চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র: ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ঝুঁকি

অর্থনীতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির বিবেচনায় বাংলাদেশকে কাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে হবে, তা নিয়ে লিখেছেন এ কে এম আহসান উল্লাহ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়ই একটি প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে, দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, নাকি অন্য কোনো শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকবে? প্রশ্নটি আকর্ষণীয়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য খুব উপযোগী নয়। কারণ, আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থায়ী আনুগত্যের ওপর নয়, স্বার্থের নির্দিষ্ট বিনিময়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

একই রাষ্ট্র নিরাপত্তায় এক দেশের, প্রযুক্তিতে আরেক দেশের, বাণিজ্যে তৃতীয় দেশের এবং শ্রমবাজারে চতুর্থ দেশের অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশেরও এখন বন্ধু নির্বাচনের পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক অংশীদারত্বের মানচিত্র তৈরি করা দরকার।

এই প্রয়োজন আরও জরুরি হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এ উত্তরণ মর্যাদার, কিন্তু একই সঙ্গে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা, বিশেষ বাজার প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে।

দেশের রপ্তানি এখনো অল্প কয়েকটি বাজার ও তৈরি পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল বস্ত্রপণ্য, একই সময়ে পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ বাংলাদেশের কূটনীতির পরবর্তী পর্যায়ে বাজার, দক্ষতা, প্রযুক্তি, চলাচল ও জ্ঞান অর্জনের পরিমাপযোগ্য ফল থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ভারত, এটি আবেগের সিদ্ধান্ত নয়, ভূগোলের বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের প্রায় পুরোটাই ভারতবেষ্টিত; নদী, সীমান্ত, বিদ্যুৎ, সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং নেপাল-ভুটানে বাংলাদেশের প্রবেশ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারত অপরিহার্য।

কিন্তু সম্পর্ক মানে একমুখীনির্ভরতা নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে এমন কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে সহযোগিতার সুফল দৃশ্যমান ও পারস্পরিক হয়। অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো হতে পারে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্তে বেসামরিক প্রাণহানি বন্ধ, রেল ও নৌসংযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি–বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভিসা সহজীকরণ এবং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস।

দক্ষিণ এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ অঞ্চলটির নিজেদের মধ্যে হয়, অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমান ২৩ বিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক বাণিজ্য অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের ভারতমুখী রপ্তানিও বহুগুণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক সরকারগুলোর ঘনিষ্ঠতা দিয়ে বিচার না করে বাজার, পানি, সীমান্ত ও যোগাযোগে অর্জিত ফল দিয়ে পরিমাপ করতে হবে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া: উন্নয়ন-অর্থায়ন প্রযুক্তির অংশীদারত্ব

জাপান বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে কম বিতর্কিত এবং উচ্চ সম্ভাবনাময় কৌশলগত অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে জাপান অবকাঠামো, উন্নয়ন-অর্থায়ন, পরিবহন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ২০২৫ সালে জাপান বাংলাদেশকে বাজেট–সহায়তা, রেল আধুনিকায়ন, শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল।

তবে সম্পর্ককে শুধু সেতু, বন্দর বা ঋণের মধ্যে আটকে রাখলে হয় না। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তী অংশীদারত্ব হওয়া উচিত শিল্পপ্রযুক্তি, মানসম্মত উৎপাদন, প্রকৌশলশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পরিচর্যাকারী দক্ষ কর্মী তৈরিতে। জাপানের শ্রমসংকট বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, কিন্তু অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো মডেলে নয়। ভাষা, পেশাগত সনদ, আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগের আগে দক্ষতা যাচাইয়ের যৌথ ব্যবস্থা গড়তে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োজন। কোরিয়া বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ করে, কিন্তু সম্পর্কের সম্ভাবনা শ্রমবাজারের চেয়ে অনেক বড়। ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ব্যাটারি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। বড় কোরীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বাংলাদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য নয়, বাংলাদেশে উৎপাদন, গবেষণা ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ার জন্য আকৃষ্ট করতে হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন: পোশাকের বাজার ও জ্ঞানের অংশীদার

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিবাজারগুলোর একটি। কিন্তু বাংলাদেশের ইউরোপনীতি দীর্ঘদিন ধরে পোশাকের শুল্কসুবিধাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর এ সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে।

জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও ডেনমার্কের সঙ্গে আলাদা খাতভিত্তিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন। জার্মানির সঙ্গে প্রকৌশল, সবুজ শিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ; নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা, বদ্বীপ পরিকল্পনা ও কৃষিপ্রযুক্তি; ফ্রান্সের সঙ্গে বিমান, উপগ্রহ, সামুদ্রিক গবেষণা ও সংস্কৃতি; ইতালির সঙ্গে বৈধ শ্রম চলাচল ও ক্ষুদ্র শিল্প; নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রশাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানো যায়।

ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি টেকসই বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, যেখানে শ্রম অধিকার, পরিবেশ মান, কার্বন নির্গমন, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণে বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকবে। ইউরোপকে শুধু ক্রেতা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশ সস্তা শ্রমের ঘরে আটকে থাকবে; প্রযুক্তি, নকশা, গবেষণা ও ব্র্যান্ডিংয়ের অংশীদার করতে পারলে মূল্যশৃঙ্খলের ওপরের দিকে উঠতে পারবে।

শিক্ষার্থী ও গবেষকদের চলাচলও এ সম্পর্কের কেন্দ্রে আনা দরকার। যৌথ ডিগ্রি, গবেষণাগার, জলবায়ু গবেষণা, জনস্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অভিবাসন গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা উচিত। ভিসা সহজীকরণও শুধু পর্যটকের জন্য নয়; গবেষক, শিক্ষক, শিল্প প্রশিক্ষণার্থী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা চলাচলব্যবস্থা দরকার।

# সম্পর্ক মানে একমুখী নির্ভরতা নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে এমন কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে সহযোগিতার সুফল দৃশ্যমান ও পারস্পরিক হয়। # চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং ভারত-চীন বিরোধে বাংলাদেশের একটি সম্পর্ক অন্যটির কাছে সন্দেহজনক মনে হতে পারে। এর সমাধান গোপন ভারসাম্য নয়, ঘোষিত স্বচ্ছতা। # বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী মূলনীতি হতে পারে: ভূগোলে প্রতিবেশী, অর্থনীতিতে বহুমুখী, প্রযুক্তিতে উচ্চাভিলাষী এবং কূটনীতিতে স্বচ্ছ।

উপসাগরীয় রাষ্ট্র: অর্থনৈতিক সহ-উৎপাদন

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েত বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রবাসী আয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি; ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন মাসেও মাসিক প্রবাসী আয় ২–৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল।

কিন্তু উপসাগরীয় সম্পর্ক এখনো প্রধানত শ্রমিক পাঠানো, জ্বালানি কেনা এবং ধর্মীয় যোগাযোগে সীমাবদ্ধ। এই মডেল বদলানো দরকার। উপসাগরীয় দেশগুলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নির্মাণপ্রযুক্তি, খাদ্যনিরাপত্তা, বিমান চলাচল ও আর্থিক সেবায় বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের উচিত তাদের সঙ্গে দক্ষতা অংশীদারত্ব গড়ে তোলাকোন পেশায় কত কর্মী প্রয়োজন, সে অনুযায়ী বাংলাদেশে যৌথ প্রশিক্ষণ ও প্রত্যয়নকেন্দ্র স্থাপন করা।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে সৌদি, আমিরাত ও কাতারের বিনিয়োগকে বন্দর, পরিবহন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আকৃষ্ট করা যায়। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর খাদ্যনিরাপত্তার প্রয়োজন আছে; বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের পুঁজি ও প্রযুক্তির প্রয়োজন আছে। এই দুই প্রয়োজনকে যুক্ত করে চুক্তিভিত্তিক কৃষি নয়; বরং যৌথ মালিকানা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির ব্যবস্থা গড়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, নিয়োগ ব্যয়, ক্ষতিপূরণ, সামাজিক সুরক্ষা ও চাকরি পরিবর্তনের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় দর-কষাকষি। বেশি কর্মী পাঠানো সফলতা নয়, যদি তারা ঋণগ্রস্ত, অরক্ষিত ও অদক্ষ অবস্থায় যায়।

আসিয়ান: বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হলেও তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্ককে তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সিঙ্গাপুর হতে পারে আর্থিক সেবা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নগর-পরিকল্পনা, প্রযুক্তি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সালিসের অংশীদার। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, হালাল অর্থনীতি, ইলেকট্রনিকস ও স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা সম্ভব। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ওষুধ, কৃষি, মুসলিম ভোক্তাবাজার, প্রতিরক্ষাশিল্প ও সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানো যায়। থাইল্যান্ডের সঙ্গে চিকিৎসা, পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও বঙ্গোপসাগরীয় যোগাযোগ; ভিয়েতনামের সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি, ইলেকট্রনিকস, কৃষি উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে শেখার সুযোগ রয়েছে।

আসিয়ান দেখিয়েছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য থাকলেও অর্থনীতি ও যোগাযোগে কার্যকর সহযোগিতা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার আন্ত–আঞ্চলিক বাণিজ্য যেখানে প্রায় ৫ শতাংশ, আসিয়ানে তা প্রায় ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশকে তাই আসিয়ানের সঙ্গে খাতভিত্তিক চুক্তি, ব্যবসায়িক ভিসা, সরাসরি বিমান ও জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক গড়তে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট এই পূর্বমুখী নীতিকে জটিল করবে, কিন্তু পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে একটি দেশের আচরণের কাছে জিম্মি করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন অনেক বন্ধু নয়; প্রয়োজন এমন অংশীদার, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক নাগরিকের জীবনে ফল দেয়—কর্মসংস্থান বাড়ায়, ভিসা সহজ করে, শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে, প্রযুক্তি আনে, রপ্তানি বহুমুখী করে এবং রাষ্ট্রের দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। পৃথিবী এখন আনুগত্যের শিবিরে বিভক্ত হলেও সফল রাষ্ট্রগুলো একটিমাত্র শিবিরে নিজেদের ভবিষ্যৎ জমা রাখে না।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারসাম্যের কাজ

