বাজেট নিয়ে অনেক কথা বলেছি অতীতে। সামান্য কিছু কাজ হয়েছে। প্রান্তিক অনগ্রসর মানুষ আর জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরিখে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছিল উপেক্ষা আর নিদারুণ অবহেলা। এখন নতুন সরকার দেশে, যারা একটি ‘ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতিমূলক’ জাতি গড়ার অঙ্গীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্ম, অঞ্চল, নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর নাগরিককে একসূত্রে গেঁথে একটি বৈচিত্র্যময় পারস্পরিক বোঝাপড়ার সেতুবন্ধ রচনা করবে। তারা অঙ্গীকার করেছে, ‘দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সকল জাতিগোষ্ঠীর সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্ম-কর্মের অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে।’ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা বলেছে, ‘সমতলের আদিবাসীদের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে নৃ-জাতিগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই কাজ হবে? কবে এ নিয়ে আলোচনা হবে? আমি বলব, এবারের বাজেটে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ এই খাতে রাখতে হবে। বাজেট বরাদ্দ না হলে কাজ এগোবে না। আমি আমার অভিজ্ঞতার কথা বললাম।
বিখ্যাত সব উপন্যাস হাজার চুরাশির মা, অরণ্যের অধিকার, আগুন জ্বলেছিল, ঝাঁসীর রাণী, চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর, শিকার ও রুদালীর রচয়িতা মহাশ্বেতা দেবী বলতেন, ‘গরুকে খাওয়ান, সে স্বাস্থ্যপুষ্ট হবে। ঘর সাফ করুন, ঘর পরিষ্কার হবে। বই পড়ুন অনেক, জ্ঞান বাড়বে। গাছ লাগিয়ে যান ও যত্ন করুন, সে ফুল-ফল-পাতা দেবে।’
দীর্ঘ জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় এবার অন্তত একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত হবে, যেখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ জাতি গঠনে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব।
অর্থাৎ যত্ন ও অর্থ ব্যয়ের প্রতিফলন একটা ছোট-বড় মাপের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক হতে বাধ্য। ভারতবর্ষের সমগ্র আদিবাসী জীবনে, আদিবাসীর জন্য যে ব্যয় হচ্ছে তার প্রতিফলন নেই। তার কারণও সহজবোধ্য (বুঝতে চাইলে), এগুলোর যথার্থ রূপায়ণ নেই, তার চেষ্টাও করা হয়নি। আমাদের এখানেও বাজেটের আকার বাড়তে বাড়তে পাঁচ লাখ, ছয় লাখ কোটি ছাড়িয়েছে। এবার আমরা এত বিশাল বাজেটের প্রতিফলন দেখতে চাই সাধারণ খেটে খাওয়া, কৃষক শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে।
২.
বৈশ্বিক অস্থিরতা, করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং যুদ্ধের নানামুখী প্রভাব, অন্যান্য নানা সংকট বিশ্বের মতো আমাদের অর্থনীতিকেও বিশাল চাপে ফেলেছে। তবু বলব নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে আসায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এই কঠিন সময়ে মানুষে মানুষে বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা, সমমর্মিতার বড় প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশটিকে এগিয়ে নিতে হবে।
আমি মনে করি, এখন অভিযোগ-অনুযোগ-মান-অভিমানের বদলে মানুষের পাশে মানুষকে ভালোবেসে সমব্যথী হয়ে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়াবার সময়। এখন সবার যুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার সময়। সহনশীলতা, ধৈর্য, পরমতসহিষ্ণুতা, নির্ভয়, বিনয়ী ও শান্ত ছন্দময় থাকার সময়। আমরা অস্থির সময় পার করছি। অনেক দিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তায় ঢেকে আছে। আবার মনে রাখতে হবে ওই এসডিজির স্লোগান, ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ বা কাউকে পেছনে রেখে নয়। সবাইকে নিয়ে পথ চলতে হবে।
আমরা জানি, একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতখানি উন্নত ও সভ্য, তার বিচার্য বিষয় হলো সেই সমাজে সবচেয়ে অনগ্রসর, প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষেরা কেমন আছেন। এবার আদিবাসী মানুষ, পাহাড়ের মানুষ, হাওর অঞ্চলের মানুষ, চা–বাগানের মানুষ, জেন্ডার বৈচিত্র্য, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ সত্যিই যেন দৃশ্যমান হয় বাজেটে।
এই বাজেট তখনই প্রণোদনামূলক, সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, যদি আমরা এই বিষয়গুলো আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করি। যেমন: এক. ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ভালো উদ্যোগ, তবে এখানে বাস্তবায়নের সময় দেখতে হবে যেন ওপরে বর্ণিত মানুষেরা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপকারভোগী নির্বাচিত হন।
দুই. বাজেট বরাদ্দ হয় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক। যেহেতু সমতলের আদিবাসীদের জন্য কোনো মন্ত্রণালয় নেই, তাই বাজেট বরাদ্দও নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে এ জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট রাখতে হবে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। এই টাকা দিয়ে গবাদিপশু ও বাসস্থান তৈরির সরঞ্জাম (ইট) দেওয়া হয়। এই উদ্যোগ ভালো।
তিন. প্রধানমন্ত্রীর অধীন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে অল্প বরাদ্দ থাকে। এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা। এখানে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা আবশ্যক স্বচ্ছতার স্বার্থে তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে।
চার. পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট থাকে কম। মন্ত্রণালয়সহ আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর বরাদ্দ বাড়ানো দরকার।
পাঁচ. সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী নিয়ে বাজেট বক্তৃতার নীতিমালায় আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
ছয়. নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমিগুলোতে গবেষণাসহ সংস্কৃতির বিকাশে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। অনেক একাডেমিতে পদ বহুদিন খালি পড়ে আছে। সেখানে নতুন নিয়োগের জন্য বাজেট রাখা।
সাত. প্রধানমন্ত্রীর অধীন সমতলের বিভিন্ন জাতির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এককালীন বৃত্তি দেওয়া হয়। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই বরাদ্দ বৃদ্ধি করে একবারের পরিবর্তে বছরে দুবার দিলে ভালো।
৩.
নানা কারণে আদিবাসী জনগণ উন্নয়নের সুফল সবার মতো সমানভাবে পাচ্ছে না। তাই কিছু সময়ের জন্য (নিশ্চয় অনন্তকাল ধরে নয়) তাদের এগিয়ে নিতে নতুন ভাবনায় জাতীয় বাজেটে পৃথক ও বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষা এবং চাকরির নিশ্চয়তাসহ আত্মকর্মসংস্থান যাতে তারা করতে পারে, সে জন্য বাজেটে ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এতে শহরে মাইগ্রেশনও কমে যাবে।
আমি আশা করব, দীর্ঘ জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় এবার অন্তত একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত হবে, যেখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ জাতি গঠনে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব।
সঞ্জীব দ্রং কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
