শিক্ষা সংস্কার: জনতুষ্টি নয়, তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন

শিক্ষা খাতে এখনো বড় কোনো দৃশ্যমান সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ শুরু হয়নি। তা সত্ত্বেও আমরা ভিন্নধর্মী একটি বিপদের সংকেত পাচ্ছি; তা হলো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পাশ কাটিয়ে কিছু চমকপ্রদ নীতি গ্রহণ, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা প্রাধান্য পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। শিক্ষা খাতে সংস্কারের জন্য জনতুষ্টি নয়, তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়ন কেন প্রয়োজন, তা নিয়ে লিখেছেন এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বিএনপি নেতৃত্বের অভূতপূর্ব গতি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক মন্থরতা ভেঙে যে ক্ষিপ্রতা দেখিয়েছেন, তা এ দেশের ইতিহাসে বিরল।

১০ মার্চ শুরু হওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ এবং ১৪ মার্চ থেকে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে সরকার তার সামাজিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

গত ১৫ বছরের নীতি-ব্যর্থতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সুযোগের অপব্যবহারের ফলে শিক্ষা খাত আজ যে সংকটে জর্জরিত, তা থেকে উত্তরণে এই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা একটি বড় সুযোগ হতে পারে।

তবে এই দ্রুত সাফল্যের উত্তেজনার আড়ালে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মতো ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনেকটা পর্যাপ্ত গবেষণা ও অংশীজনের প্রকৃত চাহিদা যাচাই–বাছাই ছাড়াই তাড়াহুড়া করে চালু হয়েছে। এমন ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো কাঠামোগত জড়তার (স্ট্রাকচারাল ইনারশিয়া) কারণে অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

নীতিনির্ধারণী চক্রের প্রথম ধাপ—যেমন সংসদীয় বিতর্ক ও একাডেমিক চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়াই এ ধরনের প্রকল্প শুরু করায় এর পেছনে এমন একধরনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।

এতে ভবিষ্যতে এর সামাজিক প্রভাব দুর্বল প্রমাণিত হলেও তা স্বচ্ছভাবে যাচাই করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে কার্যকারিতা–নির্বিশেষে তা বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই রাজনৈতিক ‘লক-ইন’ তখন বাস্তবায়নকারী আমলা ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে দেয়।

আরও পড়ুন

শিক্ষা খাতে এখনো বড় কোনো দৃশ্যমান সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ শুরু হয়নি। তা সত্ত্বেও আমরা ভিন্নধর্মী একটি বিপদের সংকেত পাচ্ছি; তা হলো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পাশ কাটিয়ে কিছু চমকপ্রদ নীতি গ্রহণ, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা প্রাধান্য পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের প্রথম ৩০ দিনে নীতি-পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সুশীল সমাজ ও থিঙ্কট্যাংক এখন প্রায়োগিক গবেষণার (অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ) নামে নাগরিক সংলাপ বা স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।

অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিক সংলাপ অপরিহার্য, কিন্তু মৌখিক মতামত যখন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন নীতি প্রণয়নে গবেষণার গুরুত্ব যেমন কমে, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা-গবেষণার চর্চাও তেমনি বাধাগ্রস্ত হয়। এই রকম ‘প্রমাণবর্জিত’ সিদ্ধান্ত প্রণয়নের সংস্কৃতির ফলাফল হলো নীতির বারবার পটপরিবর্তন।

নীতির অনিশ্চয়তা

বিএনপির ১৮০ দিনের এই ব্যস্ততার মধ্যে শিক্ষাসংক্রান্ত দুটি বড় নীতির আকস্মিক বদল আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। প্রথমটি হলো স্কুল ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) প্রধানের শিক্ষাগত যোগ্যতা। এসএমসি প্রধানের জন্য ন্যূনতম স্নাতক পাসের বিধানটি রাখা হয়েছিল মূলত স্কুলের সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য কমাতে।

কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের মুখে এই যোগ্যতা শিথিল করার যে আলাপ শুরু হয়েছিল এবং আবার তড়িঘড়ি করে শেষ পর্যন্ত সেই আলাপ থেকে সরকার সরে এসেছে; তা প্রমাণ করে যে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট গবেষণানির্ভর রোডম্যাপের অভাব রয়েছে।

এসএমসির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি স্কুল সুশাসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। তাত্ত্বিকভাবে এসএমসি গঠনের প্রক্রিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তাদের সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

আরও পড়ুন

এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করে একটি নতুন সরকার কীভাবে যোগ্যতা কমানোর প্রস্তাব বিবেচনা করেছিল, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কাঠামোগত গলদেরই বহিঃপ্রকাশ।

দ্বিতীয় এবং আরও উদ্বেগের বিষয়টি হলো ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে লটারি প্রথা বাতিল করে আবার ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ‘কোচিং বাণিজ্য’ রুখতে ও কোমলমতি শিশুদের ওপর থেকে পরীক্ষার মানসিক চাপ কমাতে ২০১০ সালে লটারি প্রথা চালু করা হয়েছিল।

১৫ বছর পর লটারি বাদ দিয়ে তথাকথিত ‘মেধাভিত্তিক’ পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা সম্ভবত উচ্চ-মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের সাময়িকভাবে খুশি করবে। কিন্তু এটি গত এক দশকের শিক্ষাতাত্ত্বিক গবেষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।

গবেষণায় একদিকে দেখা গেছে যে প্রথম শ্রেণিতে ‘স্কুল রেডিনেস’ সাপেক্ষে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, যা অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের মধ্যে বেশি প্রকট। একইভাবে রয়েছে প্রি-স্কুল স্তরে শিক্ষা অংশগ্রহণজনিত শিখনের বৈষম্য।

অন্যদিকে দেখা গেছে, ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক স্তর (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) থেকেই ব্যক্তিগত পাঠ বা প্রাইভেট টিউশন নিতে শুরু করে; দুই দশক আগের উপাত্ত অনুযায়ী যা ছিল প্রায় ৩৭.৯ শতাংশ।

নাগরিক সমাজে যাঁরা সরকারকে বর্তমানে পরামর্শ দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ‘জেনারেল-পারপাস নলেজ এলিট’ (‘সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’) একটি গোত্রের প্রাধান্য লক্ষণীয়, যাঁরা উন্নয়নের ভাষায় এবং রাজনীতিবান্ধব বক্তব্য প্রদানে পারদর্শী। কিন্তু শিক্ষা খাতের গভীর কারিগরি বা বৈজ্ঞানিক জটিলতা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখেন না।

আজ প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার নামে চলছে কোটি কোটি টাকার রমরমা কোচিং ব্যবসা। তাই একজন সংসদ সদস্য লটারি প্রথার সমালোচনা করে যখন দাবি করেছেন যে এটি শিক্ষার মান কমিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি এর পেছনে কোনো পরিসংখ্যানিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি উপস্থাপন করেননি যে লটারিভিত্তিক ভর্তি প্রথা কীভাবে উচ্চশিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অনেক কাঠামোগত সমস্যা আছে, যার মধ্যে সামাজিক বৈষম্য অন্যতম। ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা মানে হলো সেই বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া, যেখানে কেবল সচ্ছল পরিবারের সন্তানেরাই কোচিংয়ের সুবিধা নিয়ে ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে।

এই সাম্প্রতিক দুটি সিদ্ধান্ত কেবল নীতি প্রণয়নের প্রশাসনিক দুর্বলতা নির্দেশ করে না, বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার দুটি প্রধান স্তম্ভ—সুশাসন ও সমতার (ইকুইটি) ওপর আঘাত করে। এসএমসি সংস্কার ছিল সুশাসনের লড়াই, যা তৃণমূলের রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত ছিল।

অন্যদিকে লটারি বাতিল সরাসরি সমতার নীতিতে আঘাত করে। যেখানে বিগত সরকারের গাফিলতির কারণে মানসম্মত সরকারি স্কুলের সংখ্যা সীমিত, সেখানে লটারি প্রথা কিছুটা নিশ্চিত করে যে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কেবল তার বাবার পকেট বা জিপ কোড দিয়ে নির্ধারিত হবে না।

সরকারি শিক্ষালয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অধিক অংশগ্রহণের কারণে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার দাবি ‘সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার অধিকার’ স্লোগানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংসদের ভূমিকা ও আগামী দিনের পথ

সবচেয়ে আশঙ্কার জায়গা হলো, নাগরিক সমাজে যাঁরা সরকারকে বর্তমানে পরামর্শ দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ‘জেনারেল-পারপাস নলেজ এলিট’ (‘সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’) একটি গোত্রের প্রাধান্য লক্ষণীয়, যাঁরা উন্নয়নের ভাষায় এবং রাজনীতিবান্ধব বক্তব্য প্রদানে পারদর্শী। কিন্তু শিক্ষা খাতের গভীর কারিগরি বা বৈজ্ঞানিক জটিলতা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখেন না।

যখন কোনো থিঙ্কট্যাংক কেবল অংশীজনের মতামতকে ‘পলিসি অ্যাডভাইস’ হিসেবে চালিয়ে দেয়, তখন গবেষণার বদলে তারা আসলে এক রকম মতামত জরিপ প্রকাশ করে। এর ফলে সমাজতাত্ত্বিক ও শিক্ষাবিদদের দীর্ঘকালীন শ্রমের ফল উপেক্ষিত হয়। বিশেষজ্ঞ মতামতকে এড়িয়ে চলা হয়তো সাময়িকভাবে জনপ্রিয় মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা অকার্যকর নীতি হিসেবেই প্রমাণিত হয়।

পরামর্শদাতা হিসেবে ‘বিশেষজ্ঞ নলেজ এলিট’দের জায়গা করে দেওয়ার জন্য এবং তার পাশাপাশি প্রয়োজন বিরোধী রাজনীতিবিদদেরও বলিষ্ঠ ও দায়বদ্ধ ভূমিকা।

শিক্ষা সংস্কারের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর বিষয়ে ঘোষণার আগে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ১২ দফার সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করার জন্য সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত।

আরও পড়ুন

বর্তমানে ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন চলমান। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উচিত একটি ‘পার্লামেন্টারি ওভারসাইট কমিটি’ বা সংসদীয় তদারকি কমিটি গঠনের দাবি জানানো, যেখানে শিক্ষা সংস্কারের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে বিতর্ক হবে। তবে বিরোধীদেরও উচিত আবেগপ্রবণ বা প্রমাণহীন তর্কের বদলে বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর ভিত্তি করে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা।

পরিশেষে বলতে চাই, ১৮০ দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সঠিক পথ নির্ধারণ করা, ম্যারাথন জয় করা নয়। সরকার যে বাজেট ৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা ভাবছে, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু তার ভিত্তি যেন জনতুষ্টির ‘বালুকাবেলা’য় গড়ে না ওঠে।

সুশীল সমাজের উদ্যোক্তা ও উন্নয়নকর্মী বন্ধুদের প্রতি আহ্বান, আপনারা জনগণের কথা বলুন, কিন্তু বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে বাইপাস করে নয়। আর নতুন শিক্ষা নেতৃত্বের প্রতি আমার পরামর্শ—এই ‘দ্রুত সমাধান’ দেওয়া সর্বজনীন পরামর্শদাতাদের ভিড়ে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করুন।

১৮০ দিনের সংলাপে সবাইকে তুষ্ট করতে যদি তিন বছর পর কোনো শিশুর শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তবে তা হবে বর্তমান ম্যান্ডেটের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

  • এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর, জাতীয় পাঠ্যক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সদস্য, ‘শিক্ষা অধিকার সংসদ’ নামক যুব ফোরামের আহ্বায়ক এবং শিক্ষাক্ষেত্রের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক জার্নালের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য।

    ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব