ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূমিকা এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন ধ্বংসাত্মক বলের মতো, যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আছড়ে পড়ে পুরোনো কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে, কিন্তু নতুন কোনো স্থিতিশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলছে না। ইউক্রেন থেকে গাজা, ন্যাটো থেকে মধ্যপ্রাচ্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর নীতি একদিকে অস্থিরতা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এ প্রেক্ষাপটে এবার ট্রাম্প চীনে যাচ্ছেন দুই দিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে। সেখানে মুখোমুখি হবেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে। বিষয়টি শুধুই একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং বর্তমান বিশ্বশক্তির ভারসাম্য কতটা বদলে গেছে, তার একটি স্পষ্ট পরীক্ষা।
ট্রাম্পের সামনে এখন বড় সমস্যা হলো দেশে দেখানোর মতো কোনো বড় কূটনৈতিক সাফল্য তাঁর নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়নি, মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ এবং ইরান নিয়ে তাঁর নীতি এখনো অস্থির। ফলে তিনি এমন একটি ফলাফল চাইছেন, যা তিনি দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে বিক্রি করতে পারবেন।
এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো ইরান সংকট। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন যেন ইরানকে সামরিক সহায়তা না দেয় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে সহায়তা করে। কারণ, এই প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প এখন দুর্বল অবস্থানে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে, যার দায় অনেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপাচ্ছে।
অন্যদিকে সি চিন পিং এ পরিস্থিতিকে একধরনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা যখন মধ্যপ্রাচ্যে, তখন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল আরও দৃঢ় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান থেকে চীন বর্তমানে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। গত বছরই এর পরিমাণ ছিল মোট ইরানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ কারণে চীন বিকল্প পথ খুঁজছে। তারা সংরক্ষিত জ্বালানি ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর জোর এবং রাশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য সিকে একটি চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছেন যেন ইরানকে সামরিক সহায়তা না দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেছেন, চীন এতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক মহলে এই নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে তেল চলাচল বন্ধ হলে চীনের জন্য সংকট তৈরি হবে। এ পরিস্থিতিতে চীন কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছে। তারা ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে এবং অতীতে সৌদি আরব-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করার অভিজ্ঞতাকে সামনে আনছে।
চীনের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে—আন্তর্জাতিক আইনকে কখনো প্রয়োজনে ব্যবহার করে, আবার প্রয়োজনে বাদ দেওয়া যায় না। সি চিন পিং সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ‘আইনের শাসনকে সুবিধামতো ব্যবহার করলে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দাবি করছে, চীন ইতিমধ্যে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্রপ্রযুক্তির উপাদান, স্যাটেলাইট তথ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সহায়তা দিচ্ছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিকভাবে ইরানের ওপর চাপ বাড়ায়, তবে এই সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য সিকে একটি চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছেন যেন ইরানকে সামরিক সহায়তা না দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেছেন, চীন এতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক মহলে এই নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এক দ্বন্দ্বে আটকে আছেন। একদিকে তিনি চীনের সঙ্গে সমঝোতা চাইছেন, অন্যদিকে তাঁর নীতিই আবার চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আরও শক্তিশালী করছে। ফলে তিনি নিজেই এমন একটি সংকট তৈরি করেছেন, যেখান থেকে সহজে বের হওয়া কঠিন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাইওয়ান প্রশ্ন।
চীনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করা। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে তাইওয়ানের পাশে থাকলেও ট্রাম্পের অবস্থান অনেক সময় অস্পষ্ট ও পরিবর্তনশীল। তিনি একবার বলেন বিষয়টি ‘চীনের সিদ্ধান্ত’, আবার অন্য সময়ে সামান্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সাইমন টিসডাল আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষক এবং ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান–এর বিদেশনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত