‘বিশ্ব আবারও এক নতুন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।’ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এ কথা বলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। এরপর সি প্রশ্ন তোলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত “থুসিডাইডিস ফাঁদ” অতিক্রম করে বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের নতুন এক ধারা তৈরি করতে পারবে?’
সি চিন পিং এখানে প্রাচীন এথেন্সের ইতিহাসবিদ ও সামরিক কমান্ডার থুসিডাইডিসের কথা উল্লেখ করছিলেন। তিনি দ্য হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেশিয়ান ওয়ার গ্রন্থে এথেন্স ও স্পার্টা—এই দুই গ্রিক নগররাষ্ট্রের প্রায় তিন দশকব্যাপী সংঘাতের ইতিহাস তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এথেন্সের শক্তির উত্থান এবং তা স্পার্টার মধ্যে যে ভীতি তৈরি করেছিল, সেটিই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।’
এই উদ্ধৃতির অনুবাদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মূল বক্তব্যটি হলো—কোনো উদীয়মান শক্তি যখন বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন সংঘাত প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়ে। মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন ২০১০-এর দশকের শুরুতে এই ধারণাকে ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ নামে জনপ্রিয় করেন। আধুনিক পটভূমিতে এখানে চীনকে এথেন্স এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বর্তমান সময়ের স্পার্টা হিসেবে দেখা হয়।
২০১২ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে অ্যালিসন লেখেন, ‘আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি থুসিডাইডিসের ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারবে কি না?’
পরে ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ডেস্টিনড ফর ওয়ার: ক্যান আমেরিকা অ্যান্ড চায়না এস্কেপ থুসিডাইডিস’স ট্র্যাপ?-এ অ্যালিসন এই ধারণা আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি সেখানে যুক্তি দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে—যদি না উভয় পক্ষ তা এড়াতে কঠিন ও বেদনাদায়ক পদক্ষেপ নেয়।’
অ্যালিসন ইতিহাসে এমন ১৬টি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত ভূরাজনৈতিক শক্তি এই ‘ফাঁদের’ মুখোমুখি হয়েছিল। এর মধ্যে ১২টি ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেধেছিল।
সি চিন পিং এমন সময়ে ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর প্রসঙ্গ তুললেন, যখন বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তাইওয়ানসহ নানা ইস্যুতে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
‘অনিবার্য নয়’
সি চিন পিং এই প্রথম ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর প্রসঙ্গ তুললেন, এমন নয়। আধুনিক ভূরাজনীতিতে শব্দবন্ধটি জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন সময় এটি ব্যবহার করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট।
২০১৩ সালে সি চিন পিং বিশ্বনেতাদের বলেছিলেন, ‘আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে থুসিডাইডিস ফাঁদ এড়াতে। এটি হলো উদীয়মান শক্তি ও বিদ্যমান শক্তির মধ্যে, কিংবা দুটি বিদ্যমান শক্তির মধ্যকার এক ধ্বংসাত্মক উত্তেজনা।’
দুই বছর পর, ২০১৫ সালে সিয়াটলে দেওয়া এক ভাষণে সি বলেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া’-কে অগ্রাধিকার দেয়। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি বলেন, বেইজিং চায় ‘আরও বেশি বোঝাপড়া ও আস্থা, কম বিচ্ছিন্নতা ও সন্দেহ।’
সেই ভাষণে সি ভীতি ও পক্ষপাত কমানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে তিনি ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর ভাষায়, সংঘাত অনিবার্য—বিষয়টা এমনটা নয়। তবে বড় শক্তিগুলো যদি বারবার কৌশলগত হিসাবে ভুল করে, তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য এমন ফাঁদ তৈরি করতে পারে।
২০২৩ সালে চীনে মার্কিন সিনেটের তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা চাক শুমারের সঙ্গে বৈঠকেও সি আবার বলেন, ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ অনিবার্য নয়। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এতটাই বড় যে এটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের উন্নয়ন ও যৌথ সমৃদ্ধিকে ধারণ করতে পারে।’
২০২৪ সালে পেরুর রাজধানী লিমায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকেও সি বলেন, ‘থুসিডিডিস ফাঁদ কোনো ঐতিহাসিক অনিবার্যতা নয়।’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নতুন কোনো স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করা উচিত নয়, আর তা জেতাও সম্ভব নয়।’
উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধকে ‘থুসিডাইডিস ফাঁদের’ এমন একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়ায়নি।
এরপর থেকে চীনের কূটনীতিকেরাও যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ব্যাখ্যায় সি চিন পিংয়ের মতো ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে আসছেন।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছুই থিয়েনখাই বলেন, ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘দুই দেশ ও বিশ্বের স্বার্থে আমরা কেমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই? থুসিডাইডিস ফাঁদ কি অতিক্রম করা এতটাই অসম্ভব যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র অবধারিতভাবে যুদ্ধের দিকে যাবে? নাকি দুই দেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমন নতুন পথ তৈরি করতে পারে, যেখানে বড় শক্তিগুলো জিরো-সাম (যেখানে কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারে না) প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্বে যুক্ত হবে?’
২০২১ সালে ছুইয়ের উত্তরসূরি ছিন গ্যাংও ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, দুই দেশকে অবশ্যই ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ’ যৌথভাবে খুঁজে বের করতে হবে।
আর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বর্তমান রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং বলেন, চীনা সংস্কৃতিতেই এই ফাঁদ এড়িয়ে চলার পথ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘চীন এথেন্স নয়, স্পার্টাও নয়।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধ চীনের স্বভাবজাতও নয়, চীনের জন্য লাভজনকও নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
শুধু চীনই নয়, প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস ও তাঁর তত্ত্বের প্রসঙ্গ টেনেছেন মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার ছিলেন থুসিডাইডিস চিন্তাধারার একজন পরিচিত অনুরাগী। ২০১৩ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ মানবজাতিরই অংশ। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস যে মৌলিক কারণগুলোর কথা বলেছিলেন—ভয়, সম্মান ও স্বার্থ—মানুষ আজও সেই কারণেই যুদ্ধ করে।’
পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে গ্রাহাম অ্যালিসন ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে গ্রিক ইতিহাস নিয়ে আলোতপাত করেছিলেন। একই সঙ্গে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসকে থুসিডাইডিসের রচনার বিষয়ে ‘গভীরভাবে অভিজ্ঞ’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জি-কিউ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সাবেক প্রচারকৌশলবিদ ও হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি চীনের সঙ্গে এমন কোনো সংঘাত শুরুর আশঙ্কা করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হতে পারে?
জবাবে ব্যানন বলেন, ‘আমি মনে করি না, এমনটা অবশ্যম্ভাবী। কারণ, উদীয়মান শক্তি ও ক্ষয়িষ্ণু শক্তির পুরো ধারণাটিই ধরে নেয় যে বড় শক্তিটি ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকবে।’
তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আসলে ‘যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করছে এবং একই সঙ্গে চীনকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।’
চ্যাড ডি গুজম্যান টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদক
টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত