এআই ইস্যুতে কেন বিশ্বনেতাদের এক হতে হবে

এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্যে একটি নাগরিক সংগঠনের প্রতিবাদছবি: এএফপি

এই মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের নেতারা সমবেত হবেন। এবারের মূল প্রতিপাদ্য, ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান তাঁদের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে। তবে প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্টারনেটও সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ, আজকের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বড় একটি অংশ ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে হয়েছে।

প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থা কমছে। মানুষের মনে হচ্ছে, প্রযুক্তি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকার বদলে প্রযুক্তিই তাঁদের ব্যবহার করছে। ব্যক্তিগত তথ্য বৃহৎ ভাষা মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী তথ্যকেন্দ্রের চাপ বহন করছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী। প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন অনলাইন প্রতারণা ও জালিয়াতি।

অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। অথচ এসব সিদ্ধান্তে প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মতামত খুব কমই নেওয়া হচ্ছে। সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ অল্পসংখ্যক সরকার ও কোম্পানি নির্ধারণ করছে। গবেষক ও নাগরিক সমাজকে মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তাঁদের মতামত কীভাবে বা আদৌ কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।

আরও পড়ুন

তবে জনস্বার্থ রক্ষার সঙ্গে উদ্ভাবনের বিরোধ নেই। ইন্টারনেটই তার প্রমাণ। বহু পক্ষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইন্টারনেট দেখিয়েছে, বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা যায়। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি সম্ভব।

ইন্টারনেট কোনো একক সরকার বা কোম্পানি তৈরি করেনি। সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এটি বিকশিত হয়েছে। এই সহযোগিতাই বৈশ্বিক ইন্টারনেটের ভিত্তি তৈরি ও টিকিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত ও পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নিরাপদ ব্যবস্থা এবং সংকট সহ্য করে টিকে থাকতে সক্ষম অবকাঠামো।

শিল্প খাতে একীভবন ও কেন্দ্রীভবনের ফলে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। একই সময়ে ভূরাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বিভিন্ন সরকারও ইন্টারনেটকে নিজেদের মতো করে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে ইন্টারনেটের ওপর তৈরি প্রযুক্তিগুলো, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর পরিণতি ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ওয়েব এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা সংস্থায় এটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে সংস্থাটি ওয়েবের সফটওয়্যার সবার জন্য বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করে দেয় এবং মেধাস্বত্বের অধিকার ছেড়ে দেয়। ফলে যে কেউ এটি ব্যবহার, পরিবর্তন ও বিতরণ করতে পারে। গবেষকদের জন্য তৈরি এই প্রযুক্তি পরে অর্থনীতি ও সমাজ বদলে দেওয়ার শক্তিতে পরিণত হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের জন্য এখানেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। প্রযুক্তির অবকাঠামো যত বেশি উন্মুক্ত থাকবে এবং মানুষ যত সহজে তার ওপর নতুন কিছু তৈরি করতে পারবে, প্রযুক্তি তত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে ও বিকশিত হবে। ইন্টারনেটকে সহজলভ্য ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য তৈরি অনেক প্রযুক্তি সীমান্ত পেরিয়ে জনস্বার্থভিত্তিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের পেছনেও এসব প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে।

আরও পড়ুন

এ কারণেই ইন্টারনেট সোসাইটি বহু বছর ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে জাতিসংঘ পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত ও পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা। এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আছে। প্রযুক্তি দ্রুত বদলায়, অথচ ঐকমত্যে পৌঁছাতে সময় লাগে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অল্প কয়েকটি শক্তিশালী সরকার ও কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিকল্প আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

শিল্প খাতে একীভবন ও কেন্দ্রীভবনের ফলে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। একই সময়ে ভূরাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বিভিন্ন সরকারও ইন্টারনেটকে নিজেদের মতো করে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে ইন্টারনেটের ওপর তৈরি প্রযুক্তিগুলো, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর পরিণতি ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন ‘বদ্ধ ডিজিটাল পরিসর’ ও জাতীয় ইন্ট্রানেট মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। বৈশ্বিক নেটওয়ার্কটি খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। সরকারের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ হলে মানুষ দিনের পর দিন অর্থনৈতিক ও নাগরিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। অনেক জনগোষ্ঠী এখনো অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারেনি।

তাই প্রযুক্তির ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু আলাদা প্রযুক্তিগুলোকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করলেই হবে না। যেসব প্রযুক্তির ওপর এগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভিত্তিকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে। এর ভবিষ্যৎ যেন শুধু করপোরেট ও সরকারি স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

উন্মুক্ত ও সহজলভ্য ইন্টারনেট এমন একটি ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে ধারণা ও উদ্ভাবন সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ জনকল্যাণে নতুন প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ পাবে।

স্যালি ওয়েন্টওর্থ ইন্টারনেট সোসাইটি এবং ইন্টারনেট সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