রংপুর কি এ দেশের অঞ্চল নয় নাকি বাংলা মায়ের সতিন—এই শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম ২০২৪ সালের ১৫ জুন। এ লেখার কারণ ছিল ওই বছর প্রস্তাবিত বাজেটে রংপুরের জন্য তেমন কোনো বরাদ্দই রাখা ছিল না। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দে ছিল এক লাখ টাকা। সারা দেশে সিটি করপোরেশনে যখন বরাদ্দ ছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, তখন রংপুরের জন্য ছিল মাত্র ২০ কোটি টাকা। কোনো কোনো বছর সিটি করপোরেশনের জন্য উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দই দেওয়া হয়নি।
দেশের উন্নয়নের সব খাতে রংপুরের সঙ্গে চরম বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকার দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলিতে দেশ পরিচলনা করেছে। যে বৈষম্য দূর করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই বৈষম্য দূর করার চেষ্টাও করেনি।
‘রংপুর কি বাংলা মায়ের অঞ্চল নাকি বাংলা মায়ের সতিন’ লেখা প্রকাশের পরের মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জোরালো হয় এবং আগস্টের ৫ তারিখে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পতন নিশ্চিত হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকারের পতনের পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বৈষম্য দূরীকরণের চেষ্টা করেনি। বরং সরকার গঠনেই বৈষম্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রংপুর বিভাগের একজন উপদেষ্টাও নেওয়া হয়নি উপদেষ্টা পরিষদে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩ জন উপদেষ্টা বিভিন্ন সময় নেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ গঠনেও বৈষম্য চরমেই থেকে যায়।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে সারা দেশে এক লাখ ৭৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ছিল। এর বাইরে দেশে ছিল ১০টি মেগা প্রকল্প। ১০টি মেগা প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন লাখ কোটি টাকা। ১০টি মেগা প্রকল্পের একটিও ছিল না রংপুরে। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য মাত্র দশমিক ৯৮ শতাংশ, অর্থাৎ এক শতাংশের চেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরে কেবল গোপালগঞ্জের ১২ লাখ মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। প্রতিবছরই রংপুরের জন্য বরাদ্দ প্রায় এ রকমই থাকত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো ১২ ফেব্রুয়ারি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ হবে। এই মন্ত্রিপরিষদে রংপুর বিভাগের প্রতিনিধিত্ব কেমন হবে, তা আমরা জানি না। অনেকে আশা করছেন, এবারে মন্ত্রিপরিষদে রংপুর বিভাগের কয়েকজন পূর্ণ মন্ত্রী থাকবেন এবং তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পাবেন। বাস্তবে থাকবেন কি না, তা দেখার জন্য ১৭ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ২০টি সভায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা তাঁর নিজের বিভাগের জন্য। রংপুরের জন্য মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
শেখ হাসিনা বলেছিলেন রংপুরের উন্নয়নের জন্য কাউকে ভাবতে হবে না। তিনি রংপুরের পুত্রবধূ হিসেবে এখানকার উন্নয়ন করে দেবেন। বাস্তবে দেশের সবচেয়ে গরিব ১০টি জেলার একটি হয়েছিল রংপুর। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান উপদেষ্টা প্রথম সফর করেছেন রংপুরে। শহীদ আবু সাঈদ বৈষম্য দূরীকরণের জন্য জীবন দিয়েছেন। শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে প্রধান উপদেষ্টা রংপুরে এসে বলেছিলেন রংপুর হবে দেশের এক নম্বর জেলা। সেই এক নম্বর হয়তো হয়েছে তলানিতে পড়ে থাকার দিক থেকে, উন্নত হওয়ার দিক থেকে নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো ১২ ফেব্রুয়ারি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ হবে। এই মন্ত্রিপরিষদে রংপুর বিভাগের প্রতিনিধিত্ব কেমন হবে, তা আমরা জানি না। অনেকে আশা করছেন, এবারে মন্ত্রিপরিষদে রংপুর বিভাগের কয়েকজন পূর্ণ মন্ত্রী থাকবেন এবং তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পাবেন। বাস্তবে থাকবেন কি না, তা দেখার জন্য ১৭ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু তালিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনো গণমাধ্যম নিশ্চিত করে কিছু লিখছে না। বিএনপির পক্ষেও কোনো মতামত দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে রংপুর বিভাগে আটটি জেলার রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামের ১৯টি সংসদীয় আসনের ১৮টি পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র দল। রংপুর বিভাগ অধিকাংশ সময়ে বিরোধী দলে থেকেছে। অতীতে জাতীয় পার্টির হয়ে, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে।
রংপুর সব সময় দুঃখিনী বিভাগ। আওয়ামী লীগের সময়ে সারা দেশে যখন গরিব মানুষের সংখ্যা কমেছে, তখনো রংপুরে গরিব মানুষের সংখ্যা বেড়েছিল। এর প্রধান কারণ দেশে সুষম উন্নয়ন না হওয়া। রংপুর বিভাগের এমন কাউকে নীতিনির্ধারণীতে দেখা যায় না, যিনি প্রভাবক হয়ে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন।
এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের সময় যেন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যটা থাকে। রংপুর অঞ্চলের সবচেয় বড় দুঃখ তিস্তা। এই তিস্তা নদীর দুঃখ লাঘবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে লড়াকু ব্যক্তি আসাদুল হাবিব দুলু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অতীতে তাঁর মন্ত্রণালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে।
তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এ অঞ্চলে এমন আন্দোলন সংগঠিত করেছেন যে কেউ কেউ তাঁকে নদীর প্রশ্নে নূরলদীনের সঙ্গেও তুলনা করে থাকেন। তিনি নদী নিয়ে বইও লিখেছেন। উজান থেকে যে পানি বাংলাদেশে আসে তার প্রায় ৭০ শতাংশ কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীর দুঃখ, নদীপারের মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন এমন ব্যক্তিকে পানিসম্পদ মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী হিসেবে প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নামগুলো মন্ত্রীর তালিকায় আছে মর্মে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই সম্ভাবনাময় তালিকাগুলোর একটিতে দেখলাম পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে আসাদুল হাবিব দুলুর নাম আছে। এই নাম চূড়ান্ত হলে তিনি এ অঞ্চলের দুঃখ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে মনে করি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, আসাদুল হাবিব দুলু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ অনেকে আছেন, যাঁরা মন্ত্রিপরিষদে থাকতে পারেন। সরকার যদি বৈষম্য দূরীকরণ মন্ত্রণালয় চালু করত, তাহলে সারা দেশের বৈষম্য লাঘবে বড় কাজ করা যেত। কেবল রংপুর বিভাগ নয়, পার্বত্য এলাকাসহ আরও যে এলাকাগুলো পিছিয়ে আছে, সেগুলোর দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
যে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হচ্ছে, তা এমনভাবে গঠন করা হোক, যাতে এ অঞ্চলের মন্ত্রীরা অর্ধশতাধিক বছর ধরে বৈষম্যের তলানিতে পড়ে থাকা বিভাগের বৈষম্য দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। একটি অঞ্চলকে পিছিয়ে রেখে দেশের সামষ্টিক উন্নয়ন কখনো হতে পারে না। ছোট্ট এই দেশে সুখে-দুঃখে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক সবার সমান।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
