ইসলাম শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা এবং অধিকার সম্পর্কে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘অতঃপর যখন নামাজ সম্পন্ন করা হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।’ (সুরা-৬২ জুমুআহ, আয়াত: ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ফরজ ইবাদতের পর হালাল উপার্জন করাও ফরজ দায়িত্ব।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৮৩৬৭; মিশকাত: ২৭৮১) তিনি আরও বলেন, ‘হালাল উপার্জনের মধ্যে সেই উপার্জন সর্বোত্তম, যা নিজ কায়িক শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয়।’ (মুসলিম)
রমজানে শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমগ্রহীতার কর্তব্য সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আল্লাহ যার ভাইকে তার দায়িত্বে রেখেছেন, সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, সে যা পরিধান করবে তাকেও তা পরিধান করাবে। তাকে এমন কষ্টের কাজ
দেবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। আর যদি কোনো কাজ কঠিন হয়, তবে সে কাজে তাকে সাহায্য করবে।’ (মুসলিম, মিশকাত)
সব নবী–রাসুলই কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। দ্বিতীয় আদম হজরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি বা সুতারের কাজ করতেন। হজরত ইদরিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন। হজরত সুলাইমান (আ.)–এর পিতা নবী ও সম্রাট হজরত দাউদ (আ.) লৌহশিল্প বা কামারের কাজ করতেন। হজরত শুয়াইব (আ.)–এর খামারে হজরত মুসা (আ.) আট থেকে দশ বছর কাজ করেছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও হজরত খাদিজা (রা.)–এর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন। (বিশ্বনবী, গোলাম মোস্তফা)
ইবাদতের জন্য বিশেষায়িত রমজান মাসে মালিক বা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো শ্রমিকের প্রতি দয়া করা, তার কাজের চাপ কমিয়ে তাকে ইবাদতে সহায়তা করা। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে তার কাজের লোকের কাজ কমিয়ে সহজ করে দেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাব সহজ করে দেবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো তার ঘাম শুকানোর আগেই।’ (ইবনে মাজাহ; সহিহ আলবানি)
শ্রমিকের মজুরি যথাসময়ে প্রদানের বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তি পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম বা অবিচার।’ (বুখারি: ২২৮৭; মুসলিম)
ইসলামি বিধানমতে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি হলো তাঁর মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করা—যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। ক্ষতিগ্রস্ত বা অক্ষম শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা সম্পদ রেখে যাবে, তা তাদের উত্তরাধিকারীরা পাবে; আর যারা অসহায় পরিবার-পরিজন ও দায়দেনা রেখে যাবে, তা আমাদের (সরকার ও মালিকপক্ষের) দায়িত্ব।’ (বুখারি, মুসলিম ও বায়হাকি)
শ্রমিকদের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যারা মালিকের হক (দায়িত্ব) আদায় করার পাশাপাশি আল্লাহর হক (ইবাদত)–ও পালন করে, তারা দ্বিগুণ সওয়াব পাবে।’ (বুখারি ও মুসলিম; মিশকাত)
মালিকের দায়িত্ব হলো শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁর মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজন পূরণ করা এবং ইবাদত-বন্দেগির সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষত রমজান মাসে রোজা, তারাবিহ, ইফতার ও সাহ্রির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। রমজান শেষে শ্রমিকেরা যেন পরিবার-পরিজনসহ ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। এ জন্য ঈদের আগেই বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম