একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প সাধারণত আমরা দেখি বাইরে থেকে—সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে, কখনো সাফল্যের ঘোষণায়। কিন্তু সেই সাফল্যের ভেতরের গল্পটি অনেক সময়ই আমাদের অজানা থেকে যায়। সেই ভেতরের গল্পের কেন্দ্রেই থাকে মানুষ।
যে মানুষটি প্রতিদিন সময়মতো অফিসে আসেন, আবার কোনো দিন একটু দেরি হলে অস্বস্তি বোধ করেন। যে মানুষটি নিজের কাজ শেষ করে নিশ্চিন্ত হতে চান, আবার কোনো অসম্পূর্ণ কাজ মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরেন। যে মানুষটি প্রশংসা পেলে হয়তো প্রকাশ করেন না, কিন্তু সেটি তাঁকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। আবার অবহেলা পেলে চুপচাপ নিজেকে গুটিয়ে নেন। এই নিঃশব্দ ওঠানামার ভেতর দিয়েই একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন গড়ে ওঠে, আবার কোথাও কোথাও ভেঙেও পড়ে।
২০ মে বিশ্ব মানবসম্পদ দিবস। ২০২৬ সালের এই দিনে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, আমাদের নতুন করে ফিরে দেখা দরকার—আমরা কি সত্যিই মানুষকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছি, নাকি এখনো কাঠামো আর প্রক্রিয়ার ভেতরেই আটকে আছি?
মানুষ কি কেবল একটি ভূমিকা?
আমরা অনেক সময় মানুষকে তাঁর কাজ দিয়ে বিচার করি। কে কোন পদে আছেন, কী দায়িত্বে আছেন—এই পরিচয়টাই যেন যথেষ্ট বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু একজন মানুষ কি শুধু তাঁর পদবি? তিনি অফিসে আসেন একজন পেশাজীবী হিসেবে, তবে তাঁর ভেতরে থাকে আরও অনেক কিছু—অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা, ভয়, আত্মসম্মান ও স্বপ্ন। এই পুরো মানুষটিকে না বুঝে শুধু তাঁর কাজটুকু প্রত্যাশা করলে, আমরা আসলে তাঁর সম্পূর্ণতার একটি অংশই গ্রহণ করি। এই জায়গাতেই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—আমরা কি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি, নাকি তাঁকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখছি?
নীতিমালা আছে, কিন্তু বিশ্বাস কোথায়?
বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই এখন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি হয়েছে। নীতিমালা আছে, প্রক্রিয়া আছে, মূল্যায়নের নিয়ম আছে। তবু কোথাও যেন একটা শূন্যতা থেকে যায়। কারণ, নীতিমালা কাগজে লেখা যায়, কিন্তু বিশ্বাস তৈরি করা যায় না কোনো নির্দেশনায়। বিশ্বাস তৈরি হয় সময় নিয়ে, আচরণের মাধ্যমে।
একজন কর্মী যদি দেখেন—কথায় এক, কাজে আরেক—তাহলে তাঁর ভেতরে ধীরে ধীরে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব কখনো হঠাৎ করে চোখে পড়ে না। কিন্তু একসময় সেটিই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
সংস্কৃতি: যা ধরা যায় না, কিন্তু টের পাওয়া যায়
একটি প্রতিষ্ঠানে ঢুকেই অনেক সময় বোঝা যায়—সেখানকার পরিবেশ কেমন। কেউ কিছু না বললেও বোঝা যায়—মানুষ এখানে স্বস্তিতে আছে, নাকি সতর্ক। কথা বলার জায়গা আছে, নাকি চুপ থাকাই নিরাপদ। এই অনুভূতিটাই সংস্কৃতি। এটি তৈরি হয় ছোট ছোট আচরণে—কেউ কথা বললে তাঁকে থামানো হলো, নাকি তাঁর কথাটা শোনা হলো। কেউ ভুল করলে তাঁকে দোষ দেওয়া হলো, নাকি তাঁকে শেখার সুযোগ দেওয়া হলো—এই সবকিছু মিলেই একটি অদৃশ্য কাঠামো তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের গতি নির্ধারণ করে।
কাজের পেছনের মানুষটি
বিশেষ করে গণমাধ্যমের মতো জায়গায় কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার মনে হয়—কাজের মান কেবল দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে মানুষের ভেতরের অবস্থার ওপরও। এখানে প্রতিটি লেখা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি উপস্থাপনার পেছনে থাকেন একজন মানুষ। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর দায়বদ্ধতা, তাঁর সাহস—সবকিছু মিলে তৈরি হয় কাজের প্রকৃত মান। একজন মানুষ যদি নিজের কাজে অর্থ খুঁজে পান, ভিন্ন এক নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেন। আর যদি সেটা না পান, তখন একই কাজ ধীরে ধীরে যান্ত্রিক হয়ে যায়।
তাই এখানে কাজের পরিবেশ বলতে শুধু কর্মঘণ্টা বা নিয়ম নয়; এটি একটি অনুভূতি—আমি কি এখানে নিজের মতো থাকতে পারছি? আমার কথা কি এখানে গুরুত্ব পাচ্ছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করে দেয়—একজন মানুষ তাঁর সেরাটা দেবেন কি না।
প্রযুক্তির সময়, মানুষের প্রয়োজন
প্রযুক্তি আমাদের কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে—এটি এখন বাস্তবতা। অনেক কাজ আগের তুলনায় সহজ ও দ্রুত হচ্ছে, এমনকি কিছু কাজ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। সেটা হলো মানুষের প্রয়োজনীয়তা। কারণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে, সংকট মোকাবিলায় কিংবা নতুন কিছু কল্পনা করার ক্ষেত্রে মানুষের অনুভূতি, বিচারবোধ ও অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি পথ দেখাতে পারে, কিন্তু কোন পথে এগোতে হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু মানুষই। প্রযুক্তি গতি দেয়, আর মানুষ সেই গতিকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। আগামী দিনের সফল পথচলা তাই প্রযুক্তি ও মানুষের এই সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করবে।
দূরত্ব বাড়ছে, নাকি কমছে?
কাজের ধরন বদলে গেছে। এখন একই দলের সদস্যরা ভিন্ন শহরে, ভিন্ন পরিবেশে কাজ করছেন। এই পরিবর্তন আমাদের নতুন ধরনের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে এনেছে—আমরা কি সত্যিই একে অন্যের আরও কাছাকাছি আসছি, নাকি অজান্তেই দূরে সরে যাচ্ছি? এই দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিকও হতে পারে। আর এখানেই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—কীভাবে দূরত্বের মধ্যেও সম্পর্ক তৈরি করা যায়।
ক্লান্তি, চাপ—অদৃশ্য বাস্তবতা
একজন কর্মী প্রতিদিন তাঁর কাজের পাশাপাশি নিজের জীবনের নানা বাস্তবতা বয়ে নিয়ে চলেন। আমরা তাঁর কাজটা দেখি, কিন্তু তাঁর ক্লান্তি দেখি না। আমরা তাঁর ফলাফল দেখি, কিন্তু তাঁর ভেতরের লড়াই দেখি না। এই অদৃশ্য বাস্তবতাকে স্বীকার না করলে, একটি প্রতিষ্ঠান কখনোই দীর্ঘ মেয়াদে শক্ত ভিত্তি পায় না। মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া মানে শুধু তাঁর কাজকে মূল্যায়ন করা নয়; তাঁর অবস্থাকেও বোঝা।
নেতৃত্বের স্পর্শ
একজন নেতা একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরিচালনা করেন না; তিনি সেটির ভেতরের আবহ তৈরি করেন। তাঁর একটি আচরণ, একটি সিদ্ধান্ত, এমনকি একটি নীরবতাও বার্তা বহন করে। যে নেতা তাঁর সহকর্মীদের মানুষ হিসেবে দেখেন, তাঁদের কথা শোনেন, তাঁদের ভুলকে শেখার সুযোগ দেন—তিনি একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেন। এই নিরাপত্তার মধ্যেই মানুষ তাঁর সেরাটা দিতে পারেন।
আমরা কোথায় যেতে চাই?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দাঁড়ায়—আমরা কেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই? এমন একটি কর্মপরিবেশ, যেখানে মানুষ নিজেকে আড়াল করে রাখবে না; যেখানে কাজ শুধু দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, বরং একটি অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতা; যেখানে সাফল্যের মানদণ্ড শুধু অর্জনে নয়, মানুষ গড়ে ওঠার মধ্যেও নিহিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ভাবনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও মূল্যবান সম্পদ—দুটিই আমাদের মানুষ।
শেষ কথা
বিশ্ব মানবসম্পদ দিবস আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়—প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে মানুষ দিয়ে। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের প্রতিশ্রুতি খুব বড় কিছু হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকুই যথেষ্ট—আমরা মানুষকে গুরুত্ব দেব।
সিদ্ধান্তটি ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার মানুষই।
মো. শামীম খান মানবসম্পদ পেশাজীবী