অভিমত–বিশ্লেষণ
‘জবের বন্যা’র পর এবার কি ‘প্রাইভেটাইজেশনের জোয়ার’
একে একে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ধরনগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এগুলো কর্মসংস্থান বাড়ানোর নীতি। কিন্তু তাতে বাস্তবে কতটা সাড়া পাওয়া যাবে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মোশাহিদা সুলতানা।
তিন দিনের ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলেন আশুলিয়ার পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর মো. জিয়ারুল হক। কাজে ফেরার প্রস্তুতির মধ্যেই মুঠোফোনে এল নোটিশ; চাকরি আর নেই। ব্যবসায়িক মন্দা, কম অর্ডার, ব্যাংকিং সহায়তার অভাব ও গ্যাস–সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণ দেখিয়ে ৮ আগস্ট তাঁর সঙ্গে আরও ৫৬৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়।
জিয়ারুলের মতোই গত ১৬ জুন গাজীপুরের দুটি কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারান। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই তৈরি পোশাকশিল্পের।
২.
গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট মালিকদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলায় হাজারো শ্রমিক চাকরি হারান। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের মুখে শোনা গিয়েছিল ‘জবের বন্যা’ আসবে, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
এরপর নতুন সরকার এলে স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু শুরুতেই ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টিতে আবারও জ্বালানি ও কর্মসংস্থান সংকট ঘনীভূত হয়েছে। গ্যাসের অভাবে চালু কারখানাগুলোই কম সক্ষমতায় চলছে; নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনে যাওয়া তো পরের কথা। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসা এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণপ্রবাহ ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুটিই সংকুচিত হচ্ছে।
বিএনপি সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগে সুদ বাড়ায় বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছিল। সরকার এসে সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে।
বিডা (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ), বেজা (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) ও পিপিপিএ (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ) একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগ সেবা সহজ, দ্রুত, সমন্বিত, ওয়ান-স্টপ ও ডিজিটাল হয়; প্রশাসনিক দ্বৈততা কমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ে।
এ ছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বন্ধ কারখানা চালুর বদলে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে লিজ বা পিপিপির মাধ্যমে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি চালু থাকা ৯টি চিনিকলের ৭টিতেও পুরোনো কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনের বদলে নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের প্রস্তাব পর্যালোচনা চলছে।
বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্প সচল এবং অর্থনীতি চাঙা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে ৭ শতাংশ সুদে ৪১ হাজার কোটি পুনঃ অর্থায়ন স্কিমে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এবং ১৯ হাজার কোটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ দেবে।
পাশাপাশি জ্বালানিসংকট নিরসনে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ, সমুদ্র ব্লকের জন্য নতুন অফশোর বিডিং এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে শর্ত সাপেক্ষে কিছু সরঞ্জামে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাতেও জ্বালানির সংকট কমেনি। তার আগেই বিদ্যুৎ বিতরণ ও জ্বালানি খাতে বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ বাড়ানোর অনেক প্রচেষ্টার কথা আমরা শুনেছি। এখন একে একে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ধরনগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে গৃহীত এসব নীতিকেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সঠিক নীতি। কিন্তু তাতেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে সমস্যা কোথায়?
৩.
কিছু সমস্যা পূর্ব-সৃষ্ট হলেও কিছু সমস্যা নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন মিরসরাই ও রাউজানের বিসিক শিল্পনগরীতে প্রত্যাশিত শিল্প কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠেনি; প্লট বরাদ্দই শুরু হয়নি, শিল্পনগরীর কার্যক্রমও ম্রিয়মাণ। শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই জ্বালানিসংকট বাধা হিসেবে সামনে আসছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ, লজিস্টিকস ও অন্যান্য ইউটিলিটির অভাবে উদ্যোক্তারা আগ্রহী নন।
অন্যদিকে নতুন করে যেই বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতিসহায়তা দেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণদাতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের যে শর্ত দিয়েছে তা মানার পর গ্রাহকেরা যদি নীতিসহায়তা না পান, তাহলে তাঁরা বিপদে পড়বেন। রুগ্ণ শিল্পগুলো নিশ্চয়তার অভাবে ঝুঁকি নিয়ে প্রণোদনার জন্য আবেদনই করতে পারছে না। আর মূল যে জ্বালানি সংকট তা সমাধানে সরকারের বেসরকারীকরণের নীতিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে বেসরকারিভাবে কি জ্বালানিসংকট কাটবে?
জ্বালানির অভাবে যদি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত এমন কারখানা উৎপাদনে যেতে না পারে, ধুঁকতে থাকা শিল্পকারখানা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা টিকতে না পেরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, কিংবা শিল্পকারখানা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে টিকিয়ে রাখতে বারবার ঋণ পুনঃ তফসিল করতে হয়, তাহলে সমস্যা আসলে অন্য কোথাও। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, শিল্প খাত উন্নয়নের উদ্যোগ কি আদৌ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উদ্যোগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে?
লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বেসরকারীকরণের ঢেউ উঠেছে। দেশের অর্থনীতি যেন ‘জবের বন্যা’র কাল থেকে বেসরকারীকরণের জোয়ারের কালে পদার্পণ করেছে। আওয়ামী লীগ আমলেও বেসরকারীকরণের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। সেই সময় সবচেয়ে দৃশ্যমান ছিল মেগা প্রকল্পের ঢেউ। এখন দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রকল্প যা আওয়ামী লীগ শুরু করে শেষ করে যেতে পারেনি, সেটারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে বিএনপি সরকার।
এটা স্পষ্ট যে সরকারের বদল হলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নীতিগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং বেসরকারীকরণের পরবর্তী ধাপ চলছে। যেমন আওয়ামী লীগ সরকার পাট ও চিনিশিল্পগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল বেসরকারীকরণের উদ্দেশ্যেই। সেগুলো কিছু বেসরকারীকরণ হয়েছে আগেই, আর বাকিগুলোর বেসরকারীকরণ সম্পন্ন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
তিনটি প্রতিষ্ঠান এক করে ‘ওয়ান–স্টপ’ সমাধান করলেই কি বিনিয়োগ বাড়বে? উদ্দেশ্য আসলে বেসরকারীকরণের পথ সুগম করা। আর বেসরকারি উদ্যোক্তা মানেই কি ‘সুপার এফিশিয়েন্ট’? তাই যদি হতো, তাহলে এত খেলাপি ঋণ কেন? এত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে কেন? ঋণ পুনঃ তফসিলেই এত দীর্ঘ লাইন কেন? আর জ্বালানিসংকট দেখিয়ে শিল্পকারখানাই বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন?
আওয়ামী লীগ সরকার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল চালু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত বেসরকারি করে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। এই সরকার এসে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। গত সরকার ‘অফশোর বিডিং’ করেছিল। এই সরকার গ্যাস রপ্তানি ও উত্তোলনকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য শর্ত আরও শিথিল করে ‘অফশোর বিডিং’-এর উদ্যোগ নিয়েছে।
লক্ষণীয় হলো, সংকটের সময় আমাদের নীতিনির্ধারকেরা দ্রুত সমাধানের জন্য এমন কিছু উদ্যোগ নেয়, যা পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রেন্টাল-কুইক রেন্টালের দিকে ঝুঁকেছিল। জ্বালানি কোথা থেকে আসবে সেই ব্যবস্থা না করে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেছিল।
এখন বিএনপি সরকার জ্বালানির সমস্যার সমাধান না করে আগেই ‘সিস্টেম লস’ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। এই উদ্যোগে ‘সিস্টেম লস’ কমবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে, সেখানে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের বেসরকারীকরণ আশানুরূপ সফলতা আনতে পারে না, বরং ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
৪.
এই সরকারের সময় একমাত্র ইতিবাচক দিক, যা দেখা গেছে তা হলো, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তেল শোধনাগারের সক্ষমতা সম্প্রসারণ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশ থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধনের পাশাপাশি পরিশোধিত তেল সরাসরি আমদানি করে বাজারে বিক্রির জন্য নীতিমালা করা হচ্ছে। এতে তেলের বাজারের ওপর সরকার যেমন নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তেমনই নতুন শোধনাগার হুমকিতে পড়বে।
আওয়ামী লীগ সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা না বাড়িয়ে, ভারত থেকে তেল আমদানির জন্য পাইপলাইন তৈরি করেছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি সরকার অন্তত এই খাতটি কৌশলগত জায়গা থেকে বিবেচনা করে জ্বালানিনিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সরকার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তেল আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির অনুমতি পেলে সংকটের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও সরকারকে জিম্মি করবে। এলপিজি খাতে এই জিম্মি করার নজির আমরা দেখেছি। সরকার দাম বেঁধে দিলেও এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এখন সরকার নিজেই এলপিজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার কাছ থেকে কীভাবে কেনা হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এলপিজি খাতের নিয়ন্ত্রণ ফেরত নেওয়ার জরুরত স্বীকার করা হয়েছে। এই শিক্ষার পরেও কেন এমন উল্টো নীতি?
জুলাই-আগস্ট মাসে এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের জন্য এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগ আমলে পরিকল্পিত ও অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির শর্ত, যার কারণে বাংলাদেশকে ১৫ বছর ধরে ব্যয়বহুল এলএনজি কিনে যেতে হবে। সবকিছু মিলে দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার, সেই জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনের পথ সম্প্রসারণের পরিবর্তে সংকুচিত হচ্ছে।
এই সরকার যদি কর্মসংস্থান তৈরি করতে চায়, কারখানা সচল করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে ঢালাও বেসরকারীকরণ থেকে সরে আসা—জ্বালানি ও শিল্প—উভয় খাতের জন্যই এটি সত্য। তা না হলে ঋণখেলাপির তালিকায় রুগ্ণ শিল্পমালিকদের নামের পাশাপাশি দীর্ঘ হবে বেকার শ্রমিকদের সংখ্যাও।
৫.
শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই উন্নয়নের সুফল মিলবে না; আগে দেখতে হবে, পুরোনো প্রকল্পগুলো কেন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিকল্পনায় কোথায় ভুল ছিল। মিরসরাই জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে।
২০১২ সালে কাজ শুরু হয়ে এক যুগ পরেও ৩৩ হাজার ৮০৫ একরের প্রকল্পের প্রত্যাশিত শিল্পায়ন দৃশ্যমান নয়। অথচ অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ২২ হাজার ৩৩৫ একর বনভূমির সাড়ে ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিশ্চয়তা না থাকায় বিপুল বিনিয়োগের পরও সেখানে শিল্প স্থাপনের গতি সীমিত।
এদিকে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার নৌ চ্যানেল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৩ সালে কেন্দ্রটি চালু হলেও জ্বালানিসংকটের কারণে প্রায়ই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অথচ চ্যানেল সচল রাখতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এরই মধ্যে মহেশখালী-মাতারবাড়ীকে ঘিরে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার ত্রুটি দূর না করে নতুন প্রকল্প নিলে তা আবারও ব্যর্থ হতে পারে। এতে প্রকল্পের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও মুখ থুবড়ে পড়বে।
বিদ্যমান পরিকল্পনার বড় ভুল হলো ‘ইনক্রিমেন্টালিজম’ অর্থাৎ প্রতিটি সমস্যাকে আলাদাভাবে সমাধানের চেষ্টা করা। অথচ প্রয়োজন ছিল সমন্বিত উদ্যোগ। কেন মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, কেন মাঠের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের উদ্বেগগুলোকে গোনায় ধরা হয়নি, কর্মকর্তারা যৌক্তিক প্রশ্ন করলে কেন তাঁদের বদলি করা হয়েছে—এগুলোই এখন নীতি নির্ধারণে জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সরকার যদি কর্মসংস্থান তৈরি করতে চায়, কারখানা সচল করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে ঢালাও বেসরকারীকরণ থেকে সরে আসা—জ্বালানি ও শিল্প—উভয় খাতের জন্যই এটি সত্য। তা না হলে ঋণখেলাপির তালিকায় রুগ্ণ শিল্পমালিকদের নামের পাশাপাশি দীর্ঘ হবে বেকার শ্রমিকদের সংখ্যাও।
ড. মোশাহিদা সুলতানা সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব
