আদালতে দলবাজি: ন্যায়বিচার না থাকলে রাষ্ট্রের কী দরকার

২৪ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনা। অকুস্থল বরিশাল। আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে হট্টগোল হয়েছে। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা এজলাসে ঢুকে বেঞ্চ ধাক্কাধাক্কি ও চেঁচামেচি করেন। ওই ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে দুপুরে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন মঞ্জুর করার প্রতিবাদে চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। তাঁরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

উল্লেখ্য যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস গত সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন পান। বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

এদিকে আইনজীবী সমিতির সভাপতি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দিতে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৮ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের বিচারক আমাদের জানিয়েছেন যে তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসকে জামিন দেওয়া হবে। আমি বললাম, আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে আমরা কী বলব? আমরা তাঁকে জামিন না দিতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি জামিন দিয়ে দেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা কোর্টে ঢুকে প্রতিবাদ জানান’ (সূত্র: প্রথম আলো, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

আদালতে এ ধরনের ঘটনা এর আগেও অনেকবার দেখা গেছে। বিচারকের সিদ্ধান্তে বা রায়ে একটি পক্ষ খুশি হয়, অন্য পক্ষ বেজার হয়। সচরাচর দেখা যায়, উভয় পক্ষের আইনজীবীদের প্রতিনিধি সাংবাদিকদের সামনে এসে নিজ নিজ অনুভূতি ব্যাখ্যা করেন। কোনো আইনজীবী বলেন না যে তাঁর কোনো সওয়াল বা মামলার মেরিটের কারণে তাঁর হার কিংবা জিত হয়েছে। তবে ‘পরাজিত পক্ষ’ রেগে গিয়ে মাঝেমধ্যে তুলকালাম ঘটায়। গণমাধ্যম সূত্রে আমরা এটি জানতে পারি।

আইনের শাসন’ কথাটা শুনতে বেশ মধুর। আমাদের দেশে এটি নেই। নেই বলেই কর্তাদের মুখে সব সময় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাতম শুনি। রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে ন্যাবিচার। এটি না থাকলে রাষ্ট্র তার উপযোগিতা হারায়। ন্যায়বিচারই যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কী দরকার? 

আমরা সব সময় শুনে আসছি, জামিন পাওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার। এটি অবশ্য নির্ভর করে মামলার বিষয়বস্তুর ওপর। বিশেষ করে কোন ধারায় অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছে। কিছু কিছু মামলা আছে, যা জামিনের অযোগ্য।

আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক মারাত্মক অপরাধীও জামিন পেয়ে যান, আবার অনেক নিরীহ লোকের জামিন হয় না। পুলিশ তাকে কোন ধারায় মামলা ঠুকে দিয়েছে, সেটি এখানে বিবেচ্য। এখানে আইনজীবীর পারঙ্গমতা ও সরকারের ইশারা—দুটিই কাজ করে। ইদানীং ‘হত্যা মামলার’ সংখ্যায় রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে।

মনে আছে, যেদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বিরোধী দলের সাবেক নেতা খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তাঁকে দেখতে তাঁর গুলশানের বাসায় গিয়েছিলেন এবং গেট খুলে না দেওয়ায় ফিরে এসেছিলেন, সেদিনই যাত্রাবাড়ীতে বাস পোড়ানোর একটি মামলা দেওয়া হয়েছিল খালেদা জিয়াকে আসামি করে। সরকার চাইলে কী না করতে পারে! 

আরও পড়ুন

কাগজে–কলমে আদালত স্বাধীন হলেও এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যথেষ্ট বাগাড়ম্বর থাকলেও আদতে আদালত কতটুকু স্বাধীন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ নিয়ে আমাদের দুই ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। কখনো দেখা যায়, আদালত শক্তিশালী কোনো পক্ষের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে সাহসী রায় দেন। আবার ঘুষ খেয়ে বা প্রভাবিত হয়ে অন্যায্য রায় দেওয়ার উদাহরণও আছে। সমস্যাটি এক দিনে তৈরি হয়নি।

কিছুদিন আগে জুলাই সনদের খসড়া পড়ার সুযোগ হয়েছিল। বিভিন্ন খাতে ৮৮টি সংস্কার প্রস্তাব ছিল। এগুলোর ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছিল। কোনো কোনো প্রস্তাব কেউ সমর্থন করেছিল, আবার কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছিল। সেখানে বিচার বিভাগের সংস্কার নিয়ে কিছু প্রস্তাব ছিল। তার মধ্যে একটি প্রস্তাব হলো আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় কার্যক্রম করা যাবে না। দেখা গেছে, অনেক দল এটি সমর্থন করলেও গুটিকয় দল তাতে আপত্তি দেয়। 

আরও পড়ুন

আমরা জানি, দেশের আর দশটি পেশাজীবী গ্রুপের মতো আইনজীবীরাও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ইত্যাদি দলের ফোরাম আছে। একেকটির একেক নাম। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের মধ্যে রাজনৈতিক দলাদলি থাকলে আইনজীবীদের মধ্যে এটি থাকবে না কেন? তারাও তো একই গ্রহের মানুষ! এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—তাঁদের কাজ কী?

আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই, আইনজীবীরা একটি বিশেষ দলের সক্রিয় সমর্থক হলে তাঁরা ওই দলের পক্ষে একটি ফোরাম বা পরিষদ বানান। রাজনীতি করার অধিকার তো সবারই আছে। প্রশ্ন হলো, আদালতে তাঁদের রাজনীতিটা কী?

আমরা জানি, একটি দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে ওই দলের সমর্থক আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁরা হন রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা। এর অর্থ হলো সাধারণ মানুষ তাঁদের ট্যাক্সের টাকায় একটি দলীয় বাহিনী পুষতে বাধ্য হন। এই বাহিনীর কাজ হলো দলের লোকদের পক্ষে এবং প্রতিপক্ষ রাজনীতির লোকদের বিপক্ষে আদালতের রায় আদায় করা। প্রয়োজনে তাঁরা নানাভাবে বিচারকের ওপর চাপ তৈরি করেন। বছরের পর বছর এভাবেই চলে আসছে। 

আরও পড়ুন

অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর দলীয় সরকারের পকেটে রেখে বিচারকের স্বাধীনতা কিংবা ন্যায়বিচার কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, এটি আমার বুঝে আসে না। এটা নিয়ে কোনো দল কথা বলে না। কারণ, মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো এই দপ্তর একবার এই দলের, আরেকবার ওই দলের হাতের মুঠোয় চলে আসে। মাঝে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। তাতে সমস্যা নেই। সবুরে মেওয়া ফলে।

দল করলে আইনজীবীরা আরও কিছু সুবিধা পান। আইনজীবী কোটায় অনেকেই উচ্চ আদালতের বিচারক নিযুক্ত হন। অনেকের আবার শিক্ষাগত যোগ্যতার তেমন বালাই থাকে না। রাজনীতি আর দীর্ঘদিন কোর্ট প্র্যাকটিসই তাঁদের সফলতার চাবিকাঠি। 

আমাদের এখানে যথেচ্ছ জামিন–বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে পুলিশ, আইনজীবী আর আদালতের মধ্যে একটি আঁতাত আছে। একটি হত্যাচেষ্টা বা খুনের মামলায় যখন কয়েক শ আসামির নাম থাকে এবং আরও কয়েক শ থাকে ‘অজ্ঞাতনামা’, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এর মধ্যে বাণিজ্যের একটি ব্যাপার আছে। এখানে গ্রেপ্তার-বাণিজ্য আর মামলা-বাণিজ্য একাকার হয়ে যায়। সরকার আসে আর যায়। এই বাণিজ্যে কেউ হাত দেয় না। এমনও হতে পারে, হাত দিলে সেই হাত পুড়ে যেতে পারে। কারণ, এই সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী। তার শিকড় অনেক গভীরে।

আদালতে আইনজীবীদের ফোরাম নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই। ধরা যাক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সেখানে আছে দলীয় ফোরাম। প্রকৃত অর্থে এগুলো আইনজীবীদের ফোরাম নয়। এগুলো হচ্ছে বিশেষ কোনো দলের সুপ্রিম কোর্ট শাখা। সংস্কার প্রস্তাবে এটিই হয়তো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। আইনজীবীরা দল করুন, তাতে সমস্যা দেখি না। তাই বলে আদালত চত্বরে দলীয় অবস্থান নিয়ে মিছিল করতে হবে কেন? পছন্দের রায় পেতে বিচারকের ওপর চড়াও হতে হবে কেন?

‘আইনের শাসন’ কথাটা শুনতে বেশ মধুর। আমাদের দেশে এটি নেই। নেই বলেই কর্তাদের মুখে সব সময় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাতম শুনি। রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে ন্যাবিচার। এটি না থাকলে রাষ্ট্র তার উপযোগিতা হারায়। ন্যায়বিচারই যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কী দরকার? 

মহিউদ্দিন আহমদ গবেষক ও লেখক

* মতামত লেখকের নিজস্ব