একসময় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার জালিয়াতিকে ‘কিছুই না’ বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। পরে সংসদে এ জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করেছিলেন তিনি (বিবিসি, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১২)। আমি সেই অর্থে ৪৩ কোটি টাকাকে ছোট করে দেখছি না, আমার বিবেচনা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখন অর্থ যখন খোলামকুচির মতো করে অপচয় হচ্ছে, সে সময় আলাদা করে মাত্র ৪৩ কোটি টাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া কতটা যথাযথ!

প্রকল্প হিসেবে এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং বাস্তবায়ন কোনো নতুন বিষয় নয়। ঢাকায় বসবাসকারীদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে যানজটে নাকাল হওয়া। কিন্তু এই শহরে ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ বলে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। তিন বছরের সেই প্রকল্প এখনো চলছেই। সব মিলে নগরীর মাত্র চারটি মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম (আইটিএস) চালু করা হবে বলা হয়েছিল।

ইতিমধ্যে সার্ভার কম্পিউটার চুরি হয়েছে; সার্ভার ও আইটিএসের সংযোগ তার কাটা পড়েছে (সমকাল, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২)। বিশেষজ্ঞরা গোড়া থেকেই বলে আসছেন, এটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প। এর বাইরে এমন সব প্রকল্প নেওয়া হয়, যেগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানোর পর ফেলে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না। এমন খবর প্রতিদিন কোনো না কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এর সঙ্গে আছে ইচ্ছেমাফিক ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প হাতে নিয়ে দফায় দফায় সময় এবং ব্যয় বাড়িয়ে সেগুলো অব্যাহত রাখা। দেশের মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে ‘অনুমানের’ ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প নিয়ে তার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে এরপর তা সংশোধিত হচ্ছে দফায় দফায়। চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দারা এ কথার মর্ম বুঝতে পারবেন।

এসব সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, এগুলো ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু এসব নিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার কোনো আগ্রহ কারোরই নেই, কেউ এসব নিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও শোনা যায়নি। আগামী দিনেও কেউ দায়িত্ব নেবেন—এমন আশা করার কারণ নেই। গোটা শাসনব্যবস্থাই এখন এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীনেরা কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য বলে মনে করেন না, পরামর্শ দেওয়াকেই তাঁদের কাজ বলে মনে করেন।

লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মীয়মাণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ৩ বছর। ২০২২ সালে এসে দেখা গেছে, কাজ শেষ হয়নি। কারণ, এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ‘অনুমানে’র ভিত্তিতে ‘তড়িঘড়ি’ করে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এখন ব্যয় বাড়ছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, সময় বাড়ছে আরও চার বছর (প্রথম আলো, ১৮ মে ২০২২)। এগুলো হচ্ছে কোভিড অতিমারি শুরু হওয়ার আগে শুরু হওয়া প্রকল্পের কথা।

কোভিড অতিমারি শুরু হওয়ার পর বলা হলো, সাশ্রয়ী হতে হবে। কিন্তু আবার এটাও দেখানো দরকার হলো যে সবকিছু স্বাভাবিক আছে এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা চলছে। ফলে সাশ্রয়ী হওয়ার কথা স্বল্প সময়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। এ বছরের মাঝামাঝি থেকে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে মন্ত্রীরা বলতেই থাকলেন যে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করা হবে।

এখনো সে কথাই শোনা যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি প্রত্যেক পরিবারকে অনুরোধ করব; তারা যেন যতটুকু পারেন, সঞ্চয় করেন এবং এটি আমাদের সরকারের জন্যও প্রযোজ্য। সরকার কোনো অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করবে না।’ কিন্তু কৃচ্ছ্রতার ক্ষেত্রে যা বলা হচ্ছে, আর যা করা হচ্ছে, তার মধ্য ফারাক বিস্তর।

সাধারণ নাগরিকদের বলা হচ্ছে সঞ্চয় করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ মানুষের এই পরামর্শ শোনার মতো অবস্থা নেই। জুলাই মাসের হিসাবে দেখা গেছে, মানুষ ‘সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে’, ‘কেউ সঞ্চয়পত্র ভেঙে খাচ্ছেন, কেউ সংসার চালাচ্ছেন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা শেয়ার লোকসানে বিক্রি করে’ (প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০২২)।

এই হিসাবের পর দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ঘটেছে সরকারি হিসাবেই ৯.১%-এর ওপর, আর বাজারের অবস্থা কী, সেটা বাংলাদেশে যাঁরা আছেন, তাঁরা আরও ভালো জানেন। আইএমএফের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে বাংলাদেশে।

সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কী, সেটা উঠে এসেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে। মানুষের কাছে তাঁদের গত ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ কী, জানতে চাইলে ৬৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, খাবার কিনতেই তাঁদের হিমশিম অবস্থা (প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর ২০২২)। কেবল খাবার কেনার জন্য যখন দেশের এক বড় অংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করছে বা ঋণ করছে, সেই সময় তাদের সঞ্চয়ের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা কৃচ্ছ্রসাধনের কথাগুলো শুনতে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, আচরণের দিকে তাকালে তা আকাশ-কুসুম কল্পনার মতোই মনে হয়। তার একটা উদাহরণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ইভিএম প্রকল্প; মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। ইভিএমের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা—এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যদি আপাতত পাশেও সরিয়ে রাখি, প্রশ্ন হচ্ছে, একে কোন বিবেচনায় প্রয়োজনীয় বলে বর্ণনা করা যাবে? এর চেয়ে বড় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প আর কী হতে পারে?

আসন্ন সংকটের মাত্রা কী, তা বোঝার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পড়ে দেখা যেতে পারে। তাতে বলা হচ্ছে, যে ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা দেখা দিতে পারে, বাংলাদেশ তার একটি। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা নিম্নমুখী।

অপ্রয়োজনীয় এসব প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং সেগুলোর সূত্রে যাঁরা লাভবান হচ্ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই খাদ্যসংকটে পড়া ৬৮ শতাংশের মানুষ নন। তাঁরা এই অবস্থার সুবিধাভোগী। এ ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণির আরেক চেহারা দেখতে পাওয়া যায় জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিকে তাকালে। দেশে যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট মানুষের জীবন পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে, সে সময়ও তাঁদেরকে দেওয়া ভর্তুকি চলছেই। কেউ কেউ বসে বসে খাচ্ছেন আর কারও নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালেও বোঝা যায় যে কারা এই অবস্থায় লুটপাটের এক মহোৎসব তৈরি করেছেন। ব্যাংক খাতে এ বছরের মার্চ থেকে জুন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা।

এই বছরের মার্চ মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, জুন মাসে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। পুরোনো কিছু খেলাপি ঋণ যুক্ত করলে দাঁড়ায় এপ্রিল-জুন পর্যন্ত নতুন করে ঋণ খেলাপি হয়েছে ১৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা (যুগান্তর, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২)। তারপর আরও তিন মাস পার হয়েছে, গত এক দশকের প্রবণতা লক্ষ করলে বলা যায়, এখন অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

এসব সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, এগুলো ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু এসব নিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার কোনো আগ্রহ কারোরই নেই, কেউ এসব নিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও শোনা যায়নি। আগামী দিনেও কেউ দায়িত্ব নেবেন—এমন আশা করার কারণ নেই। গোটা শাসনব্যবস্থাই এখন এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীনেরা কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য বলে মনে করেন না, পরামর্শ দেওয়াকেই তাঁদের কাজ বলে মনে করেন।

  • আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট