ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিকবাদ সেখানে হ্রাস পাচ্ছে এবং উগ্র ইভাঞ্জেলিকালিজম সে জায়গা দখল করছে। এই উগ্র চেতনার নাগরিকেরা শহুরে এলাকা থেকে তাদের মতাদর্শ গ্রামাঞ্চলে সঞ্চারিত করেছে। প্রতিটি সমাজের মতো ব্রাজিলেও এখন লিঙ্গ ও জাতিগত পরিচয়ের ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ হচ্ছে। ইতিবাচক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া অভিজাতদের মধ্যে স্পষ্ট।

লুলা বৈশ্বিক বিদেশনীতির একজন দৃঢ় ও মুক্ত কণ্ঠস্বর এবং তিনি বিশ্বকে ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার মোকাবিলায় সামনের সারিতে দাঁড়াবেন। সেই দিক থেকে তাঁর বিজয় রাজনৈতিক সংহতি, বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ়তারও বিজয়। 

মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে লুলাই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে পারেন এবং সমাজের প্রান্তিক অংশে একটি বিশদ পরিসরের মৈত্রী জোট বাঁধতে পারেন। তবে তার জন্য ডানপন্থীদের গভীর ঐক্যের মুখে বামপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের উপদলকে এক ছাতার তলায় আনা সমান জরুরি।

লুলাকে জনতুষ্টিবাদী নেতা হিসেবে বর্ণনা করা ভুল হবে। তিনি একজন ধ্রুপদি রাজনীতিবিদ ও একজন সেরা কল্পনাশক্তিসম্পন্ন সামাজিক মধ্যস্থতাকারী। তাঁর বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতালব্ধ জীবন তাঁর প্রতি সবাইকে সহানুভূতিশীল করে তোলে। একটি গাড়ি কারখানায় একজন যন্ত্রকর্মী হিসেবে তিনি পেশাজীবন শুরু করেছিলেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও শ্রমিক ইউনিয়নের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। সেই সময়ই তিনি স্বৈরাচারী শাসনের নির্যাতনকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। ওই সময়ই তিনি ইউনিয়নগুলোকে একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন।

জনতুষ্টিবাদীদের বিপরীতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক জোট গড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে মজার তথ্য হলো, তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে কার্যত প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষ বামপন্থী নাকি ডানপন্থী তা দিয়ে তিনি তাঁকে বিচার করেন না। তিনি ওই ব্যক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণটিকে ‘বন্ধু বানানো’র পক্ষে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে এই গ্রহের সবচেয়ে পছন্দের রাজনীতিবিদ করে তুলেছে।

তবে বাস্তবতা হলো বলসোনারো পরাজিত হয়েছেন বটে, কিন্তু তিনি যে সামাজিক শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই শক্তিগুলোকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। সেখানকার ডানপন্থীদের সাদা চোখে শুধু ‘ডান’ হিসেবে দেখলে হবে না। মনে রাখতে হবে, ব্রাজিলে ডানপন্থীরা বেশ কয়েকটি অক্ষের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। সেখানে শুধু ধর্মের একক কোনো গোষ্ঠীর ভিত্তিতে দক্ষিণপন্থীরা গোষ্ঠীবদ্ধ হচ্ছে না। কারণ, ধর্মের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি আছে।

ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিকবাদ সেখানে হ্রাস পাচ্ছে এবং উগ্র ইভাঞ্জেলিকালিজম সে জায়গা দখল করছে। এই উগ্র চেতনার নাগরিকেরা শহুরে এলাকা থেকে তাদের মতাদর্শ গ্রামাঞ্চলে সঞ্চারিত করেছে। প্রতিটি সমাজের মতো ব্রাজিলেও এখন লিঙ্গ ও জাতিগত পরিচয়ের ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ হচ্ছে। ইতিবাচক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া অভিজাতদের মধ্যে স্পষ্ট।

এই ধারাকে বলসোনারো ত্বরান্বিত করেছেন। তিনি যদি এই দফায় জিতে যেতেন, তাহলে সেই উগ্র চেতনা আরও তীব্র হতো। তাহলে ব্রাজিল আরও ভয়াবহ জায়গায় চলে যেত। লুলার জয় আপাতত সেই জায়গা থেকে ব্রাজিলকে ফিরিয়ে এনেছে, এমনটা বলা যায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • প্রতাপ ভানু মেহতা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর কন্ট্রিবিউটিং এডিটর