চীন বাংলাদেশের বৃহৎ আমদানি উৎস, অবকাঠামো অংশীদার, উৎপাদনযন্ত্রের সরবরাহকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তি। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাণিজ্য–ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশি পণ্যের বাজার প্রবেশ, উৎপাদন স্থানান্তর, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্পের কাঁচামালের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। ঋণনির্ভর প্রকল্পের বদলে যৌথ বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনকে প্রাধান্য দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিবাজার এবং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও প্রবাসী নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য ছিল বলে রপ্তানি তথ্যে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু নির্বাচন, নিষেধাজ্ঞা বা নিরাপত্তা আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাজার প্রবেশ, তুলা ও বস্ত্র সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, ওষুধ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জ্ঞান ও পুঁজি স্থানান্তরের দিকে নিতে হবে।

সমস্যা হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং ভারত-চীন বিরোধে বাংলাদেশের একটি সম্পর্ক অন্যটির কাছে সন্দেহজনক মনে হতে পারে। এর সমাধান গোপন ভারসাম্য নয়, ঘোষিত স্বচ্ছতা। বাংলাদেশকে বলতে হবে—কোন প্রকল্প কার সঙ্গে, কেন, কোন অর্থনৈতিক মূল্যায়নে এবং কী শর্তে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা, বন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সংসদীয় পর্যালোচনা, ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং উন্মুক্ত দরপত্র সন্দেহ কমাতে পারে।

সম্পর্কের ঝুঁকি এবং উত্তরণ

এক দেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অন্য দেশকে উদ্বিগ্ন করতে পারে। ভারতের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত চীনা কৌশলগত উপস্থিতি উদ্বেগের; চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামোর দিকে ঝোঁকা সমস্যা; পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কাছে মানবাধিকার ও শ্রমমান গুরুত্বপূর্ণ; মুসলিম বিশ্ব আবার ফিলিস্তিনসহ কিছু প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান লক্ষ করে।

এই ঝুঁকি এড়ানোর কার্যকর পথ হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ কথাটি পুনরাবৃত্তি নয়; বরং সম্পর্ককে বিষয়ভিত্তিক রাখা। যেমন চীনের সঙ্গে শিল্প ও অবকাঠামো, জাপানের সঙ্গে মানসম্মত উন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাজার ও প্রযুক্তি, ভারতের সঙ্গে সংযোগ ও পানি, ইউরোপের সঙ্গে সবুজ রপ্তানি, উপসাগরের সঙ্গে শ্রম ও বিনিয়োগ এবং আসিয়ানের সঙ্গে উৎপাদন ও আঞ্চলিক সংযুক্তি।

দ্বিতীয়ত, কোনো দেশকে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবেশদ্বার হতে দেওয়া যাবে না। জ্বালানি, অস্ত্র, ঋণ, আমদানি, রপ্তানি ও শ্রমবাজার—প্রতিটি ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প রাখতে হবে। তৃতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সম্পর্কের বদলে প্রতিষ্ঠাননির্ভর করতে হবে। সরকার বদলালেও যে চুক্তি টিকে থাকে, সেটিই টেকসই কূটনীতি।

বাংলাদেশের প্রয়োজন অনেক বন্ধু নয়; প্রয়োজন এমন অংশীদার, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক নাগরিকের জীবনে ফল দেয়—কর্মসংস্থান বাড়ায়, ভিসা সহজ করে, শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে, প্রযুক্তি আনে, রপ্তানি বহুমুখী করে এবং রাষ্ট্রের দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। পৃথিবী এখন আনুগত্যের শিবিরে বিভক্ত হলেও সফল রাষ্ট্রগুলো একটিমাত্র শিবিরে নিজেদের ভবিষ্যৎ জমা রাখে না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী মূলনীতি তাই হতে পারে—ভূগোলে প্রতিবেশী, অর্থনীতিতে বহুমুখী, প্রযুক্তিতে উচ্চাভিলাষী এবং কূটনীতিতে স্বচ্ছ। সম্পর্কের গভীরতা ছবি, সফর বা যৌথ বিবৃতিতে নয়, কত নতুন বাজার খুলল, কত দক্ষ কর্মী মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পেল, কত গবেষণা সৃষ্টি হলো, কত শিক্ষার্থী চলাচলের সুযোগ পেল এবং সাধারণ নাগরিকের পাসপোর্ট কতটা কার্যকর হলো, সে হিসাবেই মাপতে হবে।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

  • মতামত লেখকের নিজস্ব