২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পরিকল্পনার বিষয়ে সবুজসংকেত দিয়েছিলেন। ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শান্তি পরিকল্পনায় একমত হওয়া অসম্ভব ছিল; ট্রাম্পের উদ্যোগেই তা সম্ভব হয়। ট্রাম্প আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের, বিশেষ করে সৌদি আরবকে এটিকে সমর্থন করতে চাপ দিয়েছিলেন। কোনো কোনো দেশ ট্রাম্পের প্রস্তাবে মৌখিক সমর্থন দিয়েছিল এবং কিছু আঞ্চলিক রাজধানীতে এটি নিয়ে আলোচনার জন্য জমকালো সম্মেলনের আয়োজনও করা হয়েছিল।

কিন্তু এ অঞ্চলের জ্ঞানী নেতারা জানতেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি ছিল নিছক একটি মৌসুমি গরম হাওয়া, যা প্রস্তাবটির অনভিজ্ঞ স্থপতিরা হোয়াইট হাউস থেকে সরে যাওয়া মাত্র আর থাকবে না। সৌদি আরব ওই সময় সম্মেলনে আসা দর্শকদের স্বাগত জানিয়েছিল এবং মার্কিন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিনোদনের জন্য ঐতিহ্যবাহী তলোয়ার-নাচের আয়োজনও করেছিল। কিন্তু নিজেকে সে কৌশলে এ প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে রেখেছিল।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণ করার পর সৌদিরা বিপদের আশঙ্কা করছিলেন। তাঁদের আশঙ্কার মূল কারণ এটা ছিল না যে ইস্তাম্বুলে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডে মোহাম্মদ বিন সালমানের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে কোণঠাসা করতে পারে; বরং সৌদির আশঙ্কা ছিল বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে ইরানের সঙ্গে একটি নতুন বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারে।

২০১৫ সালে বারাক ওবামার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, বাইডেন প্রশাসন সেই চিন্তাভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে সৌদিরা মনে করছিলেন।

নানা ঘটনার পর মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করা এবং রাজপরিবারের ক্ষমতাকাঠামো পুনর্বিন্যাস করার মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন। তিনি সুন্নি ইসলামের বিশুদ্ধতাবাদী ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে মিত্রতার অবসান ঘটিয়ে শাসনের ভিত্তিতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছেন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক সংস্কারের জন্য চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণ গত এক দশকে দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি আরবকে এ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘকাল ধরে চলা পররাষ্ট্রনীতিতে আচমকা পরিবর্তন আনতে পারে। এর আগে ২০১১ সালে আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় আমেরিকা তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের; যেমন প্রাথমিকভাবে মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই সময় সৌদি আরবের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র দূরত্ব বজায় রেখে এগোচ্ছিল। ওই সময়ই সৌদি নীতিনির্ধারকেরা উপসংহারে পৌঁছেছিলেন, সৌদি আরবকে (এবং রাজপরিবারকে) নিরাপত্তার জন্য শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে থাকা উচিত হবে না।

নানা ঘটনার পর মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করা এবং রাজপরিবারের ক্ষমতাকাঠামো পুনর্বিন্যাস করার মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন। তিনি সুন্নি ইসলামের বিশুদ্ধতাবাদী ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে মিত্রতার অবসান ঘটিয়ে শাসনের ভিত্তিতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছেন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক সংস্কারের জন্য চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। নারীর অধিকার, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং বিনোদনকে প্রভাবিত করে, এমন একটি রাজ্যে যা এর ইতিহাসজুড়ে সাংস্কৃতিক কৃপণতায় আবৃত। যুবরাজ একটি নতুন ক্ষমতাকাঠামো, রাজনৈতিক নির্বাচনী এলাকা এবং বৈধতার উৎস তৈরি করছেন।

বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তি দেখাতে শুরু করেছেন। গত জুন মাসে তাঁর মিসর, জর্ডান এবং তুরস্ক সফর শুধু সৌদি আরবের আর্থিক প্রভাবের একটি প্রদর্শন ছিল না; এ সফরের মধ্য দিয়ে তিনি এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন—সেটিই বোঝাতে চেয়েছেন। মোহাম্মদ বিন সালমানের তুরস্ক সফর সৌদি আরবের জন্য একটি বড় জয় ছিল। এর মধ্য দিয়ে খাসোগি হত্যা নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে সৌদির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

তারেক ওসমান মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন