এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মানুষের আগ্রহ নেই কেন

ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিরয়টার্স

বিশ্বকাপকে গ্রহের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বলা হতো। কিন্তু আজ যখন উত্তর আমেরিকাতে আসরটি বসতে যাচ্ছে , সেদিকে কারও যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

হাজার হাজার টিকিট অবিক্রীত; মূল দামের চেয়ে কম দামে টিকিট পুনঃবিক্রি হয়েছে সপ্তাহখানেক আগেও। যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে যে ভিড় থাকার কথা ছিল, সেটাও নেই। হোটেলগুলো যে বাড়তি আয়ের আশা করেছিল, সেটাও আশানুরূপ হয়নি। ফিফাকে তাদের অগ্রিম বুক করা হোটেলরুম বাতিল করতে হয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রতিবাদস্বরূপ বৈশ্বিক বর্জনের কথাও শোনা যাচ্ছে।  

খেলা শুরু হলে হয়তোবা আগ্রহের পারদ বাড়বে। কিন্তু কিছুদিন আগে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল নিয়েও যে উন্মাদনা ছিল, বিশ্বকাপ যেন এর ধারেকাছেও নেই। আমি মনে করি, খেলাধুলার বাইরে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির হালচাল নিয়ে এখানে গভীর কিছুর ইশারা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের এই উদাসীনতা হয়তো আশ্চর্যজনক নয়। মার্কিন দলের পারফরম্যান্স আহামরি নয়। ফুটবল এখানে কোনো জনপ্রিয় খেলাও নয়। তা ছাড়া আমেরিকানরাও আজকাল স্রেফ দেশপ্রেমের জোয়ারে গা ভাসাতে নারাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকিটের গলাকাটা দাম।  

তবে বিশ্বের বাদবাকি অংশের স্তিমিত দশা আমাকে বেশি অবাক করেছে। চার বছর পরপর মাসব্যাপী এক বৈশ্বিক উত্তেজনা তৈরি হতো। বর্তমানে বিশ্বকাপের অবস্থানও যেন আর আগের জায়গায় নেই। ক্লাব ফুটবলও এর পাশে আসন নিয়েছে।  

তবে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারের কালে এই পরিবর্তন আরও চমকপ্রদ। রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের উন্মাদনার রেশ ফুটবলেও পড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এই জনতুষ্টিবাদের জমানা মিশে গেছে বড় ক্লাবগুলোর সঙ্গে। বিদেশি করপোরেটদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খেলোয়াড়দের এনে দল সাজানো হয়। দেশের জার্সি, দেশের সন্তানদের নিয়ে গঠিত সেই দলগুলোর কী হবে? ভক্তদের কাছে এর গুরুত্ব আছে, কিন্তু কেবল জাতীয় দলের প্রতি মানুষের আবেগ দিয়ে বিদ্যমান বৈশ্বিক জনতুষ্টিবাদের জমানাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না।  

হয়তোবা এককালে আন্তর্জাতিক ফুটবল জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা প্রকাশের মাধ্যম হতো, কিন্তু এখন উগ্র জাতীয়তাবাদের জমানায় আসলে আর এমন কোনো পৃথক মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ছে না। অথবা দুই দশক আগে ফ্র্যাঙ্কলিন ফোয়ার যে ইঙ্গিত করেছিলেন, সেটাও হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলের এই গোষ্ঠীগত উন্মাদনা আসলে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক এবং বিশ্বায়নবাদের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ। অথবা এ–ও হতে পারে, ক্লাব ফুটবল তো সারা বছর চলে। একজন ভক্ত আসলে কতক্ষণ ফুটবল হজম করতে পারেন? আবেগ ঢেলে দেওয়ার জন্য আর কত সুযোগ দরকার?  

তবু এটা ধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। এর আংশিক কারণ হচ্ছে, শুরুর দিকে বলা হতো, এই জনতুষ্টিবাদ নিজের দেশের অভিজাতদের দ্বারা পরিত্যক্ত জনগণের বোধ। এই অভিজাতরা তাদের সম্পদের জোরে একধরনের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে নিজেদের নিয়ে গেছে, যেমন করে স্থানীয় ফুটবল তারকারা নিজেদের শিকড় ফেলে বড় ক্লাবে চলে যান।  

ক্লাব ফুটবল এখন অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে ফিফার ২০১৫ সালের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি একটি বড় ধাক্কা ছিল। ফিফার বর্তমান বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট সংস্থাটিকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। অথবা সম্প্রতি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর তালিকাও একটা কারণ—রাশিয়া, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্বায়ন কীভাবে ক্লাব ফুটবলকে বদলে দিয়েছে, এটি তারও একটি চমৎকার উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরের দুই দশকে শীর্ষস্থানীয় লিগ এবং বড় বড় ক্লাব বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে ভেড়াতে শুরু করে। এরপর সেই খেলা পৌঁছে দেওয়া হয় বিশ্বজুড়ে। ব্যবসায়িক দিক থেকে এটি দারুণ সফল হলেও, এর সাংস্কৃতিক প্রভাব বেশ অদ্ভুত। যেমন নিউইয়র্কের উগান্ডায় জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র লন্ডনের ফুটবল ক্লাব ‘আর্সেনাল’-এর জয়ে উন্মাতাল হন। ফলে ক্লাব ফুটবলের সমর্থক গোষ্ঠী এখন পুরোপুরি বৈশ্বিক, অনেক ক্ষেত্রে খামখেয়ালিও।

মনে হতে পারে, জাতীয় দলগুলোর আবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। জাতীয় দল হতে পারত দেশপ্রেম বা জাতীয় পরিচয় পুনরুদ্ধারের মঞ্চ। যেমন মারিন লো পেনের জমানায় ফরাসিদের যে পরিমাণ উন্মাদনা থাকার কথা ছিল, এর স্থলে উল্টো চলছে এমবাপ্পের সমালোচনা। লন্ডন তো ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের চেয়ে ‘আর্সেনাল’ নিয়ে বেশি বুঁদ হয়ে আছে।

এটা কেন হচ্ছে? এর একটি সহজ উত্তর হতে পারে, ক্লাব ফুটবল এখন অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে ফিফার ২০১৫ সালের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি একটি বড় ধাক্কা ছিল। ফিফার বর্তমান বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট সংস্থাটিকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। অথবা সম্প্রতি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর তালিকাও একটা কারণ—রাশিয়া, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র।

যেহেতু জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা একত্রে খেলার সুযোগ খুব কম পান, তাই পুরো আয়োজনটাকেই কিছুটা করপোরেট, কৃত্রিম ও ফ্যাকাশে মনে হয়।

তবে আমার মনে হয়, আরও গভীর কারণ আছে। যেমন ফরাসি দলের সেরা খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন লো পেনের ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ পার্টির উত্থান এবং দেশ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান, তখন ডানপন্থীরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন।

খেলোয়াড়েরা যখনই রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখনই একটা পাল্টাপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ফ্রান্সের ঘটনা আরও গুরুতর। দেশের জাতীয় দলের মূল ব্যক্তি ঘোষণা দেন, একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের কল্পিত ফ্রান্সে তাঁর মতো মানুষের কোনো স্থান নেই। সেই নেতারা যেন এই কথার সত্যতা প্রমাণে উঠেপড়ে লাগলেন। তাঁরা এমবাপ্পেকে ‘বিশ্বাসঘাতক অনুপ্রবেশকারী’ ও জাতীয় গৌরবের ‘অযোগ্য পাত্র’ হিসেবে তুলে ধরলেন।  

এগুলো আর অস্বাভাবিক ঠেকছে না। কট্টর ডানপন্থীদের বিশুদ্ধ জাতীয়তাবাদের কল্পনার সঙ্গে অভিবাসী ও প্রবাসী বংশোদ্ভূতদের মিশেলে গঠিত এই দল খাপ খায় না। এই পরিবর্তনের কারণেই হয়তোবা ২০১৮ সালে বারাক ওবামা ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয় উদ্‌যাপন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু যাঁরা জাতিগত বিশুদ্ধতার কথা বলেন, তাঁদের কাছে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।  

আমরা বিশ্বরাজনীতিতে যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলছি, সেটাকে ‘আঞ্চলিকতাবাদ’ বা প্যারোকিয়ালিজম বলাই শ্রেয়। জনতুষ্টিবাদীরা যে জাতির কথা বলছেন, সেটা আসলে আরও সংকীর্ণ। এটা মূলত একধরনের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শ। এর পরিধি জাতীয়তার চেয়ে অনেক বেশি স্থানিক ও সংকীর্ণ।  

এভাবে দেখলে বোঝা যাবে, বিশ্বায়ন কেবল সেই সব মানুষের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি করেনি, যারা কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেশ থেকে পুঁজি পাচার হওয়া কিংবা বিশ্বজুড়ে কোটিপতিদের বিলাসী জীবনযাপনকে ঘৃণা করে; বরং এটি খোদ দেশ না নেশন নামক কাঠামোটিকেই ডানপন্থীদের কাছে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটি অনাস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এককালে যা ছিল দেশপ্রেম ও গর্বের বিষয়, সেটা এখন ক্ষোভের বিষয়।

এমন নয় যে উদারপন্থীরা জাতীয়তাবাদ নিয়ে খুব স্বস্তিতে আছেন। তবে দিন শেষে আর্সেনাল বা পিএসজির মতো ক্লাবগুলোর পক্ষে গলাফাটানোই বেশি আকর্ষণীয় ঠিক এই কারণেই যে এর আসলে গভীর কোনো অর্থ নেই।  

  • ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস বিজ্ঞান লেখক এবং প্রাবন্ধিক। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত