শরিয়াহ ও ইসলাম প্রশ্নে যে সংকটে জামায়াত

‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’ শব্দযুগল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। কোনো রাষ্ট্র যখন কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করাকে তার স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করে, তখন সে হয়তো কোনো কিছুই বলে না কিংবা একেক পর্যায় থেকে একেক রকম বক্তব্য দিয়ে থাকে।

চীন বল প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখল করার চেষ্টা করলে আমেরিকা সামরিকভাবে তাইওয়ানের সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না, এ প্রসঙ্গে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি খুবই আলোচিত। ক্ষমতায় গেলে জামায়াত ইসলামি শরিয়াহ কায়েম করবে নাকি করবে না, সেটা নিয়ে আলোচনা চলছিল শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই।

নির্বাচন যত সামনে আসছে, এই প্রশ্ন তত জোরালো হচ্ছে। আর সম্প্রতি বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে, কারণ ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন করেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে।

এর কিছুদিন আগেই আলোচনাটি এসেছিল যখন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদল দেখা করেছিল জামায়াত আমিরের সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎকার থেকে বেরিয়ে দলটির একজন প্রতিনিধি জানান, জামায়াতের আমির তাঁদের জানিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁরা শরিয়াহ আইন কায়েম করবেন না। এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকা ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জামায়াতের শরিয়াহ কায়েম করার অনীহাকে দেখিয়েছে।

এখন পর্যন্ত জামায়াতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দু–তিনজন নেতার মধ্যে কারও কাছ থেকে আমরা স্পষ্টভাবে শুনিনি ক্ষমতায় গেলে দলটি শরিয়াহ আইন কায়েম করবে কি না। অবশ্য দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতাকে এ ব্যাপারে ভারতকে আশ্বস্ত করতে দেখা গেছে (যদিও দলটি তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে ভারত–তোষণের অভিযোগ করছে নিয়মিতভাবে)।

‘বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে দিল্লিতে এখন যেসব চিন্তাভাবনা’ শিরোনামের বিবিসি বাংলা একটি  প্রতিবেদন করেছে। সেখানে বলা হয়, সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে বৈঠকের সূত্র ধরে তিনি (ড. শ্রীরাধা দত্ত) বলছিলেন, ‘আমি ড. তাহেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ধরুন, আপনারা সরকার গড়ার মতো সংখ্যা পেয়ে গেলেন। তাহলে কি দেশে শরিয়াহ আইন আনতে চাইবেন?’ ‘উনি তখন বললেন, এটা আবার কোথায় শুনলেন? আমরা কবে কোথায় বলেছি জিতলে আমরা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন আনব!’ (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের উচিত হবে অতি দ্রুত শরিয়াহর ব্যাপারে তার অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণকে তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘ইনফর্মড ডিসিশন’ নিতে সাহায্য করা। জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বোঝা উচিত, এই প্রশ্নে দলটির ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’ তাদের বহুল প্রচারিত ‘সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগানের পরিপন্থী এবং এটা স্পষ্টভাবেই দ্বিচারিতা (ধর্মীয় পরিভাষায় মোনাফেকি)।

যে দলটি এ কথাগুলো বলছে, তাদের গঠনতন্ত্র পড়লে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই, মনে হবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় সংগঠন এটি। পুরো গঠনতন্ত্র থেকে অল্প কয়েকটি বিষয়ে একটু দেখে নেওয়া যাক— জামায়াতের স্থায়ী কর্মপন্থার প্রথমটিতে বলা আছে—কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কোনো কর্মপন্থা গ্রহণের সময় জামায়াত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ–তাআলা ও তাঁহার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর নির্দেশ ও বিধানের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করিবে। সদস্য (রুকন) হওয়ার শর্তের প্রথমটি হলো—ব্যক্তিগত জীবনে ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করেন এবং কবিরা গুনাহ হইতে বিরত থাকেন।

জামায়াত আমিরের কর্তব্যের প্রথমটি হলো, আমিরে জামায়াত আল্লাহ–তাআলা ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পালন ও আনুগত্যকে সবকিছুর ওপর অগ্রাধিকার দান করিবেন। রুকনের শপথের প্রথম ধারায় বলা আছে, দুনিয়ায় সামগ্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবজাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ–তাআলা প্রদত্ত ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত দ্বীন কায়েমের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সাফল্য অর্জন করাই আমার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং এই লক্ষ্য হাসিলের প্রচেষ্টা চালাইবার জন্য আমি খালিসভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে শামিল হইতেছি।

নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
ছবি : প্রথম আলো

আমরা এমন একটি রাজনৈতিক দলের কথা বলছি, যার কেন্দ্রীয় সদস্য হওয়ার জন্য একজন পারফর্মিং মুসলিম হওয়ার শর্ত আছে, অর্থাৎ কোনো অমুসলিম ব্যক্তি সেটা হতে পারবেন না। অমুসলিম ব্যক্তিদের জন্য (যাঁরা কোনোভাবেই রুকন হতে পারবেন না) সহযোগী সদস্য নামে একটা অপশন চালু করে জামায়াত বলার চেষ্টা করছে, তাঁদেরও সুযোগ আছে। কিন্তু গঠনতন্ত্র পড়লে এটা স্পষ্ট—যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় রুকনদের মাধ্যমে। অর্থাৎ এই দলে কখনো একজন অমুসলিম ব্যক্তি আমির হতে পারবেন না।

জামায়াত যখন এই বার্তা প্রয়োজনমতো কোথাও কোথাও দিতে চাইছে যে ক্ষমতায় এলে তারা শরিয়াহ কায়েম করবে না, তখন জামায়াতের নেতারা (যাঁদের মধ্যে আছেন এমপি পদপ্রার্থীরাও) টিভি টক শোতে প্রকাশ্যে শরিয়াহ কায়েম করার কথা বলছেন। শুধু তা–ই নয়, মাঠপর্যায়ে প্রচারের ক্ষেত্রে মধ্য থেকে নিম্নপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা শরিয়াহ কায়েমের আলাপ করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়াকে ইমানি দায়িত্ব হিসেবে বলছেন। আবার কেউ কেউ এই ভোট দেওয়াকে ‘বেহেশতের টিকিট’ হিসেবে তুলে ধরছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতের পক্ষ থেকে শরিয়াহ কায়েম না করার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও অন্যদিকে কেন আবার সেই আলাপ মাঠে রাখা হচ্ছে?

রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামী আসলেই এক বড় সংকটে পড়েছে। দলটির নামের সঙ্গে যেহেতু ‘ইসলাম’ শব্দটা আছে, এবং যেহেতু দীর্ঘদিন দলটি তার স্লোগানে ‘আল্লাহর আইন চাই’ বলে এসেছে, তাই তার আদি সমর্থকদের একটা অংশ জামায়াতকে ভোট দিতে চায় ইসলামি শরিয়াহ কায়েমের জন্য। অপর দিকে জামায়াত বুঝতে পারছে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি যদি তাকে করতে হয়, তাহলে ইসলামি শরিয়াহ কায়েমের রাজনীতি তার লক্ষ্য পূরণ করতে সহায়ক হবে না।

এ কারণেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে ছাত্রশিবিরের প্যানেল তাদের ইশতেহার থেকে ‘ইসলাম’ সরিয়ে ‘ওয়েলফেয়ার’ নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া নির্বাচনে জয়ী হয়ে শরিয়াহ কায়েম করলে তার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, ওয়াশিংটন পোস্ট–এর সেই রিপোর্টে মার্কিন কূটনীতিকের বক্তব্যে সেটা স্পষ্ট।

কলামের শুরুতে যে ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’র কথা বলছিলাম, জামায়াত সেটা এই নির্বাচন সামনে রেখে করছে। সে আসলে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না, বরং উভয় রকম বক্তব্যই মাঠে রাখতে চাইছে। কিন্তু এটা কোনোভাবেই হওয়া উচিত নয়। বিএনপির বিপরীতে মানুষ আওয়ামী লীগকে কিংবা আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপিকে ভোট দেওয়া আর বিএনপির বিপরীতে জামায়াতকে ভোট দিয়ে দেওয়া একই ব্যাপার নয়। এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক ব্যাপার আছে।

জামায়াতের আমিরকে জনসমক্ষে প্রকাশ্যে বলতে হবে ক্ষমতায় গেলে জামায়াতে ইসলামী ইসলামি শরিয়াহ কায়েম করবেন কি না। যদি সেটা করে থাকেন, তাহলে তার শরিয়াহর রূপরেখা প্রদান করবেন। কারণ, জামায়াতে ইসলামী যে ইসলামের কথা বলে, সেটাকে ইসলাম বলে মনে করেন না এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ধর্মবেত্তা আছেন (হেফাজতে ইসলামের বর্তমান আমির এর অন্তর্গত)। এই বিতর্কে আমরা ঢুকব না; কিন্তু জামায়াতকে অবশ্যই এটা স্পষ্টভাবে বলতে হবে।

একটা দল, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো ‘ইসলামি’ দল শরিয়াহ কায়েম করার কথা বললে বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের অধীন রাজনীতি করার কোনো অধিকার থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও তখন আসবে। আর তাঁরা এখন যেভাবে বলছেন শরিয়াহ কায়েম করবেন না, তাহলে প্রশ্ন আসবেই—তাদের নামে ইসলাম শব্দটি ব্যবহার করার মাধ্যমে তাঁরা কি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছেন না? এমনকি তাঁদের যে গঠনতন্ত্র, সেটাও কি বাংলাদেশের সংবিধানের অধীন রাজনীতি করার জন্য অনুপযোগী নয়?

নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের উচিত হবে অতি দ্রুত শরিয়াহর ব্যাপারে তার অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণকে তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘ইনফর্মড ডিসিশন’ নিতে সাহায্য করা। জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বোঝা উচিত, এই প্রশ্নে দলটির ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাম্বিগিউইটি’ তাদের বহুল প্রচারিত ‘সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগানের পরিপন্থী এবং এটা স্পষ্টভাবেই দ্বিচারিতা (ধর্মীয় পরিভাষায় মোনাফেকি)।

  • জাহেদ উর রহমান শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব