শিল্পকলা একাডেমিতে স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ কেন নয়

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গেটছবি: বাসস

গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর বিনোদন পাতায় ‘অধ্যাদেশ অনুমোদন, শিল্পকলা একাডেমির বিভাগ বাড়ল’ শিরোনামের একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। সেখানে জানানো হয়, সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিভাগগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় বিভাগগুলো হলো সংগীত, চারুকলা, নাট্যকলা, চলচ্চিত্র, নৃত্য ও অন্যান্য পারফর্মিং আর্টস, আলোকচিত্র, কালচারাল ব্র্যান্ডিং, উৎসব ও প্রযোজনা, গবেষণা, প্রকাশনা ও নিউ মিডিয়া এবং প্রশাসন ও অর্থ।

সংবাদে আরও বলা হয়, এটি শিল্পকলা একাডেমির সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে একটি বড় সংস্কার। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বর্তমান বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য বিবেচনায় এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। বরং উদ্যোগটিকে সময়োপযোগী বলেই মনে হয়।

চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ‘আবৃত্তি বিভাগ’ নামে একটি আলাদা বিভাগের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও তা এই অধ্যাদেশে প্রতিফলিত হয়নি। শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তির কার্যক্রম যে নেই, তা নয়। কখনো নাট্যকলা বিভাগের মাধ্যমে, আবার কখনো সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগের আওতায় আবৃত্তির কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। আজকের আলোচনার মূল বিষয় হলো, স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগের প্রয়োজনীয়তা ও তার বাস্তবতা।

আবৃত্তিকলা শিল্পকলার একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। হাজার বছরের ধারাবাহিকতায় বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ কবিতা আবৃত্তি। জীবনের কথা, সাহিত্যের কথা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছে সুদীর্ঘকাল ধরে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে আবৃত্তি তার নিজস্ব আসন লাভ করেছে এবং রাজদরবার পর্যন্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে।

শুধু বাংলা ভূখণ্ডেই নয়, পৃথিবীর নানা দেশে প্রাচীনকাল থেকেই আবৃত্তির চর্চা বিদ্যমান। খ্রিষ্টের জন্মের পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর পূর্বে মিসর দেশেও একধরনের গল্পকথক পরিচয়ের মানুষের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগের প্রাচীন গ্রিক নাটকের যেসব নিদর্শন আজও পরিচিত, সেগুলোর ছন্দোবদ্ধ কোরাস সংলাপগুলো সমবেত আবৃত্তির প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এই শিল্পমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে নানাভাবে। নগর-বন্দর থেকে শুরু করে মঞ্চ-মাঠ পেরিয়ে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত আবৃত্তির চর্চা ছড়িয়ে পড়েছে। শোনা যায়, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আবৃত্তি সংগঠনের সংখ্যা তিন শতাধিক। সংগঠনগুলোয় বছরে গড়ে ২০ জন করে উপস্থিতি ধরলেও সারা দেশে আবৃত্তির শিক্ষার্থী ও কর্মীর আসা-যাওয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজারে। একজন আবৃত্তিশিল্পী বছরে গড়ে দুটি কবিতা আবৃত্তি করলেও প্রতিবছর কেবল কবিতা পাঠের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবন্ধ, গল্প, চিঠিসহ সাহিত্যের আরও নানা ধারার পাঠ। একসময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একটি কবিতা পাঠের সুযোগ পেতে আবৃত্তিশিল্পীদের কবিতার বই হাতে আয়োজকদের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে হতো। সে সময় পেরিয়ে গেছে।

বর্তমানে দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপন, ব্যানার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে দেশের কোথাও না কোথাও আবৃত্তির অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আয়োজন হিসেবেই এবং কোথাও কোথাও দর্শনীর বিনিময়ে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যে এসব তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত, তা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কেবল এই বিশাল আবৃত্তি-অনুরাগী তরুণসমাজের শেষ আনুষ্ঠানিক আশ্রয়স্থল নয়, একই সঙ্গে দেশের ঘরে ঘরে শিশু ও তাঁদের অভিভাবকেরাও শিল্পকলা একাডেমির আবৃত্তিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের দিকে প্রত্যাশাভরে তাকিয়ে থাকেন।

আশির দশকের শুরুতে সামরিক জান্তা সরকারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার প্রচেষ্টায় পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণে আবৃত্তিশিল্পের এক অভূতপূর্ব উন্মেষ ঘটে। হাজারো তরুণের সমাগমে আবৃত্তি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। সে আন্দোলনে আবৃত্তির ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও আবৃত্তির ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ। কবিতার পঙ্‌ক্তি ও আবৃত্তির ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছে রাজপথ। দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে আবৃত্তির শিক্ষার্থীদের যে উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তা সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপকদের পরিচয় থেকেই সহজে অনুমেয়। এই সম্মানজনক পেশা তৈরির নেপথ্যে আবৃত্তি সংগঠনগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কেবল এই বিশাল আবৃত্তি-অনুরাগী তরুণসমাজের শেষ আনুষ্ঠানিক আশ্রয়স্থল নয়, একই সঙ্গে দেশের ঘরে ঘরে শিশু ও তাঁদের অভিভাবকেরাও শিল্পকলা একাডেমির আবৃত্তিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের দিকে প্রত্যাশাভরে তাকিয়ে থাকেন।

শিশুর মানস গঠনে এবং মাতৃভাষা বাংলার যথার্থ প্রকাশে প্রথম ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পাঠ হলো ছড়া, গল্প বলা ও কবিতা আবৃত্তি। শিশুর মুখে কথা ফুটতেই অভিভাবকেরা তাকে দিয়ে ছড়া বা কবিতা বলানোর চেষ্টা করেন। এই চর্চা যেমন বিজ্ঞানসম্মত, তেমনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতার ফল। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশুর উচ্চারণে শৃঙ্খলা আসে, যা অন্য কোনো উপায়ে সহজে অর্জন করা সম্ভব নয়।

প্রয়াত বাক্‌শিল্পাচার্য নরেন বিশ্বাসের একটি বক্তব্য এ আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে বলতেন এবং এটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতেন যে ব্যাকরণে যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে, বাস্তবে তা সেভাবে শেখানো হয় না।

ব্যাকরণে বলা হয়েছে, যে পুস্তক পাঠ করিলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে এবং বলিতে পারা যায়, তাহাকেই বাংলা ব্যাকরণ বলে। বাস্তবে আমরা লিখি ও পড়ি, কিন্তু বলা শেখার চর্চা নিয়মিতভাবে চালু করতে পারিনি। ফলে ব্যাকরণের তিনটি স্তম্ভের একটি কার্যত নিষ্ক্রিয় থেকে যাচ্ছে। এর পরিণতিতে শিক্ষিত বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষাশিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। ‘বলা’ শেখার চর্চা নিয়মিত হলে দেশের মানুষের বাচিক সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

এই বাস্তবতা থেকে উপসংহার টানা যায় যে আবৃত্তির মতো সম্ভাবনাময়, বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রসমৃদ্ধ এবং তরুণ প্রজন্মের পছন্দের এই শিল্পমাধ্যমের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কাঠামোয় একটি স্বতন্ত্র আবৃত্তি বিভাগ যুক্ত হওয়া সময়ের দাবি এবং যুক্তিসিদ্ধ।

  • গোলাম সারোয়ার আবৃত্তিশিল্পী, উচ্চারণ প্রশিক্ষক ও নির্দেশক, লেখক ও গবেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব