গত সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে লেবাননের দক্ষিণে আল তাহির পাহাড়ের নিচের একটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। ওই স্থানটি ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে অবস্থিত। এটি ছিল হিজবুল্লাহর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। এ কারণে ইরানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিজবুল্লাহ বড় ধাক্কা খায়। গত দুই বছরে সংগঠনটি তাদের অনেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও অস্ত্রের বড় অংশ হারিয়েছে।
তবে আরও দক্ষিণে ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের আরেকটি অংশ শক্তিশালী হচ্ছিল। ইয়েমেনে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা দখল করে বাব আল–মানদেব প্রণালির দিকে এগিয়ে যায়। এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে।
২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের পতন ও হিজবুল্লাহর দুর্বলতা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব কমিয়েছে। তবে চলমান যুদ্ধ ইরানের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোয় তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের এক অঞ্চলে প্রভাব হারিয়ে অন্য অঞ্চলে নতুন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছে ইরান।
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এই রূপান্তরের একটি অংশমাত্র। লোহিত সাগরে হুতিদের আধিপত্য বাড়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথে তারা প্রভাব খাটাচ্ছে। অন্যদিকে ইরাকের ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আঞ্চলিক তেল পাইপলাইন আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বিকল্প পথগুলোও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরান প্রবল চাপে থাকলেও অন্যান্য অঞ্চলে সংকট তৈরি করার ক্ষমতা তাদের এখনো রয়েছে।
২০২৬ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এহিয়া রহিম সাফাবি এক সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সিরিয়া ও লেবাননের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও সিরিয়ার মাধ্যমে রসদ সরবরাহের পথ ছিল ইরানের কৌশলগত সুরক্ষার মূল ভিত্তি। কিন্তু সেই কৌশলের ভিত্তি এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। আসাদ সরকারের পতনে ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে হারায় এবং হিজবুল্লাহকে সহায়তা পাঠানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহর আক্রমণের ক্ষমতা কমে যায়। পরবর্তী সময় ইরান ভূখণ্ডে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক মিত্ররা আর আগের মতো সুরক্ষা দিতে পারছে না।
তবু ইরান নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধের মধ্যেও আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে নতুন পথ তৈরি করছে তারা। ৮ জুন কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি একটি নতুন নিরাপত্তাবলয়ের কথা ঘোষণা করেন। এই বলয় হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল–মানদেব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। তার এ বক্তব্য দেখায় যে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে ইরান ও তার মিত্ররা জোর দিচ্ছে।
হুতিরা লোহিত সাগরের মোখা বন্দর এবং পেরিম দ্বীপ দখল করায় গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তাদের অবস্থান শক্ত হয়েছে। এর ফলে তারা সমুদ্রের জাহাজ চলাচলের ওপর নজর রাখতে পারছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ না করেও তারা প্রভাব ফেলছে। হুতিরা কেবল নির্দিষ্ট জাহাজে হামলার কথা বললেও এই হুমকির কারণে পরিবহন খরচ ও বিমা ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তাদের কেবল ইরানের নির্দেশনায় চলা দল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইয়েমেনের ভেতরে নিজেদের শাসন শক্ত করা এবং সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
ইরান থেকে সামরিক উপদেষ্টা ও ড্রোন প্রযুক্তি পাঠিয়ে হুতিদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। হুতিরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের লড়াই তাদের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকি তৈরি করায় লোহিত সাগরের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। এতে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের প্রভাব আরও বেড়েছে। সৌদি আরব তাদের জ্বালানি রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালির দিকে ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছে। তবে সেখানেও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা নেই। ইরান ও হুতিদের কৌশল হলো যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশল বদলাতে বাধ্য হন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি; বরং ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন হুমকি তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘায়িত যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে সাহায্য করবে না। সৌদি আরবও তাদের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল হতে চাইবে না। তারা বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে আরও ঝুঁকে পড়তে পারে।
সৌদি আরবের জন্য হরমুজ ও বাব আল–মানদেব উভয়সংকট তৈরি করেছে। পারস্য উপসাগর দিয়ে সীমিত আকারে তেল রপ্তানি হলেও যেকোনো সময় হামলার ঝুঁকি থেকে যায়। একইভাবে লোহিত সাগরের বন্দরগুলোয় তেল পাঠানোও নিরাপদ নয়।
সৌদি আরবের ভেতরে স্থলভাগের পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। সম্প্রতি ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলায় সৌদি পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইনের তিনটি পাম্পস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ হামলা প্রমাণ করে যে বিকল্প স্থলপথও নিরাপদ নয়। ইরাকি তেল ইউরোপে পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও এটিকে একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে দায়িত্ব অস্বীকার করলেও ইরাক থেকে ছোট ছোট দল ব্যবহার করে হামলা চালানো হচ্ছে। ইরান, ইয়েমেন ও ইরাক ফ্রন্টের মধ্যে সরাসরি একক সামরিক নির্দেশ না থাকলেও সব হামলা একসঙ্গে বড় প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ইরাক সরকার নিজের দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ইরানি নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করছে দীর্ঘায়িত সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে এবং আলোচনায় ইরানের অবস্থান শক্তিশালী করবে। তবে দীর্ঘ যুদ্ধ ইরানের নিজের অর্থনীতির জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি; বরং ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন হুমকি তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘায়িত যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে সাহায্য করবে না। সৌদি আরবও তাদের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল হতে চাইবে না। তারা বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে আরও ঝুঁকে পড়তে পারে।
হামিদরেজা আজিজি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক
দ্য টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত