২০২৪ সালের জুন মাসে ‘রংপুর কি এ দেশের অঞ্চল নয় নাকি বাংলা মায়ের সতিন’ শিরোনামে প্রথম আলোতে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। নিজের এই লেখার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি, ‘২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের সব সিটি করপোরেশনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। ওই বছর রংপুর সিটি করপোরেশন পেয়েছিল মাত্র ৪৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও মোট বরাদ্দ প্রায় একই রকম ছিল। ওই বছর রংপুর সিটি পেয়েছিল ২০ কোটি টাকা। এ বছর প্রস্তাবিত বাজেটে ১২ সিটি করপোরেশনের টাকার পরিমাণ ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। রংপুরে এক টাকাও নেই।’ এর অর্থ দাঁড়ায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বরাদ্দ ছিল ‘শূন্য’ টাকা।
সম্প্রতি রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য সরকারের কোনো বরাদ্দ নেই উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ করছিলেন। তিনি একটি তথ্য আমার সঙ্গে শেয়ার করেন। সরকারের দপ্তর বা সংস্থাভিত্তিক উন্নয়ন বাজেটের বিভাজন শিরোনামে শেয়ার করা সেই তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বরাদ্দ ০.০০ টাকা। ওই তথ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলনেও দেখানো হয়েছে ০.০০ টাকা। অর্থাৎ এক টাকাও বরাদ্দ নেই। রংপুর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব যে আয়, তা দিয়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনে প্রচুর বরাদ্দ দেওয়া হলেও রংপুরের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। কী আশ্চর্যজনক! যখন রংপুরে সামান্য বরাদ্দ ছিল, তখনো রংপুরের চেয়ে আয়তনে ছোট, জনসংখ্যাও কম ও নবীন সিটি করপোরেশনের জন্যও রংপুরের তুলনায় অনেক গুণ বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অতীতেও রংপুরে যে সামান্য বরাদ্দ দিয়েছিল, তা না দেওয়ারই নামান্তর।
রংপুরের মানুষের তুমুল আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার সিটি করপোরেশন ঘোষণা করেছে। কিন্তু এর উন্নয়নে কোনো মনোযোগ দেয়নি। বৈষম্যের ধারাবাহিকতা জারি থাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও। অন্তর্বর্তী সরকার তো রংপুর নামে একটি বিভাগ আছে, সেটাই ভুলে গিয়েছিল। সে সরকারের একজন উপদেষ্টাও রংপুর বিভাগ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার একনেকে যতগুলো প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, সেগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই সরকারের সময়ও রংপুরের প্রতি কী সীমাহীন বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে।
সীমাহীন জেলাপ্রীতি, উপজেলাপ্রীতির ভিড়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের দিকে তাকানোর কেউ নেই। নির্বাচিত সরকার, গায়ের জোরে ভোট নেওয়া সরকার, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সরকার, আমলা, রাজনৈতিক নেতা—সবাই কেবল নিজ জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা দেখতে পান। এখন একটাই প্রশ্ন, রংপুরের উন্নয়ন কি হবে না?
বর্তমানে রংপুরের জনপ্রতিনিধি জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত। এই সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন বিষয়ে জামায়াত থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি কতখানি ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা–ও প্রশ্নসাপেক্ষ। কেবল তা–ই নয়, রংপুর জেলার সব কটি আসনেই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য। তাহলে কি রংপুর সিটি করপোরেশনের বৈষম্যের কলঙ্কতিলক আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে?
দেশে এমন দৃষ্টান্ত থাকা প্রয়োজন, সংসদে সরকারদলীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি না থাকলেও কিংবা প্রভাব বিস্তারকারী আমলা না থাকলেও সমতাভিত্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে প্রথম মেয়রের সম্পর্ক ভালো ছিল না। এমনকি রংপুরের জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল তিক্ত। আমরা ভেবেছিলাম শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু মেয়র না থাকলে বরাদ্দ বাড়তে পারে। এরপর মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলেন জাতীয় পার্টির নেতা মোস্তাফিজার রহমান। জাতীয় পার্টি যখন সরকারের কথায় উঠবস করা বিরোধী দল, সেই দলের নেতা তিনি। মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারার সরল ক্ষমতা তাঁর আছে। দ্বিতীয়বারের মতো তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর সময়ে বরাদ্দ কমতে কমতে ‘শূন্য’ টাকায় এসে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তী সরকার শূন্য বরাদ্দের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে কোনো টাকাই বরাদ্দ দেয়নি। ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালেও এখানে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
১৮৬৯ সালে ৫০ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভা ২০১২ সালে ২০৫ বর্গকিলোমিটারের সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। কিন্তু এতে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় পৌরসভায় যে নাগরিক সুবিধা পাওয়া যেত, তার চেয়ে নাগরিক সুবিধা কমেছে। সরকারের এখন উচিত প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে বৈষম্য করেছে, তা দূর করা। হিসাব কষে যে টাকা রংপুর সিটি করপোরেশন বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল, সেই টাকা বরাদ্দ দেওয়াই এখন সমীচীন। দেশে এমন দৃষ্টান্ত থাকা প্রয়োজন, সংসদে সরকারদলীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি না থাকলেও কিংবা প্রভাব বিস্তারকারী আমলা না থাকলেও সমতাভিত্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে না।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
