বস্তুত প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ ছিল খুন ও গুম–সংক্রান্ত। সে খুনকে বিচারবহির্ভূত হত্যা বলা যায়। আর তারা বলত, ক্রসফায়ার কিংবা বন্দুকযুদ্ধ। আর গুমের শিকার কিন্তু অপরাধজগতের লোকজন ছাড়াও রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের লোকজনও ছিলেন। এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যেত না। এমনকি এ দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে নিরপরাধ বা সামান্য অপরাধীও।

র‌্যাবের এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে বেশ কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। বিষয়টি কোন দিকে যাচ্ছে, তা অনুধাবন করতে পারেননি র‍্যাবের নেতৃত্ব এবং আমাদের নীতিনির্ধারকেরা। বরং দীর্ঘদিন এর পরিসর বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি এবং এর সাতজন কর্মকর্তার ওপর নেমে আসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে মুখে অনেক তোলপাড় চলছিল। পাশাপাশি বাস্তবতা উপলব্ধি করে চলছিল প্রতিকারের প্রচেষ্টা। আমরা আনন্দিত, সে ব্যবস্থা অনেকটাই সফল হয়েছে। এতে যারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, নজরে এসেছে তাদেরও। করছে প্রশংসা। বিষয়টি এভাবে ধরে রাখতে পারলে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় একসময় সে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার কথা। আমরা আশা করব, তা-ই হবে।

এখন দেখা দরকার, বিষয়টির সূচনা ও বিকাশ কীভাবে হলো। বিএনপি সরকারের সময়ে একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলে অপারেশন ক্লিন হার্ট নামের একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর দায়িত্বে থাকে সেনাবাহিনী। এ অভিযানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সে সময়েই আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটতে দেখি। তখন এর শিকার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিল অপরাধজগতের কুখ্যাত লোক। তাই সূচনায় জনগণের সমর্থন পায় অভিযানটি। আবেগে এটা ভুলে যাওয়া হয় যে তাদেরও বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। অপারেশন শেষে অবশ্য সংসদ আইন করে সে অভিযোগে অংশগ্রহণকারীদের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দেয়।

যা-ই হোক, আমরা শুধু এ ক্ষেত্রে নয়, অনেক ক্ষেত্রেই পানি ঘোলা করে খেতে পছন্দ করি। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার সংবাদমাধ্যমের দ্বার অবারিত করে দিয়েছে। কিছুই লুকিয়ে রাখা যাবে না। আর লুকাবই-বা কেন? আমরা তো একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেই স্বাধীন হয়েছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ ভুলভ্রান্তি করতে পারে, সেটা যথাযথ কর্তৃপক্ষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে ব্যবস্থা নিলে অনেক ভোগান্তি কমানো যায়। অনেক দেরিতে হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি কাজে লাগবে।

অন্যদিকে তখন জঙ্গি তৎপরতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে বিভিন্নভাবে দেশের প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা ও বিচারকাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হত্যার মতো অপরাধ করতে থাকে। সে পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ, সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য বেসামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় র‍্যাব। এর আইনি ভিত্তি সংশোধিত ব্যাটালিয়ন পুলিশ অধ্যাদেশ। পুলিশের মহাপরিদর্শকের আওতায় আরও একটি বাহিনী। তবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে এটা স্বতন্ত্র বাহিনীর মতো কাজ করে চলছে। তেমন কোনো সমন্বয় নেই জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সঙ্গে।

র‍্যাব গঠনের পর এর ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণে অনেক মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমোন্নয়ন সম্পর্কে আশাবাদী হয়। স্বীকার করতে হবে, তারা অনেকটাই তা করেছে। বিশেষ করে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এ বাহিনীর সাফল্য নজরকাড়ার মতো। জেএমবি নামের প্রতিষ্ঠানটির মূল নেতাদেরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে সংগঠনটিকে তছনছ করে দেয়। এসব র‍্যাব করেছে সম্পূর্ণ আইনের আওতায়। বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত আদালতে সোপর্দ করে। বিচার হয় দেশের প্রচলিত আইনে। র‍্যাব প্রশংসিত হয় দেশে ও বিদেশে।

ভেজালবিরোধী অভিযানেও তারা নজরকাড়ার মতো অবদান রাখে। তবে একপর্যায়ে তাদের কিছু সদস্যের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের প্রবণতা পেয়ে বসে। এমনকি এ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে পুলিশের মধ্যেও। এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারক মহল একেবারে অজ্ঞ ছিল, এমন দাবি করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলব।

আরও অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে গুম, হত্যা কিংবা সীমান্তের অপর পাড়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা আদৌ নীতিনির্ধারকদের অজানা থাকার কথা নয়। এমনকি ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং দিতে না পারলে হত্যার অভিযোগও আছে। নিজেদের ক্ষমতার বাহাদুরি দেখাতে গিয়েও দু-একটি ঘটনা ঘটেছে। যেমন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। আবার কোনো কোনো অপরাধী বা ঘটনাকে আড়াল করার জন্যও ক্ষেত্রবিশেষে ঘটেছে এমন কিছু ঘটনা।

যেমন সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যার ঘটনায় সম্ভাব্য ও স্বাভাবিক সাক্ষীদের দুজনকে খুন ও একজনকে গুমের বিষয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলাটি শেষ পর্যন্ত বিচারের মূল স্রোতোধারায় এসেছে। তবে মেজর সিনহার খুনের পর ওসি প্রদীপসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দায়রা আদালতে দণ্ডিত হওয়া এ ধরনের কার্যক্রমে পুলিশ কিছুটা হাত গোটায়। তবে র‍্যাব তখনো ছুটছিল একই পথে। তারা থামতে বাধ্য হয়, অনেকটা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসার পর। আমরা নিজেরা ব্যবস্থা নিতে পারলাম না। র‍্যাবের মতো একটি চৌকস বাহিনী কলঙ্কিত হলো। অথচ চমৎকার গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক–সংবলিত এমন একটি বাহিনী আরও জোরদার হওয়া দরকার।

একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এসব সংস্থায় যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা খুব কমই অবসরের দ্বারপ্রান্তে আছেন। বরং সামনে রয়েছে বিশাল সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ। নিজের লোভ কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেআইনি আদেশ পালন সাময়িকভাবে সুফল দিতে পারে। পাশাপাশি অন্ধকারে বিলীন হয়েও যেতে পারে সম্ভাবনাময় অনাগত ভবিষ্যৎ। র‌্যাবের গঠন ও ক্ষমতার উৎস আইন। অপরাধ দমন করতে গিয়ে সেই আইনকে স্মরণে রাখলে এমনটা ঘটার কথা নয়। অথচ মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেও আইন পালন করা যায়, এটা আজ র‍্যাব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে সফরকারী ডোনাল্ড লু বলে গেছেন। র‍্যাব খুব বড় বাহিনী নয়।

ধারণা করা অমূলক নয়, র‍্যাব কিংবা পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তাদের নেতৃত্ব কিংবা নীতিনির্ধারক মহল বরাবর উপেক্ষা করে একরকম উসকানি দিয়ে আসছিলেন। এতে ঘটেছে বিপর্যয়। তবে বিষয়টি খুব বড় নয়। আরও বড় হবে না, এমন কিন্তু নয়। তাদের সঠিক পথে চালনার জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন হলো, এটা ভেবে লজ্জিত হতে হয়। র‍্যাব যখন ‘উল্টাপাল্টা’ করছিল, তখন নীতিনির্ধারক মহল থেকে ব্যবস্থা না নিয়ে, বরং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবাদকে যেভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে, তা ভেবে আরও বেশি লজ্জিত হতে হয়।

যা-ই হোক, আমরা শুধু এ ক্ষেত্রে নয়, অনেক ক্ষেত্রেই পানি ঘোলা করে খেতে পছন্দ করি। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার সংবাদমাধ্যমের দ্বার অবারিত করে দিয়েছে। কিছুই লুকিয়ে রাখা যাবে না। আর লুকাবই-বা কেন? আমরা তো একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেই স্বাধীন হয়েছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ ভুলভ্রান্তি করতে পারে, সেটা যথাযথ কর্তৃপক্ষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে ব্যবস্থা নিলে অনেক ভোগান্তি কমানো যায়। অনেক দেরিতে হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি কাজে লাগবে।

  • আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

    [email protected]