হামে শিশুর মৃত্যুর ব্যর্থতা কার—সত্যটা কেন জানা দরকার

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুর সংখ্যা কমছে নাফাইল ছবি: প্রথম আলো

হাম কোনো অচেনা রোগ নয়। এটি এমন এক রোগ, যা টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শিশু টিকাদান কর্মসূচির জন্য পরিচিত ছিল। সেই দেশেই এখন হামে শত শত শিশুর মৃত্যু আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এই শিশুরা কেন সুরক্ষা পেল না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু একটি সরকার, একটি মন্ত্রণালয় বা একটি সংস্থাকে দায়ী করলেই চলবে না। কারও পক্ষেই এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, একটি শিশুর মৃত্যু কখনো শুধু পরিসংখ্যান নয়, সেটি একটি পরিবার ভেঙে যাওয়ার গল্প। এটি রাষ্ট্রের কাছে এক নীরব অভিযোগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ২৩ এপ্রিল জানায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী পাওয়া যায়।

পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী ছিল ২ হাজার ৯৭৩ জন। এই সময়ে ১৬৬টি সন্দেহভাজন হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু এবং ৩০টি নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়। সংস্থাটি আরও জানায়, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ও দেশের ৮টি বিভাগেই। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

আরও পড়ুন

এরপর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ মে নাগাদ নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৮১-এ পৌঁছায়। এর মধ্যে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ছিল ৮০টি ও সন্দেহভাজন মৃত্যু ৪০১টি। নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৭ এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৮৫৬।

এই সংকট কেন তৈরি হলো তার কিছু কারণ এখন মোটামুটি স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের আওতা কমে যাওয়া, ২০২৪-২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলা টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিতভাবে দেশব্যাপী অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এখানে আগের সরকারগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। যদি ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি না হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রশ্ন আগের প্রশাসনের দিকেও যায়।

আরও পড়ুন

যদি শহরের বস্তি, দুর্গম এলাকা, দরিদ্র পরিবার ও টিকাবঞ্চিত শিশুদের কাছে নিয়মিত সেবা পৌঁছানো না গিয়ে থাকে, তাহলে সেটিও দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত দুর্বলতা। জনস্বাস্থ্যে অর্জন ধরে রাখতে হয় প্রতিদিন। একসময় সাফল্য ছিল বলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে, এমন ধারণা বিপজ্জনক।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়ও গুরুতরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ, টিকার ঘাটতি ও ক্রয়প্রক্রিয়ার বিলম্বের প্রশ্নটি সরাসরি তাদের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। টিকা কোনো সাধারণ পণ্য নয়, এটি কিনতে আগাম পরিকল্পনা লাগে, অনুমোদিত উৎপাদক লাগে, ঠান্ডা সরবরাহব্যবস্থা লাগে, আন্তর্জাতিক পরিবহন লাগে এবং সময় লাগে।

তাই টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের চিন্তা থাকলেও প্রথম শর্ত হওয়া উচিত ছিল, শিশুদের নিয়মিত টিকা সরবরাহ যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়।

আরও পড়ুন

১ এপ্রিলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের একটি কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এর ফলে কার্যপরিকল্পনার মাধ্যমে টিকা কেনার পথও বন্ধ হয়ে যায়।

পরে এক পর্যায়ে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে সরাসরি টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় আপত্তি জানালে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্তে ফিরে আসা হয়।

এই আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় নষ্ট হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনলে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ হয় বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে ১২ শতাংশ পরিবহন খরচ এবং ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সেবা ফি বলা হয়।

এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর ব্যাখ্যাও জরুরি। ইউনিসেফের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশের জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির টিকার ক্ষেত্রে তাদের হ্যান্ডেলিং ফি ৪ শতাংশ।

তারা বলে, এই ফি সরাসরি ও পরোক্ষ ব্যয় মেটানোর জন্য নেওয়া হয়। তাই ১৭ দশমিক ৫ শতাংশের হিসাবটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা দরকার। পরিবহন খরচ কি আলাদা ছিল? সেবা ফি কত ছিল?

আরও পড়ুন

সরাসরি কিনলে একই পরিবহন, ঠান্ডা সরবরাহ এবং মাননিয়ন্ত্রণের খরচ কত হতো? এসব প্রশ্নের উত্তর নথিসহ প্রকাশ করা উচিত।

ইউনিসেফের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফ বাংলাদেশে শুধু বাইরের দর্শক নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করেছে। টিকা সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, ঝুঁকি যোগাযোগ এবং জরুরি টিকাদান অভিযানে তাদের ভূমিকা আছে।

৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সরকার ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সহায়তায় ৩০টি উপজেলায় ১২ লাখের বেশি শিশুকে লক্ষ্য করে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু করে।

পরে তা ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করার কথা বলা হয়। কিন্তু ইউনিসেফের ভূমিকা একদিকে সহায়ক হলেও অন্যদিকে তাদের কাছেও জবাবদিহি চাওয়া যায়। কারণ, তারা যদি আগেই বিপদের সংকেত দেখে থাকে, তাহলে তারা কখন, কাকে, কী ভাষায় সতর্ক করেছিল, তা জানা দরকার।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা সরকারকে ৫ থেকে ৬টি চিঠি দিয়েছেন এবং প্রায় ১০টি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে টিকাঘাটতির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি আরও বলেন, ১০ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে ধারাবাহিক সতর্কতা বজায় রাখার একটি চেষ্টা, প্রথম সতর্কবার্তা নয়।

এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুতর। যদি সত্য হয়, তাহলে বোঝা যায়, বিপদের সংকেত আগেই ছিল, কিন্তু এই দাবিও শুধু বক্তব্য হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না। ইউনিসেফের প্রতিটি চিঠির তারিখ, প্রাপক, বিষয়, ভাষা ও পরবর্তী অনুস্মারক প্রকাশ করা দরকার।

চিঠিতে কি স্পষ্টভাবে সম্ভাব্য হাম প্রাদুর্ভাবের কথা বলা হয়েছিল, নাকি সাধারণ টিকাঘাটতির কথা বলা হয়েছিল? কোন মন্ত্রণালয় বা কোন উপদেষ্টার দপ্তর তা পেয়েছিল? কোনো লিখিত জবাব দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব না জানলে পূর্ণ সত্য জানা যাবে না।

সরকারের পক্ষ থেকেও ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, ইপিআই কর্মসূচির কোনো টিকা নতুন পদ্ধতিতে কেনা হয়নি এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করা হয়নি। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা বাড়াতে ভবিষ্যতের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশের দরকার সত্য। প্রতিশোধের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য। কারণ, এই শিশুদের মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের কাছে শুধু একটি অধিকার চেয়েছিল, সময়মতো টিকা পাওয়ার অধিকার। সেই অধিকার যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসন, রাজনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। একদিকে ইউনিসেফ বলছে, সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ও ক্রয়পদ্ধতির সিদ্ধান্তে দেরি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি পক্ষ বলছে, ক্রয়ব্যবস্থা বদলানো হয়নি। এই বিরোধ রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মেটানো যাবে না। মেটাতে হবে নথি দিয়ে।

আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কোনো সরকার যদি খরচ কমাতে চায়, সেটি অযৌক্তিক নয়। জনগণের টাকা সাশ্রয় করা একটি দায়িত্ব। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে সাশ্রয়, স্বচ্ছতা ও সময়মতো সরবরাহকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

সরাসরি কেনা কম খরচের হতে পারে। কিন্তু যদি সেই পথে যেতে গিয়ে কয়েক মাস সময় নষ্ট হয়, টিকা মজুত শেষ হয় এবং শিশু মারা যায়, তাহলে সেই সাশ্রয় আর সাশ্রয় থাকে না।

ইউনিসেফও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তারা যদি বলে যে তারা লাভ করে না, তাহলে তাদের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত চুক্তি, ফি কাঠামো, পরিবহন খরচ, প্রাক্–অর্থায়নের পরিমাণ এবং সরকারের কাছে পাঠানো সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। স্বচ্ছতা শুধু সরকারের কাছ থেকে নয়, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত।

এই সংকটের বিচার করতে হলে দায় ভাগ করে দেখতে হবে। আগের সরকারগুলোকে জবাব দিতে হবে, কেন নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক তৈরি হলো এবং কেন দেশব্যাপী অতিরিক্ত কর্মসূচি নিয়মিত হলো না।

অন্তর্বর্তী সরকারকে জবাব দিতে হবে, টিকাঘাটতির সময়ে ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং কেন সময়মতো টিকা দেশে এল না। নতুন সরকারকেও জবাব দিতে হবে, জরুরি ব্যবস্থা কত দ্রুত ও কত কার্যকরভাবে নেওয়া হয়েছে। আর ইউনিসেফকে জবাব দিতে হবে, তারা কত আগে, কত স্পষ্টভাবে এবং কত জোরালোভাবে সতর্ক করেছিল।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো একটি স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্ত। সেই তদন্তে দেখতে হবে, কখন টিকার মজুত নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যায়; কে তা জানত; কোন চিঠি কবে পাঠানো হয়েছিল; কোন বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল; অর্থ ছাড়ে দেরি হয়েছিল কি না; সরাসরি ক্রয় ও ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয়ের তুলনামূলক খরচ কত ছিল এবং কোন সিদ্ধান্তের কারণে শিশুদের টিকা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে।

বাংলাদেশের দরকার সত্য। প্রতিশোধের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য। কারণ, এই শিশুদের মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের কাছে শুধু একটি অধিকার চেয়েছিল, সময়মতো টিকা পাওয়ার অধিকার। সেই অধিকার যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসন, রাজনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

হাম আমাদের শুধু রোগের কথা মনে করিয়ে দেয়নি, এটি দেখিয়ে দিয়েছে জনস্বাস্থ্যে দেরি মানে মৃত্যু হতে পারে। একটি চিঠি দেরিতে পড়া, একটি ফাইল দেরিতে সরানো, একটি ক্রয়াদেশ দেরিতে দেওয়া—এসব প্রশাসনিক ঘটনা কাগজে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর মূল্য দিতে হয় শিশুদের জীবন দিয়ে।

যে শিশুরা মারা গেছে, তাদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু সত্য জানা গেলে ভবিষ্যতের শিশুদের বাঁচানো যাবে। সেই সত্য জানার অধিকার বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের আছে।

  • ড. আবু মোহাম্মদ শাকিল ফয়জুল্লাহ, জনসংযোগ গবেষক
    ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র।
    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব।