আজ আলোচনার বিষয় সংসদ সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, অন্য কাজের হিসাব। সম্প্রতি কয়েকজন সংসদ সদস্যের কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। মূলধারার গণমাধ্যমে তাঁরা শিরোনাম হচ্ছেন।

প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘১৬ জুলাই বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার একপর্যায়ে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে কিলঘুষি মারেন।’

একজন জনপ্রতিনিধি কিলঘুষি মেরেছেন আরেকজন জনপ্রতিনিধিকে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অন্য দলের হলে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর মুখ সহজে বন্ধ করা যেত। কিন্তু দুজনই আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।

প্রতিবাদে উপজেলা চেয়ারম্যানের সমর্থকেরা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঝাড়ু নিয়ে মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন। অবরোধ করা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, এ সময় মহাসড়কের উভয় পাশে যানজট দেখা দেয়।

এর আগে রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধর করার অভিযোগ আসে। গণমাধ্যমে এ খবর ছাপা হওয়ার পর সংসদ সদস্যকে পাশে বসিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, ঈদ উপলক্ষে কয়েকজন অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সেখানে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে ওই অধ্যক্ষ আহত হয়েছেন।

ওমর ফারুক চৌধুরী তাঁর গায়ে হাত তোলেননি। এরপরই রাজশাহীর সেই অধ্যক্ষের মারধরের বিবরণসংবলিত অডিও ফাঁস হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ও সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আখতারুজ্জামান অডিওটি সত্য বলে দাবি করেছেন।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা অন্য কারণে আর কত মানুষ সংসদ সদস্যদের হাতে মার খাবেন। সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। নিজেদের এলাকার উন্নয়নে সহায়তা করা। জনগণের সেবা করা। কিন্তু নিজ এলাকার ভিন্নমতের কাউকে দেখলেই তাঁদের হাত নিশপিশ করে কেন? আইনপ্রণেতাদের কাছে আইনের ভাষার চেয়ে কিলঘুষি মারা কেন প্রিয় হবে?

আখতারুজ্জামান জানান, তদন্ত কমিটির প্রধান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন তাঁর মুঠোফোনে কল করে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁকে ফোনালাপে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা তাঁকে যা যা বলেছেন, তা বিস্তারিত বলেছেন। এ ছাড়া দেখা করতে গিয়ে আঘাতের যে চিহ্নগুলো দেখেছিলেন, তা-ও বলেছেন।

কলেজ অধ্যক্ষকে মারধর করার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলনে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেছেন, ‘ঘটনা ঘটেছে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার সঙ্গে আমার। এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান কেন কথা বলছেন, তা বুঝতে পারছি না। তিনি তো এর কোনো অংশ নন।’

ওমর ফারুক চৌধুরীর কথায় মনে হয়, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা কেবল বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মুখ বন্ধ করতে চান না। নিজ দলের নেতা-কর্মীরাও যাতে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু না বলেন, সেই ব্যবস্থাও তাঁরা করে রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সুবিধা হলো কেউ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা অন্য কোনো নেতা সম্পর্কে কথা বললেই তাঁকে দুর্নীতিবাজ, অনুপ্রবেশকারী, হাইব্রিড ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি কতটা সহিংস হতে পারে, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ তার একটি উদাহরণ হিসেবে থাকবে।

সেখানে অবশ্য সংসদ সদস্যের চেয়ে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র মির্জা আবদুল কাদেরের দাপটই বেশি দেখেছে দেশবাসী। তিনি সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে নোয়াখালীর সংসদ সদস্যরা পেছনের দরজা দিয়ে পালানোরও সুযোগ পেতেন না। তাঁর ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের হস্তক্ষেপে আপাতত সেখানে ‘যুদ্ধবিরতি’ চলছে।

এর আগে একাধিকবার প্রথম আলোয় খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান। কথায় কথায় মানুষের গায়ে হাত তোলা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যাঁকেই তাঁর মতের বিরোধী ভাবেন, তাঁকেই মারেন। এমনকি আদালত চত্বরেও মারধরের ঘটনা ঘটেছে।

আরেক সংসদ সদস্য ছিলেন আবদুর রহমান ওরফে বদি। কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় মাদক ব্যবসার প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। সংসদ সদস্য থাকাকালে তাঁর এলাকায় প্রকৌশলী থেকে শুরু করে শিক্ষককে লাঞ্ছিত ও মারধর করেছিলেন তিনি। গত রোজায় ইফতারের আগে দলীয় সভা চলাকালে প্রকাশ্যে তিন নেতাকে মেরেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য না হলেও তাঁর স্ত্রী সংসদ সদস্য। টাঙ্গাইলের আরেক সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা খুনের মামলা চলমান।

এই সাবেক সংসদ সদস্য হলেন আমানুর রহমান খান। এবার তাঁর বাবা সংসদ সদস্য হয়েছেন। আওয়ামী লীগ নানা অভিযোগে গত নির্বাচনে যাঁদের মনোনয়ন দিতে পারেনি, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। কিন্তু এই সাবেকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তা–ও রহস্যজনকভাবে থমকে আছে। এই থমকে যাওয়া মামলা কবে নিষ্পত্তি হবে?

অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা অন্য কারণে আর কত মানুষ সংসদ সদস্যদের হাতে মার খাবেন। সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। নিজেদের এলাকার উন্নয়নে সহায়তা করা। জনগণের সেবা করা। কিন্তু নিজ এলাকার ভিন্নমতের কাউকে দেখলেই তাঁদের হাত নিশপিশ করে কেন? আইনপ্রণেতাদের কাছে আইনের ভাষার চেয়ে কিলঘুষি মারা কেন প্রিয় হবে? যে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, সাত দশক ধরে আন্দোলন–সংগ্রাম করে আসছে, সেই দল কি এর চেয়ে উত্তম কোনো প্রার্থী খুঁজে পায় না?

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন