ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি যেন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাত্র এক সপ্তাহের চিত্র লক্ষ করা যাক। পোল্যান্ড নতুন করে যুদ্ধের সতর্কবার্তা জারি করেছে। জার্মানি চালিয়েছে সামরিক মহড়া ও জাতীয় মহড়া। বাল্টিক অঞ্চলজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সামরিক অনুশীলন। আর হামলা হলে কীভাবে রাজধানী ভিলনিয়াসের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হবে—লিথুয়ানিয়া প্রকাশ করেছে তার বিশদ পরিকল্পনা।
এদিকে ফিনল্যান্ড সরকার তো যুদ্ধের প্রচ্ছন্ন শঙ্কায় পুরোপুরি মাতোয়ারা। তারা নাগরিকদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধ যে অচলাবস্থাই নিয়ে আসুক না কেন, মানসিকভাবে ও বাস্তবে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্রাসাদে দলীয় নেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একত্র করেন। সেখানে ফরাসি গোয়েন্দাপ্রধানরা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ‘দ্রুত অবনতির’ একটি চিত্র তাঁদের সামনে তুলে ধরেন।
অন্যদিকে ন্যাটো এখন কোনো গোপনীয়তা না রেখেই রাশিয়ার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড, সাইবার হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ড্রোন হামলার বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করছে। তবে ইউরোপের সরকারগুলোর এই ‘যুদ্ধ উন্মাদনা’ মহাদেশটির সাধারণ শ্রমিক ও নাগরিকদের খুব একটা প্রভাবিত করতে পারছে না।
কোম্পানির বেতন ও কর্মপরিবেশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গত ১ জুলাই স্পেনে এয়ারবাসের হাজার হাজার শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক দেন। ইউজিটি এবং সিজিটি ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শ্রমিকদের কাজের এই বিরতি বা কর্মবিরতির কারণে সামরিক ও বাণিজ্যিক উৎপাদন অনেকটাই ধীর হয়ে পড়েছে। ফলে কোম্পানির পক্ষে তাদের পূর্বনির্ধারিত সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। স্পেনে এয়ারবাসের আটটি কারখানায় সামরিক পরিবহন বিমান, বাণিজ্যিক বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং কৃত্রিম উপগ্রহের কারখানা রয়েছে।
যন্ত্রাংশ ও সরবরাহব্যবস্থার ঘাটতি এতটাই প্রকট যে এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় এয়ারবাসের যন্ত্রাংশ পৌঁছে দিতে ইউক্রেনীয় বিশাল আকারের ‘আন্তনভ এন-১২৪’ কার্গো বিমান ভাড়া করতে হচ্ছে—যাতে কোনোমতে তাদের উৎপাদন সচল রাখা যায়।
এয়ার ডেটা নিউজ জানিয়েছে যে শ্রমিকদের এই আন্দোলন ‘মূল সামরিক বিমান কর্মসূচিগুলোকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে’। মাদ্রিদের কাছে ইউরোফাইটার কারখানা এবং সেভিলের সামরিক পরিবহন বিমান কারখানা—দুটি কেন্দ্রই এই ধর্মঘটে থমকে গেছে।
ইউরোপীয় রাজনীতির আসল লড়াইটা এখন ঠিক এই জায়গাতেই জমে উঠেছে। একদিকে যুদ্ধে উন্মাদের মতো মেতে থাকা মূলধারার একদল রাজনীতিবিদ, আর অন্যদিকে লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিক ও তরুণ প্রজন্ম—যাঁরা তাঁদের রক্ত পানি করা মজুরি, চাকরি আর জীবনযাত্রার মান বিসর্জন দিয়ে কোনো যুদ্ধের খরচ জোগাতে একেবারেই রাজি নন।
স্প্যানিশ ইউনিয়নগুলোর মতে, ২৫ আগস্টের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে প্রায় ৯০ শতাংশ যোগ্য শ্রমিক অংশ নিয়েছিলেন। কারখানার অ্যাসেম্বলিতে শ্রমিকেরা ভোটাভুটির মাধ্যমে কোম্পানির অন্যায্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরই মূলত এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।
ফরাসি ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, স্পেনে এয়ারবাসের প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিকের মধ্যে এই তিন ইউনিয়নের অধীনেই রয়েছেন প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক। শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি, আগের মতো দূর থেকে কাজ করার সুবিধা বহাল রাখা এবং অসুস্থতাজনিত ছুটির সুবিধা নিশ্চিত করা।
শিল্পমন্ত্রী জর্দি হেরেউর হস্তক্ষেপ এবং এয়ারবাস কর্তৃপক্ষের কিছু নমনীয় শর্ত মেনে নেওয়ার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর শ্রমিকেরা সাময়িকভাবে ধর্মঘট স্থগিত করেন। তবে তাঁদের আন্দোলন থেমে থাকেনি। এর ঠিক দুদিন পর, নিজেদের দাবি আদায়ে স্পেনের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে প্রায় ৮ হাজার এয়ারবাস শ্রমিক মাদ্রিদের রাজপথে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেন।
অবশেষে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ৭৭ শতাংশ শ্রমিক কোম্পানির একটি সংশোধিত ও উন্নত প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেন। দীর্ঘ কয়েক মাসের আন্দোলনের চাপে পড়ে কোম্পানিটি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি, হ্রাস পাওয়া ক্রয়ক্ষমতার ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং রিমোট ওয়ার্কের অধিকার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
