মাকাল ওয়েবসাইট আর কত?

প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবর

‘মাকাল ফল’ কখনো দেখেননি হয়তো। না দেখলেও আপনি চাইলে কাগজ ডট এআই দেখতে পারেন। দুটো আক্ষরিক অর্থে এক না হলেও ব্যবহারিকভাবে একই। এটাকে সে হিসবে ‘মাকাল ওয়েবসাইট’ বলা যেতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল মিলে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই এআই চালু করেছে। সেদিন প্রকাশিত প্রথম আলো অনলাইনের খবর ‘নতুন বাংলা ফন্ট জুলাই ও এআই প্ল্যাটফর্ম চালু করল আইসিটি বিভাগ’-এ দাবি করা হয়েছে, ‘গত দুই সপ্তাহে চার হাজার মানুষ পরীক্ষামূলকভাবে কাগজ ডট এআই ব্যবহার করেছেন এবং ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে।’ এই ভালো ফলাফল কে পেয়েছেন, কীভাবে পেয়েছেন, আমি জানি না।

গত ২০ ডিসেম্বর আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এই এআইতে যাই। লগইন না করে কিছু করা যায় না এতে, ফলে লগইন করতে বাধ্য হই। অরুণ সোম অনূদিত দস্তয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’ বইয়ের একটা পৃষ্ঠা সেখানে আপলোড করি, ওসিআর অপশনে। কাগজ ডট এআই একাধিকবার চেষ্টা করেও ওসিআর বা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন–প্রক্রিয়া প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ ছবি থেকে টেক্সট বের করতে এটি শতভাগ ব্যর্থ হয়। অথচ জেমিনাই এ কাজ বেশ ভালোভাবেই পারে।

এখানে প্রশ্ন দুটি। একটা হলো, যে এআই ব্যর্থ হচ্ছে, কাজ করছে না, সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত করার মানে কী? একটা সফটওয়্যার বা ওয়েবসাইটের টেস্টিং হওয়ার কথা চালু করার আগে এবং সফটওয়্যার বা অ্যাপের জন্য টেস্টিং খুব, খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কাজ না করে কেন ওয়েবসাইট চালু করা হলো, ইতিমধ্যে কতজন আদৌ এটি ব্যবহারে কোনো ফল পেয়েছেন, জানার উপায় নেই। দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে কাজ জেমিনাই এত ভালোভাবে করছে, সেটার চেয়ে ভালো জিনিস বানাতে না পারলে এই জিনিস বানানোর অর্থ কী?

এই এআইয়ের পেছনে কত খরচ হয়েছে, জানি না। আমি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে পত্রিকা পর্যন্ত সবখানে খুঁজেছি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খবর ছাপালেও কোনো পত্রিকা বিচিত্র কোনো কারণে জিজ্ঞাসা করেনি, এই মাকাল ওয়েবসাইট বা এআই প্রকল্পের ব্যয় কত?

২.

সদ্য আইসিটি বিভাগের সভাকক্ষে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব উদ্বোধন করেছেন ‘ফ্রিল্যান্সার ডটগভ ডটবিডি’। উদ্বোধনের পরপরই এতে বিভিন্ন জেলার উপজেলাগুলোর উদ্ভট সব নাম দেখা গেছে।

প্রথম আলো অনলাইনে ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘ভেড়ামারার নাম “শিপ”, পত্নীতলার “স্পাউস”; সরকারি ওয়েবসাইটে একি কাণ্ড!’ শিরোনামের সংবাদে জানা যাচ্ছে, সেখানে নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার নাম দেখাচ্ছে ‘গোল্ডেন’। আবার কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার নাম দেখাচ্ছে ‘শিপ’। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সদ্য উদ্বোধন করা ওয়েবসাইট ঘুরে এমন অন্তত ২১টি উপজেলার নাম উল্টাপাল্টা পাওয়া গেছে। সরকারি ওয়েবসাইটে এমন কাণ্ড দেখে হতবাক ফ্রিল্যান্সাররা।

এই ওয়েবসাইটে ফ্রিল্যান্সার আইডি পেতে আপলোড করতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্র, নিজের ছবি এবং আয়ের প্রমাণ। এসব সংবেদনশীল কাগজ কি এ রকম একটি ওয়েবসাইটে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত? সেটা বুঝতে চলুন যাওয়া যাক এনইআইআরের ওয়েবসাইটে।

৩.

এনইআইআর বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রারে গিয়ে মানুষ যে নিজের নামে ৩০-৪০টি করে মুঠোফোন নিবন্ধিত বলে দেখেছেন, সে কথা সবার জানা। কিন্তু এই ওয়েবসাইট প্রথম যখন উন্মুক্ত করা হয়, তখন যে কেউ যেকোনো এনআইডি নম্বর (র‍্যান্ডম ১৩টি সংখ্যা) ইনপুট দিয়েই দেখতে পাচ্ছিলেন সেই মানুষের তথ্য। এতে ছিল না কোনো সিকিউরিটি, এপিআই ছিল একদম উন্মুক্ত। এ নিয়ে ফেসবুকে একাধিক মানুষ পোস্ট করেছেন জানুয়ারির শুরুর দিকে।

এ ধরনের সিকিউরিটির পেছনের বিষয়টা বোঝা খুব সহজ। আপনি কোনো ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করলে ওয়েবসাইট আপনাকে একটি ‘টিকিট’ দেবে, যেটাকে কম্পিউটারবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘টোকেন’। এই টোকেন বা টিকিট আপনার ব্রাউজারের ‘কুকিজ’-এ জমা থাকবে। পরে যখন আপনি সেই ওয়েবসাইটে যাবেন, তখন আবার লগইন করতে হবে না, টোকেন দেখেই ওয়েবসাইট জানবে আপনি কে। এই যে টিকিট, এতে আপনার নাম বা ই-মেইলের পাশাপাশি আরও কিছু জিনিস থাকে। আপনার ‘রোল’ কি অ্যাডমিন, নাকি আপনি সাধারণ ব্যবহারকারী, তা এতে বলা থাকে। অ্যাডমিন সব জিনিস দেখতে পান, কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারী শুধু নিজের জিনিসই দেখবেন।

এ ক্ষেত্রে ধরুন আমি নিজের এনআইডি নম্বর না দিয়ে অন্য কারও নম্বর দিলাম, বা অন্য কারও মুঠোফোন নম্বর দিয়ে তথ্য দেখতে চাইলাম, ওয়েবসাইটের কাজ হলো চেক করে দেখা, যে নম্বর আমি ইনপুট দিয়েছি, সেটা সত্যিই আমার নম্বর কি না (ডেটাবেজে সংরক্ষিত আমার তথ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেই সেটা বোঝা যায়)। যদি সত্যিই সেটা আমার নম্বর না হয়, তাহলে ওয়েবসাইট আমাকে সেই তথ্য দেখতে দেবে না।

এই নিরাপত্তা বিভিন্ন স্তরে নিশ্চিত করা যায়। একদম বেসিক স্তরে ‘টোকেন’ তৈরি ও যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তির নাম জেডব্লিউটি (JWT)। বিভিন্ন মানুষ ফেসবুকে পোস্ট করার পর ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছেন, ওয়েবসাইটে জেডব্লিউটিসহ নিরাপত্তাব্যবস্থা সংযুক্ত করা হচ্ছে।

উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এ রকম কারও হাতে কি নিজেদের সংবেদনশীল তথ্য আদৌ তুলে দেওয়া উচিত ফ্রিল্যান্সারদের? আরও বড় কথা হলো, বাংলাদেশ সরকারের একটা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বানানো ওয়েবসাইটে বারবার এ রকম নিরাপত্তা–ব্যর্থতা, অকেজো প্রযুক্তি কেন দেখা যাচ্ছে?

সংশ্লিষ্ট আরও অনেক প্রশ্ন আছে। যেমন এসব প্রকল্পে লোক নেওয়া হয়েছে কিসের ভিত্তিতে? যে দেশে এত ফ্রিল্যান্সার আছেন, এত ভালো ভালো সফটওয়্যার ও ওয়েবসাইট নির্মাতা আছেন, সেখানে এ রকম অদক্ষ মানুষদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কেন? এসব প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে কত এবং কীভাবে? যেহেতু চালু করার পরও এত সমস্যা, তাহলে ব্যয়গুলো হচ্ছে কোন খাতে? এই টাকা যাচ্ছে কোথায়? যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা কী করছেন আসলে?

এ রকম ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি সাধারণ সৌজন্যই শুধু নয়, জরুরিও। কিন্তু ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দূরে থাকুক, ন্যূনতম জবাবদিহির ধারে-কাছে দিয়েও প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাননি।

৪.

শেষের আগে বলা প্রয়োজন, নাগরিক সেবা, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সেবা থেকে শুরু করে ফোন–সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো ঠেকানোর জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষণীয়। কেউ কেউ তাই বলতেই পারেন, কাজ করা হচ্ছে, সেটার অন্তত প্রশংসা করুন। দুঃখজনক হচ্ছে এখানে আসলে প্রশংসা করার উপায় নেই। চিন্তা করুন তো, আপনি একজন ওয়েব ডেভেলপার কিংবা ওয়েব বা এআই ইঞ্জিনিয়ার। আপনার (বেসরকারি) প্রতিষ্ঠানে এ রকম কাজ যদি কেউ করতেন বা কোনো দলের নেতৃত্বে এ ধরনের কাজ করা হতো, তাঁর বা তাঁদের অবস্থাটা কেমন হতো?

শুধু ভালো উদ্যোগ নেওয়া যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে এটা যেহেতু তাঁদের দায়িত্ব; এখানে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কেউ নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো করে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন না। তার ওপর এসব সেবার সঙ্গে যুক্ত দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়।

ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব তাঁর ফেসবুকে অন্য এক প্রসঙ্গে লিখেছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কাজ দেখে তিনি খুবই হতাশ। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই হতাশ। বিদেশিদের ধরে এনে এই দেশে যা করা হয়েছে, তা বাইরে থেকে চকচকে হলেও ভেতরে ফাঁপা।’ আলোচ্য প্রসঙ্গে বলতে হয়, আমরা এখনো হতাশ। কারণ, এগুলো বাইরে থেকে চকচকে হলেও এখনো ভেতরে ফাঁপা।

  • উচ্ছ্বাস তৌসিফ বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক লেখক ও অনুবাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব