সরকারের একটা কথা খুব প্রচলিত যে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের জন্য খাদ্য আর জ্বালানি দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়াতে দেশে ডলার–সংকট বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রমতে, দেশে ২০২১-২২ সালে খাদ্যদ্রব্য আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং জ্বালানি আমদানি কমেছে ১১ শতাংশ; বরং প্রধান ভূমিকা রেখেছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি, লোহাসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতু, সার, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্যের রেকর্ড আমদানি। এসব খাতে আমদানি বেড়েছে ৫৮ শতাংশের মতো, কিন্তু রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। যার শুরু যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস আগে থেকেই (বণিক বার্তা, ৩ অক্টোবর ২০২২)। ব্যবধানটা কি প্রশ্নের উদ্রেক করে না? এখানে জানিয়ে রাখি, গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০১৫ থেকে ২০২০—ছয় বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। আসল সমস্যাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা কেন?

এখনই দরকার ছিল একটা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা। দরকার একটা বিশেষজ্ঞ দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা। এই কমিটিকে দলীয়করণ না করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। দুর্নীতি ঠেকানো এখন মরিয়াভাবে চেষ্টা করা উচিত। যেভাবে হোক পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। বেসরকারি খাতের লোনগুলোকে ডেফারড করে সময় বাড়িয়ে নিতে হবে। রপ্তানি আয় যা আটকে আছে, ফেরত আনা। বিদ্যুৎ খাতের সব অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার–সংকট কমানোর জন্য প্রতিদিনই ডলার ছাড়ছে। এই অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসেই ছেড়েছে ৪৬০ কোটি ডলার, যা গত বছরের পুরো সময়ের ৬০ শতাংশের মতো। এই ডলারের ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে? দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য এক সরকারি ব্যাংকে গিয়ে ডলারের খোঁজ নিলে বলা হয়, আমাকে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার দেওয়া যাবে। তদ্রূপ ১ হাজার ২০০ ডলারের টিটি নিয়েও সময়ক্ষেপণ করা দেখতে পাই। কিন্তু বাইরের মার্কেটে ডলার কীভাবে পাওয়া যায়? বিশ্বের অনেক দেশের মানি এক্সচেঞ্জে এখন ডলার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তারা শুধুই কিনছে।

ব্যাংক এদিকে এলসি দিচ্ছে না। কিন্তু জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারির দিকেও যদি কানাডা যাওয়ার বিমানের টিকিট খোঁজা হয়, বিজনেস ক্লাস প্রায় এখনই ভর্তি। এসব মানুষ কী নিয়ে যাচ্ছে, তা কি দেখা হয়? এদিকে জিনিসের দাম বাড়ছেই। সরকারি হিসাবে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশ–এর আশপাশে ঘোরাফেরা করলেও প্রকৃত মুদ্রাস্ফীতি বেশি। বাংলাদেশ অনেক দ্রব্যের দামের সঙ্গে প্রথম বিশ্বের পণ্যের দামের খুব বেশি পার্থক্য আর নেই। এর মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে, সরকার বন্ডের বিপরীতে টাকা ছাপিয়ে মার্কেটে ছাড়ছে। এই ছাড়া শুরু হয়েছে ২০২০ থেকেই। সংবাদমাধ্যমগুলোর মারফতেই বিষয়টি আমরা জানছি। এই বিপুলসংখ্যক টাকা সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়া আর মুদ্রাস্ফীতি বাড়ানো ছাড়া কি কাজে লাগছে?

এই অবস্থা থেকে বাঁচানোর উপায় ছিল রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং দেশের মানুষের সঞ্চয়প্রবণতা। কিন্তু রেমিট্যান্স গত বছরের এ সময়ের থেকে কম আসছে (মানবজমিন ২৫ অক্টোবর, ২০২২)। গার্মেন্টসের ওয়ার্ক অর্ডার কমেছে ১০ শতাংশ এবং রপ্তানি আয় গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় কমেছে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ (দ্য বিজনেস পোস্ট, ২২ অক্টোবর, ২০২২)। এর মধ্যে আর একটি খবরে দেখা যায়, আমাদের রপ্তানির সব টাকা ফেরত আসছে না। গত তিন অর্থবছর থেকেই এই ফিরে আসা টাকার পরিমাণ কমছে। আবার বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে ফ্যাক্টরিগুলো এখন ৪০-৬০ শতাংশ ক্ষমতায় কাজ করতে পারছে। এই খাতে পরেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। ইউরোপ–আমেরিকার মন্দা অনেক অর্ডার কমিয়ে দেবে। আর আমাদের অন্য কোনো খাত না থাকাতে এই প্রভাব কাটিয়ে তোলা বেশ কঠিন। আর জাতীয় সঞ্চয় ২০১৯ থেকেই প্রতিবছরেই কমছে। তাহলে উপায় কী?

বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা তো এখন এলোমেলো। খবরে প্রকাশ, এখন ফার্নেস তেলের এলসি খুলতে দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এদিকে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর কাছে সরকারের বাকি ৫ মাসে ৪২০০০ কোটি টাকা। তাহলে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাত কত আর ক্রেডিট দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে? সরকার বসে আছে শীতকালে মানুষ কম ব্যবহার করবে এই আশাতে। কিন্তু পরিকল্পনা কোথায়?

খাদ্য সংকটের কথা বলা হচ্ছে। এ থেকে যাঁরা বাঁচাতে পারেন, কৃষকেরা—তাঁদের কি অবস্থা, কেউ কি খোঁজ নিয়েছে? গ্রামে এখন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার ওপর বিদ্যুৎ থাকে না, ডিজেল কিনে চাষ দেওয়া তাদের ক্ষমতার বাইরে। জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত তাপ আর এলোমেলো বৃষ্টির জন্য ফলনও ঠিকমতো হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার স্কিম নিয়েছে কৃষির জন্য। ভালো উদ্যোগ, কিন্তু  কতটা কৃষকের কাছে যাবে? আমাদের কৃষকেরাই এখন আবারও দেশের উদ্ধারকর্তা, কিন্তু তাঁদের প্রয়োজনীয় জোগান কে দেবে?

ভিনাগাথাসান (২০১৩)–এর মতে, কোনো দেশের মুদ্রাস্ফীতি যদি ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশের বেশি হয়, তা অর্থনীতির উন্নতিকে বিপরীত ধারাতে নিয়ে যায়। আমাদের কোনো জিডিপির হিসাবেই এই ধারা সংযুক্ত হয়েছে কিনা সন্দেহ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জিডিপির উচ্চগতি নিয়ে একটা ওয়ারকিং পেপার প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা দেখিয়েছে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জিডিপি এসেছে মূলত ২০০২ থেকে ২০০৮–এ বিদেশি অর্থায়নে, বেশকিছু সংস্কারমূলক কাজ করা হয় তার ফলে। তারা উপসংহার টেনেছে এই বলে যে, এত দিন কোনো নতুন সংস্কার না করে একটা মাত্র রপ্তানি পণ্য দিয়ে এই ধারা টিকে থাকাটা বিশ্বয়কর। কিন্তু পরের ধাপে যাওয়ার জন্য নতুন করে সংস্কার অবশ্যই করতে হবে। এই সংস্কারের গাইডলাইন নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–আইএমএফের বাংলাদেশে আসা। বাংলাদেশের আইএমএফের ঋণ দরকার ক্রেডিট রেটিং ঠিক রাখার জন্য। ২৮ তারিখের পত্রিকাতেই তাদের চাওয়া–পাওয়ার কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর জন্য যে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজ করতে হবে, তার জন্য কি সরকার প্রস্তুত?

এখনই দরকার ছিল একটা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা। দরকার একটা বিশেষজ্ঞ দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা। এই কমিটিকে দলীয়করণ না করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। দুর্নীতি ঠেকানো এখন মরিয়াভাবে চেষ্টা করা উচিত। যেভাবে হোক পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। বেসরকারি খাতের লোনগুলোকে ডেফারড করে সময় বাড়িয়ে নিতে হবে। রপ্তানি আয় যা আটকে আছে, ফেরত আনা। বিদ্যুৎ খাতের সব অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে।

জিনিসের দাম কমানো আর কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান সব দলীয় সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে। রিজার্ভ থেকে যাদের লোন দেওয়া হয়েছিল, তা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকারি সব অপ্রয়োজনীয় ‘উন্নয়ন’এবং অদরকারি খরচ কমিয়ে ফেলার কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংকের সুদহার নয়-ছয় থেকে বের করে ফ্লোটিং করে দেওয়াটা উচিত কাজ হবে এখন। ঋণখেলাপিদের ঋণ আদায় করা এখন বড় জরুরি। এখন বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এখন সময় দ্রুত কাজ করার, আগের মতো ‘গদাই লস্করী’ চালে চলার সময় আর নেই।

সুবাইল বিন আলম একটি বিদেশি কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট কন্সালট্যান্ট এবং সাবেক রিসার্চ ফেলো। লাইফটাইম ফেলো মেম্বার আইইবি এবং সোলার সোসাইটি।