এয়ারবাসের এই শ্রমিক আন্দোলন প্রমাণ করে যে ইউরোপের দেশগুলো যে অস্ত্র পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপর ভর করে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করছে—সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিল্পগুলোর ওপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ঠিক কতটা শক্তিশালী।
একই সময়ে স্কটল্যান্ডে নতুন শহরতলি ট্রেনের বহর তৈরির জন্য ঠিকাদারদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান সিএএফকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে স্কটিশ রেলওয়ে ইউনিয়ন আরএমটি, ট্রেন চালকদের সংগঠন ‘আসলেফ’ এবং পেশাজীবীদের ইউনিয়ন ‘টিএসএসএ’।
ইসরায়েলি দখলদারত্বের সহযোগী হিসেবে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তৈরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় এই সিএএফ কোম্পানিটির নাম রয়েছে। জেরুজালেমের লাইট রেল পরিচালনা এবং বেআইনিভাবে দখল করা ভূখণ্ডে রেললাইন সম্প্রসারণের কাজে সহায়তার দায়ে তাদের এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
আসলেফ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তাদের সদস্যরা কোনো সিএএফ নির্মিত ট্রেন চালাবেন না। একই সুর মিলিয়ে টিএসএসএর সাধারণ সম্পাদক মারিয়াম এসলামদুস্ত স্কটিশ সরকারকে বিষয়টি ‘পুনর্বিবেচনা’ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের সম্মেলনে প্রতিনিধিরা টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সামরিক বাজেট বা অস্ত্র খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছেন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রস্তাবটি আরও বিপুল সমর্থন লাভ করে পাস হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এর আগে জিএমবি ও ইউনাইট ইউনিয়নের প্রভাবে সামরিক বাজেট বাড়ানোর পক্ষে টিইউসির যে অবস্থান ছিল, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে তা পুরোপুরি উল্টে গেছে।
প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে আরএমটির সাবেক সভাপতি এবং ‘স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন’-এর জাতীয় কর্মকর্তা অ্যালেক্স গর্ডন বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন চাকরির অধিকার, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং ভবিষ্যতের নতুন শিল্পের প্রতি বিনিয়োগ সুনিশ্চিত করার আন্দোলন। যে ভবিষ্যৎ আমাদের তরুণ শ্রমিকেরা প্রত্যাশা করেন।’
অ্যালেক্স গর্ডন আরও যোগ করেন, ‘সেই শিল্প খাতগুলো কিন্তু সামরিক খাত নয়। সামরিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের দক্ষতা অত্যন্ত মূল্যবান এবং সেই দক্ষতাকে বেসামরিক ও নাগরিক সেবামূলক পণ্য উৎপাদনে কাজে লাগানো উচিত।’
গাজা উপত্যকায় চলা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে অন্তত ছয়টি দেশের ডকশ্রমিক ইউনিয়ন ৩০ অক্টোবর একটি আন্তর্জাতিক ধর্মঘট ও প্রতিবাদ দিবসের ডাক দিয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ২০টির বেশি বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ করে ইসরায়েলগামী অস্ত্রের চালান আটকে দিয়েছিলেন শ্রমিকেরা। সেই সুসংগঠিত আন্দোলনের পথ ধরেই এবারও এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বলেছে, ‘আমরা এই যুদ্ধ অর্থনীতি, সরকারের অস্ত্র পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিকায়নের সব প্রকল্পকে ‘না’ বলছি। জনগণের অর্থ বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো যুদ্ধের পেছনে নয়, বরং সমাজের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা উচিত।’
এদিকে ইউরোপের নতুন প্রজন্ম—অন্তত জার্মানির তরুণদের কথা ধরলে—কোনো নতুন ইউরোপীয় যুদ্ধের বিষয়ে একেবারেই উৎসাহিত নয়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে নতুন বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দেশজুড়ে ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসে ৪৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৮ বছর বয়সী তরুণদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নোটিশ পাঠানো শুরু করার পর ‘স্কুল স্ট্রাইক এগেইনস্ট কনস্ক্রিপশন’ নামক আন্দোলনের ব্যানারে ১০০টির বেশি শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভ। যদিও সেনা যোগদান এখনো ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে, তবে এই স্বাস্থ্য পরীক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ইউরোপীয় রাজনীতির আসল লড়াইটা এখন ঠিক এই জায়গাতেই জমে উঠেছে। একদিকে যুদ্ধে উন্মাদের মতো মেতে থাকা মূলধারার একদল রাজনীতিবিদ, আর অন্যদিকে লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিক ও তরুণ প্রজন্ম—যাঁরা তাঁদের রক্ত পানি করা মজুরি, চাকরি আর জীবনযাত্রার মান বিসর্জন দিয়ে কোনো যুদ্ধের খরচ জোগাতে একেবারেই রাজি নন।
এই লড়াইয়ের স্রেফ সূচনা হলো মাত্র।
জন রিস এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো।
মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।