আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ
যুদ্ধ কেন লাগে, কারা কলকাঠি নাড়ে?
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সাড়ে ৪ বছর পার হলো। এরই মধ্যে সম্প্রতি দেখা গেল ইরান যুদ্ধ এবং এর আগে গাজায় ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধও দেখল বিশ্ব। এইসব যুদ্ধের পেছনে অস্ত্র ব্যবসা ও জ্বালানি বাণিজ্য কতটা ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ৫৪ মাস পার হলো সম্প্রতি। একই সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ও ছয় মাস পেরিয়েছে। এর মাঝের সময়ে বহু দেনদরবার হলো; থামে থামে মনে হলেও যুদ্ধ চলছেই।
উভয় যুদ্ধ ফেব্রুয়ারিতে শুরু। আবহাওয়াবিদ্যায় ফেব্রুয়ারিকে বসন্ত আসার আগের ‘শেষ কষ্টকর মাস’ বলা হয়। চার্লস ডিকেন্স অবশ্য মোলায়েম করে বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারি জানায়, উষ্ণ দিনগুলো বেশি দূরে নেই। তবে ফেব্রুয়ারি নিজেও উষ্ণ হতে পারে। ২০২২–এর ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৬–এর ফেব্রুয়ারি বিশ্বের অনেক সংস্থার কোষাগারে অচিন্তনীয় উষ্ণতার সূচনা ঘটিয়েছে।
আবুধাবির এজ গ্রুপের কথাই ধরা যাক। ২০১৯–এ প্রতিষ্ঠার পর নিজ দেশ ও আশপাশের অঞ্চলে সীমিত পরিসরে অস্ত্রের ব্যবসা করত তারা। কিন্তু বিশ্বের দুই প্রান্তের সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধে ‘এজ’ অস্ত্রপাতির বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে তারা পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে। অর্ডার পেয়েছে আরও ২৫ বিলিয়ন ডলারের।
চাহিদামতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের উদ্ভাবন ও জোগানে হিমশিম খাচ্ছে এখন এজ। তাদের জন্য এ মুহূর্তে সুবিধার দিক হলো, উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারছে। যেসব অস্ত্রের ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর অর্ডার আসছে তাৎক্ষণিক। অস্ত্রের গায়ে ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত’ সিল থাকা মানে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা।
উপসাগরীয় প্রতিটি দেশ আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় অঙ্কে বাজেট বাড়াচ্ছে। এ বছর কেবল আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আট বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। অস্ত্র উৎপাদক কোম্পানিগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য এখন সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো।
যুদ্ধে সব দেশ যে লকহিড মার্টিন বা আরটিএক্সের থার্ড সিস্টেম বা প্যাট্রিয়ট সিস্টেম কিনছে, তা নয়। মাঝারি ও ছোট সামর্থ্যের দেশগুলো আকাশ প্রতিরক্ষায় সস্তা ড্রোন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে। এজ এ রকম ড্রোনের কারবারে সফলতা পেয়েছে। তার চোখে এখন বিশ্বের প্রধান ১০ অস্ত্র উৎপাদক কোম্পানির তালিকায় নিজেদের দেখার বাসনা। গত জুনে এজ প্যারিসে ইউরোপীয় অফিস খুলেছে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের উসকানিদাতাদের কাছে এজের মতো কোম্পানিগুলোর নীরব কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মধ্যে পরবর্তী বিশ্ব–উত্তেজনার লক্ষ্যস্থল নিয়ে আঁচ-অনুমান চলছে এবং তাতে দক্ষিণ এশিয়ার নামও আসছে। মক্কা চুক্তি হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক সামরিক সাহিত্যে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। এ অঞ্চলের একাধিক দেশের নীতিনির্ধারকদের তাতে বেশ উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দিতে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বে অস্ত্র কেনাবেচার খবরের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত রাখে স্টকহোমভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)। এ বছরের ৯ মার্চ প্রকাশিত তাদের হিসাবে চলতি দশকের প্রথম চার বছরে আগের দশকের শেষ চার বছর থেকে বিভিন্ন দেশের অস্ত্র সংগ্রহ ১০ শতাংশ বেড়েছে।
এর মধ্যে ২০২১ থেকে পরবর্তী চার বছরে বিশ্বে অস্ত্র হস্তান্তরের ৪২ শতাংশ হিস্যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। আগের চার বছরে যা ছিল ৩৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলমান থাকায় এ রকম হিস্যা আরও বাড়বে তাদের।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা জিইয়ে রাখতে ইসরায়েল ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের বড় এক সহযোগী। যুদ্ধে তেল আবিবের আগ্রহের জায়গাও কেবল ধর্মীয় বা জাতিগত নয়, যেমনটি মনে করা হয়। সিপ্রির হিসাবে গত এক দশকে অস্ত্র ব্যবসার ‘টপ টেনে’ ইসরায়েল যুক্তরাজ্যের ওপরে উঠে গেছে।
এসব তথ্য থেকে যুদ্ধের ফল এবং যুদ্ধে কারা লাভবান হচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। ইউক্রেনে উত্তেজনা তৈরি করে ২০২১-২৫–এ ইউরোপের দেশগুলোকে বিপুল অস্ত্র কেনানো হয়েছে। ২০২১–এর আগের চার বছরের তুলনায় পরের চার বছরে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রপ্তানি ২১৭ শতাংশ বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বড় লক্ষ্য ছিল ইউরোপে ভীতি তৈরি। সেটা সফল হয়েছে। জেলেনস্কির মতো ভালো বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র বহু দশকে পায়নি।
বিশ্বের অন্যত্রও জেলেনস্কিদের খোঁজ চলতে থাকবে সামনের দিনগুলোতে। ইতিমধ্যে ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মধ্যে পরবর্তী বিশ্ব–উত্তেজনার লক্ষ্যস্থল নিয়ে আঁচ-অনুমান চলছে এবং তাতে দক্ষিণ এশিয়ার নামও আসছে। মক্কা চুক্তি হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক সামরিক সাহিত্যে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। এ অঞ্চলের একাধিক দেশের নীতিনির্ধারকদের তাতে বেশ উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দিতে দেখা যাচ্ছে।
পাকিস্তান-ভারত বহুকাল ১০ প্রধান অস্ত্র ক্রেতার তালিকায় আছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র উৎপাদকদের কাছে এই দুই দেশ প্রাচুর্যের বড় এক ভবিষ্যৎ প্রতীক। ফলে এই দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনের শান্তি আলোচনা সফল হতে না দেওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বরং তাদের দিয়ে আশপাশের অঞ্চলেও কীভাবে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করা যায়, বহু পক্ষের সেই চেষ্টা থাকবে। সেই চেষ্টায় অনেক স্থানীয় চিন্তক ও রাজনীতিবিদকেও শরিক হতে দেখা যাবে।
কেবল অস্ত্র উৎপাদকেরা নয়, যুদ্ধ থেকে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোও বিপুল লাভ করেছে সম্প্রতি। হরমুজ প্রণালির সমস্যায় কোনো কোনো কোম্পানি অসুবিধায় পড়েছে বটে, কিন্তু সবাই নয়। সবার ব্যবসা ওই প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নয়।
গত দুই মাসের প্রতিবেদনগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানিবাজারের বড় শক্তি হিসেবে শেভরন, শেল, বিপি, কনকোফিলিপ্স, এক্সনমবিল, টোটালএনার্জি পুরোনো মজুত বিক্রি থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হলো। ২০২৬–এর প্রথম দুই ত্রৈমাসিকে এসব কোম্পানির প্রতিটির মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কোম্পানি এক্সনমবিল জানিয়েছে, এ বছর তাদের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে মুনাফা (১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) প্রথম ত্রৈমাসিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এটা গত চার বছরে যেকোনো ত্রৈমাসিকের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় তেল কোম্পানি শেভরনেরও রাজস্ব বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। তাদের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের আয় ছিল (১২ বিলিয়ন ডলার) গত ছয় বছরের মধ্যে বেশি।
ইউরোপের বেলায় ছয়টি বড় তেল কোম্পানির প্রথম ত্রৈমাসিকে সম্মিলিত মুনাফা ২২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। (পিবিএস নিউজ, ৩১ জুলাই)। গত ৩১ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমসে একটা শিরোনাম ছিল: ইরান ওয়্যার ড্রাইভস অয়েল প্রফিটস টু হায়েস্ট লেভেলস ইন ইয়ারস।
২০২৫–এর দ্বিতীয় প্রান্তিকে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৬৭ ডলার। ২০২৬–এর দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেটা অন্তত ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার বাড়ে। মাঝের সময়ে ইরানে আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা। এ রকম ‘রিপাবলিকান নীতিনির্ধারক’দের জন্য ‘অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ’ গত নির্বাচনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল বলে দাবি করেছে ওই দেশেরই পত্রিকা ফোর্বস এ বছরের ৫ জানুয়ারি তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
অস্ত্র ও তেল খাতের এসব বিবরণ জানাচ্ছে, যুদ্ধ কেন লাগে, কারা কলকাঠি নাড়ে এবং কেন সেটা সহজে বন্ধ হয় না। কেন শক্তিধর দেশগুলো জাতিসংঘ বা এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো অথর্ব ও অকার্যকর করেছে, তারও একটা ব্যাখ্যা ওপরের কাহিনি থেকে অনুমান করা কঠিন নয়। কেন প্রভাবশালী দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের প্রতি তেল ও আর্মস করপোরেটদের ব্যাপক সমর্থন, তারও ইঙ্গিত দেয় যুদ্ধ-সিদ্ধান্তের ঘটনাবলি।
অস্ত্র উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা মুখিয়ে থাকে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য। সেটা করতে হলে আবার প্রতিটি দেশে ঘৃণা-বিদ্বেষের চাষাবাদ বাড়াতে হয়। হতে পারে সেটা জাতিগত বা ধর্মীয় ঘৃণা।
ঘৃণার প্রকোপ বাড়িয়েই মানুষের মধ্যে কল্পিত শত্রু এবং নিরাপত্তাহীনতার হরেক ভীতি বাড়িয়ে তুলতে হয়। এ রকম কাজে নিযুক্ত অগণিত ‘বিশেষজ্ঞ’ নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে লিখে ও বলে যাচ্ছে। তাদের এ পরিশ্রম ধীরে ধীরে হলেও বেশ কাজ করে। তখন ‘জনসম্মতি’র আলোকে রাজনীতিবিদেরা দারিদ্র্য, অনুন্নয়ন, অপুষ্টির মধ্যেও মিসাইল, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান কেনাকে অগ্রাধিকার দেয়।
কৌতুককর হলো, এ রকম সংবাদগুলো ওই সব দেশের দরিদ্র মানুষেরা তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সময় বিস্তারিত পড়া বা শোনার সুযোগ পায় না। লোডশেডিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে, রুটিরুজির বাড়তি দৌড়াদৌড়ির ভেতর ‘নব অর্জনের’ কথা তারা একটু একটু করে জানতে পারে এবং আত্মশ্লাঘায় ভোগে! দারিদ্র্যকে পরাস্ত করার বদলে অন্য দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয় তারা তখন!
● আলতাফ পারভেজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব