আমি প্রকাশ্যে বলেছি, এই পুরোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলে আমি কখনোই বলিনি। সত্যটা হলো, আমি কখনো প্রধানমন্ত্রীর কথা উল্লেখ পর্যন্ত করিনি। আমি শুধু বলতে চেয়েছি, সোনিয়া গান্ধী গোপনীয়তা–সংক্রান্ত কোনো রাষ্ট্রীয় শপথ গ্রহণ ছাড়াই সরকারের গোপন ফাইল হাতে পেতেন এবং তিনি সরকারের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

মনমোহন সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা এ কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছেন। সোনিয়া গান্ধীর গুণমুগ্ধ সহযোগীরা বেশ গৌরবের সঙ্গে এখনো বলে থাকেন, সোনিয়া ভারতবাসীকে জনবান্ধব পঞ্চায়েত আইন ও খাদ্যনিরাপত্তা আইন দিয়েছেন। এ কথা কারও অবিদিত নয় যে দলীয় কাজ করার চেয়ে সরকারি কাজেই তখন সোনিয়া গান্ধীর সময় কেটেছে বেশি।

মনমোহন দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে প্রথম যে কথাটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, তা হলো যখনই রাহুল গান্ধী ভারতের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত বোধ করবেন, তখনই তিনি খুশিমনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ত্যাগ করবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী না হয়ে এতটাই স্পষ্টভাবে কর্মচারীর ভূমিকা পালন করছিলেন যে একটি সংবাদ সম্মেলনে যখন রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের সামনে ইউপিএ সরকারের পাস করা একটি অধ্যাদেশ ছিঁড়ে ফেলেন, তখন তা কাউকেই অবাক করেনি। আমার নিজের ধারণা, মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সে সময় সঠিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হলে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে জয়ী হওয়া আরও কঠিন হতো।

আমার অভিজ্ঞতায় বলে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাঁরা দুই মেয়াদের বেশি জয়ী হন, তাঁরা স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করতে শুরু করেন। তাই আমি চাই কংগ্রেস পার্টি দরবারিদের ক্লাব না হয়ে আবার একটি প্রকৃত রাজনৈতিক দল হয়ে উঠুক। আমি বিশ্বাস করি না, যে দলটি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই দলটি নির্বাচিত সভাপতির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে একটি পরিবারকেন্দ্রিক ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’তে পরিণত হবে।

মনমোহনের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সময় দিল্লির সরকারি বলয়ে এ কথা কারও কাছে অবিদিত ছিল না যে তিনি তাঁর বসের সঙ্গে পরামর্শ না করে কোনো গুরুতর সিদ্ধান্ত নিতে বা নীতি ঠিক করতে পারতেন না। আমি একাধিকবার বলেছি, আমি বিশ্বাস করি, পি ভি নরসিমা রাওয়ের অধীনে অর্থমন্ত্রী থাকাকালে মনমোহন যে সংস্কারগুলো নিয়ে এসেছিলেন, তা ভারতকে বদলে দিয়েছে। অনেকটা সে কারণে আমি মনমোহন সিংয়ের একজন অবিচল ভক্ত।

তবে সোনিয়া গান্ধীর বিষয়ে আমার অনুভূতি তেমনটা নয়। কারণ, আমি সেই রাজনৈতিক নেতাদের অপছন্দ করি, যাঁরা জবাবদিহি ছাড়াই বিপুল ক্ষমতার মালিক হয়ে বসে থাকেন। আমি বিশ্বাস করি, ২০০৪ সালে কংগ্রেস পার্টির জয়ের পর তিনি তাঁর একান্ত নিজস্ব বলয়ের মন্ত্রণাদাতাদের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে রাজি না হয়ে একটি অস্বাস্থ্যকর নজির স্থাপন করেছিলেন।

‘শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে নরেন্দ্র মোদির প্রশংসিত হওয়ার একটি বড় কারণ হলো ভারতীয়রা তাঁকে নিয়ে এই ভেবে গর্ব করতে পারে যে মোদি ভারতের জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন; ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতির কাছে নয়। যাঁরা বলেন, তিনি আরএসএস প্রধানের কাছে জবাবদিহি করেন, তাঁরা ভুল বলেন। কারণ, তিনি দু–দুবার দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনি এতটাই জনপ্রিয় নেতা যে তাঁকে নির্বাচনে জেতার জন্য আরএসএসের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। তিনি উচ্চ পদে এমন লোকদের নিয়োগ করেন, যাঁরা আরএসএস ধারণায় নিয়ে শিক্ষা লাভ করেছেন, তার কারণ তিনিও একই ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের’ ছাত্র। কংগ্রেস পার্টিও আলাদা কিছু নয়। তারাও যে কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেছিল, তাঁরাও নেহরুপন্থী সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।

আমার অভিজ্ঞতায় বলে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাঁরা দুই মেয়াদের বেশি জয়ী হন, তাঁরা স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করতে শুরু করেন। তাই আমি চাই কংগ্রেস পার্টি দরবারিদের ক্লাব না হয়ে আবার একটি প্রকৃত রাজনৈতিক দল হয়ে উঠুক। আমি বিশ্বাস করি না, যে দলটি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই দলটি নির্বাচিত সভাপতির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে একটি পরিবারকেন্দ্রিক ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’তে পরিণত হবে।

মল্লিকার্জুন খাড়গেকে গান্ধী পরিবারের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দেখা হয়েছিল বলেই তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন—এমনটা না ভাবার কোনো কারণ নেই। দলের সভাপতি হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তৃতায়, তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সোনিয়া গান্ধী তাঁর ‘পথনির্দেশক আলো’ হয়ে থাকবেন।

গত সপ্তাহে কংগ্রেস পার্টির কয়েকজন নেতা ও অন্ধ সমর্থকদের সঙ্গে আমার বিবাদ থেকে যে আরেকটি বিষয় উদ্‌ঘাটিত হয়েছে, তা হলো গত আট বছরে দুটি সাধারণ নির্বাচন এবং অন্য নির্বাচনের প্রায় প্রতিটিতে হেরেও কংগ্রেস নেতাদের অহংকার কমেনি। তাঁরা অবিরতভাবে বিশ্বাস করে যাচ্ছেন, ভারত শাসন করা নেহরু পরিবারের জন্মগত অধিকার এবং মোদি হচ্ছেন একজন দখলদার লোক, যাঁকে অচিরেই উচ্ছেদ করা হবে।

আমার ধারণা, কংগ্রেসের নেতা–সমর্থকেরা যত বেশি এ আচরণ করবেন, কংগ্রেসের পক্ষে তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার তত কঠিন হবে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • তাভলিন সিং ভারতীয় লেখক ও রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার