‘যেমন?’
‘আগে মাসে মুরগি খেতাম ৬ দিন। এখন এটা কমিয়ে দিয়েছি। সপ্তাহে তিন দিন মাছ, তিন দিন সবজি, এক দিন মুরগি।’
‘মাছের মধ্যে কিছু কিছু মাছ আছে সস্তা পড়ে!’
‘হ্যাঁ। চাষের কই। ছোট ছোট মাছ কিনি। মচমচে করে ভেজে খাই। আর কিনি চাষের রুই মাছ। চারটা প্রতি মাসে।’
‌‘আপনার ছেলেমেয়ে কজন?’
‘এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেটা গ্র্যাজুয়েট করছে টেকনিক্যাল সাবজেক্টে। এবার সেকেন্ড ইয়ারে উঠছে। মেয়েটা কলেজে পড়ে।’
‘আচ্ছা। ওদের পড়াশোনার খরচও তো দিতে হয়।’
‘জি, দিতে হয়। সেখানেও ধরেন কাটছাঁট করেছি।’
‘কী রকম?’
‘মেয়েটা আগে রিকশায় কলেজ যেত। চল্লিশ আর চল্লিশ আশি টাকা লাগত। এখন বলে দিয়েছি, মা, বাসে যাও। এখন দিই কুড়ি টাকা। তো কোনো দিন হয়তো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বসে শিঙারা খেল, সমুচা খেল, সেদিন হেঁটে বাড়ি ফেরে।’

‘বাসাভাড়া কেমন?’
‘বাসাভাড়া ২০ হাজার টাকা। বিদ্যুতের বিল, গ্যাসের বিল, ওয়াই-ফাই, মোবাইল ফোনের বিল মিলে পড়ে ২৩ হাজার।’
‘বাসায় গৃহপরিচারিকা কি আছে?’
‘গৃহপরিচারিকা মানে একজন আসেন। আগে কাজ ছিল ঘর মোছা, তরকারি কুটে দেওয়া। এখন তরকারি কুটে দেওয়া বাদ। শুধু ঘর মোছা। আগে দিতাম দুই হাজার। এখন দিই এক হাজার। বাঁচল এক।’
‘আপনার স্ত্রী কি বাইরে কোনো চাকরি-বাকরি করেন?’
‘না। ঘরেই কত কাজ।’

‘চালের কেজি কত?’
‘আমার স্ত্রী কেনেন। বোধ হয় গত মাসে ৬৫ টাকা কেজি কিনেছেন। মিনিকেট। এ মাসে বোধ হয় ৬৮ থেকে ৭০ টাকা করে কেজি লাগবে!’
‘তো এই যে বাড়ছে জিনিসপাতির দাম। বাসাভাড়া তো ফিক্সড। বেতন ফিক্সড।’
‘বাসাভাড়া ফিক্সড না। বছরে পাঁচ শ, এক হাজার টাকা করে বাড়ে।’
‘জি। বেতন যে হারে বাড়ে, বাসাভাড়া, রিকশাভাড়া, জিনিসপাতির দাম বাড়ে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে। সামলান কী করে?’
‘বললাম না? কাটছাঁট করে। এখন বাসায় ফেরার সময় প্রথমে বাসে উঠি। বাস থেকে নামতে হয় আসাদগেট। ওখান থেকে আগে হলে রিকশা নিতাম। মোটরসাইকেল নিতাম। না হলে আরেকটা বাসে উঠতাম। এখন হাঁটি। ৪৫ মিনিট লাগে। হাঁটা হয়। শরীর ফিট থাকে। ডায়াবেটিস সুবিধা করতে পারে না। একটাই সমস্যা। খুব গরম।’
‘তো গিয়ে তো গোসল করে নেন।’
‘না। গোসল করি না। খুব সাবধানে থাকি। রাতের বেলা গোসল করলেই ঠান্ডা বসে যাবে।’
‘তো অসুখ-বিসুখ যাতে না হয়, সে ব্যাপারে খুব সজাগ থাকতে হয়!’
‘হয়। তারপরও জানেন, মাসে তিন হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ওষুধের দামও কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে।’
‘ওষুধের দামও বেড়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ। আর ওষুধ কেনার পরিমাণও বাড়ছে। ওই যে বললাম, সপ্তাহে এক দিন মুরগি। ঠিকঠাক খাওয়া পেলে, প্রোটিন পেলে হয়তো অসুখ কম হতো। এখন তো আমিষ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। সেটার শোধ নিচ্ছে অসুখ। ওষুধের দাম।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে ধরেন, আপনার কাছে আছে একটা সিঙ্গেল চাদর। আপনি সেটা দিয়ে একটা ডাবল বেড ঢাকবেন। এই দিকে টানলে ওই দিকে বের হয়ে যায়। ওই দিকে টানলে এই দিকে বের হয়ে যায়। নুন আনতে পান্তা ফুরানো কথাটা কাকে বলে আমি বুঝি।’
‘তবে আপনার ছেলের তো পড়া আর তিন বছর। টেকনিক্যাল সাবজেক্ট নিয়েছে। কাজ জানলে তো এখন থেকেই আয় করতে পারবে। ঘরে বসে কম্পিউটার গ্রাফিকস করে দিতে পারবে।’
‘ওই আশাতে আছি। ছেলেটা যদি কাজ শিখে বের হতে পারে, তাহলে ভালো একটা কাজ পাবে। ভালো আয় করে ও নিজের পায়ে দাঁড়াক। আমাকে তার সাহায্য করতে হবে না। সে ভালো থাকুক।’
‘মেয়ের বিয়েও তো দিতে হবে। জমাচ্ছেন টাকাপয়সা?’
এবার তিনি লজ্জিত মুখে হাসলেন। ‘জমাতে পারি নাই।’

মাসে ৫৫ হাজার টাকা আয় তো বাংলাদেশে অল্প লোকই করে। আমাদের বাসাবাড়ি-অফিসের সামনে যে নিরাপত্তারক্ষীরা কাজ করেন, তাঁদের বেতন গড়ে মাসিক ১০ হাজার টাকা। ৬ হাজার ৭ হাজারে শুরু হয়। ড্রাইভারদের বেতন গড়ে ২০ হাজার। ওরা কীভাবে সংসার চালায়? বাসাভাড়া দিয়ে ওদের কী থাকে? অথচ ওদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যায়। ওদেরও বাড়িতে রঙিন টেলিভিশন আছে, ফ্রিজ আছে, হাতে স্মার্টফোন। এই সংসারগুলো কীভাবে চলে, জানি না।

সারাক্ষণ পত্রিকায় ডলার-সংকট, জ্বালানিসংকট, লোডশেডিং, মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত খবর পড়ি। মতামত পড়ি। টেলিভিশনের টক শো দেখি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটো ভুল হয়ে গেছে। এক. কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম কম রাখা। দুই. কৃত্রিমভাবে ব্যাংকের সুদের হার কম রাখা। আমরা তেল বা তরল গ্যাস আমদানি করতে পারছি না, কারণ যুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি, আর আমাদের হাতে ডলারের সঞ্চয় কম। ডলারের রেট সরকারিভাবে যা-ই বলা হোক না কেন, আমদানিকারকেরা বাজার থেকে ১০২ টাকা করে ডলার কিনছেন। তো আমদানিকারকেরা যদি বাস্তবে ১০২ টাকা করেই ডলার কিনে থাকেন, তাহলে তো আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়বেই। সে ক্ষেত্রে ডলারের সরকারি বিনিময়মূল্য বাড়িয়ে দিলে কী হয়? অর্থনীতিবিদেরা বলেন, বাড়াতে হবে। তবে রয়েসয়ে। আস্তে আস্তে। ব্যাংকের চেয়ে বাইরে ডলারের দাম বেশি বলে প্রবাসীরা টাকা পাঠাচ্ছেন হুন্ডি করে। ব্যাংকে রেট বেশি পেলে তাঁরা তো ব্যাংকের মাধ্যমেই পাঠাতে পারেন।

তেল আমদানি করার জন্য ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ডলারের মজুতও কম, তেলের মজুতও কম। সরকার তেলের ব্যবহার কমাতে চাইছে। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে রাখা হয়েছে। লোডশেডিং চলছে। অফিস টাইম কমানো হবে। রাত আটটার পর দোকানপাট বন্ধ থাকবে। এভাবে কত দিন? জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরূল ইমাম আর এম শামসুল আলমের সাক্ষাৎকার পড়ি। মন খারাপ থাকে। উৎপাদন না করলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টাকা পাবে। আমদানি করা তেল-গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র না চালিয়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করার দিকে মন দিতে হতো। নিজের শক্তিতে তা করা যেত। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, হিসাব এত সোজা হলে সরকার কি বোকা নাকি এটা করত না। অনুসন্ধানের কূপে বিলিয়ন ডলার লাগে। দশটা কূপ খুঁড়ে যদি একটাতেও গ্যাস না পাই, ওই টাকা কোত্থেকে দেব, কেন দেব? পেলে কত টাকা বিনিয়োগ করে কত টাকার গ্যাস পাব, তা দেখতে হবে না?

আমরা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খবর কোত্থেকে রাখব? যুদ্ধ কি থামবে না? রাশিয়া কি ইউরোপে তেল-গ্যাস রপ্তানি আবার চালু করবে না? আমেরিকা তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা কি তুলে নেবে না? পৃথিবীর জায়গায় জায়গায় মন্বন্তর আসন্ন। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ফেলছে। ইউরোপ পুড়ে যাচ্ছে গরমে। আমরা তাকিয়ে আছি রামপাল আর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে। কয়লাই ভরসা। কয়লার বিরুদ্ধে এত দিন কথা বলে এখন ‘কয়লা নয় কেন’ বলে চিৎকার শুরু করেছি।
আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তাঁর মুখের দিকে তাকাই। বলি, ‘সামনে যদি আরও খারাপ দিন আসে?’

তিনি বলেন, ‘গ্রামে চলে যাব। মা বলেছেন, বাবা, গ্রামে আসো। আমার একখান গয়না আছে। সেটা বিক্রি করে তোমাদের ভাত খাওয়াব। মায়ের বয়স হয়েছে, দিন-দুনিয়ার হিসাব বোঝে না। আমার স্ত্রী বলেন, মা, এটা আপনি কী বলেন। এই গয়না না আপনি নাতি-নাতনিদের বিয়ের জন্য রেখে দিয়েছেন? মা বলেন, আগে তো খেয়েপরে বেঁচে থাকা! তারপর গয়না!’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দীর্ঘশ্বাস আমার দিনরাতগুলো ছেয়ে ফেলে।

  • আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন