সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে পুনরায় কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার কথা ভাবছে

উল্লেখ্য, বিশ্বের ধনী বা আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর জ্বালানি ব্যবহারের কারণেই পৃথিবীর ১৬ শতাংশ কার্বন নিঃসরিত হয়ে থাকে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফাম। এক জরিপে সংস্থাটি জানিয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী দেশ যে পরিমাণ কার্বন ব্যবহার করেছে, তা গরিব বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার ব্যবহারের দ্বিগুণ। তারা বলছে, ২০৩০ সালে তাদের এই কার্বন ব্যবহারের মাত্রা ১৯৯০ সালের মাত্রার চেয়ে ২৫ ভাগ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নানা পরিকল্পনা এখন ভন্ডুল করে দিচ্ছে। ‘ফিট ফর ফিফটি ফাইভ’ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো পরিবহনব্যবস্থাকে ডি-কার্বনাইজ করা এবং বৈদ্যুতিক বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন ও পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা জৈব জ্বালানির ব্যবহারের বিষয়গুলো আইনের আওতায় আনা। তবে এই পরিকল্পনায় বাদ সেধেছে যুদ্ধ। যুদ্ধের জেরে ন্যাটো জোট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।

বিপরীতে রাশিয়া পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তেল ও গ্যাসের রপ্তানি ক্রমেই হ্রাস করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শক্তিশালী জার্মানি। পরিবেশবান্ধব নিয়মনীতির ক্ষেত্রে জার্মানি এক অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে পরিচিত। গত দুই দশক থেকে জার্মানিতে সৌর, বায়ু বা পানিবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত জ্বালানির হার ক্রমেই বেড়েছে। জার্মানিতে একসময় কয়লা ও আণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার হলেও ২০২২ সালের মধ্যে আণবিক চুল্লি ও ২০৩৮ সালের মধ্যে কয়লা থেকে তৈরি জ্বালানি বন্ধ করে দেওয়ার পথে হাঁটছিল তারা।

জার্মানির শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষেরা রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। জার্মানিসহ বেশ কিছু ইউরোপিয়ান দেশেও গ্যাস সরবরাহের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বিধায় নতুন নিয়মকানুন করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি জার্মানির অর্থনীতি ও জলবায়ু সুরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট হাবেক বলেন, যুদ্ধের কারণে রাশিয়া গ্যাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাশিয়া সম্ভবত ইউরোপে গ্যাসের সরবরাহ একদম বন্ধ করে দিতে পারে, তাই ইউরোপকে এখন থেকে জ্বালানির ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে।

গ্যাস সংকটের মুখে জার্মানি বেশ কিছু আপত্কালীন পরিকল্পনা করেছে। গ্যাস মজুত করার কেন্দ্রগুলোয় গ্যাস ভর্তি করার জন্য জার্মান সরকার ১৫ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেবে। শিল্প খাতগুলোর কাছে গ্যাস নিলামে বিক্রি শুরু করবে, যাতে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কম গ্যাস ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয় বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়ে তৎপর হয়। প্রাইভেট কারের ব্যবহার কমাতে জার্মানি রেলওয়ে মাত্র ৯ ইউরো দিয়ে মাসিক টিকিট চালু করেছে, যা দিয়ে বাস, ট্রাম বা লোকাল ট্রেনে সর্বত্র যাতায়াত সম্ভব। তবে জার্মানি এখন পর্যন্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়নি।

গত জুনে লুক্সেমবার্গে ইইউ দেশগুলোর জ্বালানিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে জার্মানির অর্থনীতি ও জলবায়ু সুরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট হাবেক বলেন, আসন্ন শীতকালে গ্যাস ব্যবহার হ্রাস করতে নতুন আইন হবে। যদিও গ্যাস ব্যবহার হ্রাস করার এই আইন ইউরোপ ও জার্মানিতে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে বলে তিনি জানান।

যুদ্ধকালে এই সংকট ইউরোপের সর্বোচ্চ জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ জার্মানিতে পুনরায় কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র থেকে আসা জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জার্মানির জ্বালানি রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় সর্বমোট ১৮টি পারমাণবিক চুল্লি থেকে আসা জ্বালানি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সবশেষ সিদ্ধান্তে ২০২২ সালের মধ্যে অবশিষ্ট তিনটি পারমাণবিক চুল্লি ও ২০২৪ সালের মধ্যে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধ আপত্কালীন সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে পুনরায় কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার কথা ভাবছে।

এই বছরের প্রথম দিকে অর্থাৎ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে জানুয়ারিতে ইউরোপিয়ান কমিশন জ্বালানিবিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে থাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে। ২০২০ সালের প্রথম দিকে ১৩টি দেশে ১০৯টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু ছিল। সেই বছর তিনটি কেন্দ্র স্থায়ীভাবে বন্ধ করলেও অন্যগুলো এখনো চালু রয়েছে। দেশগুলো হলো ফ্রান্স, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, স্লোভেনিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, স্পেন, রোমানিয়া, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে সর্বত্র জ্বালানি নীতি অনুসৃত হোক, সেটাই আমাদের কাম্য।

সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন