পাকিস্তানকে কেন আর ‘কৌশলগত শত্রু’ মনে করছে না ভারত

স্বাধীনতার আট দশক পরেও ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নিফাইল ছবি: রয়টার্স

দশকের পর দশক পাকিস্তান ছিল ভারতের কৌশলগত ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৪৮ সালের প্রথম যুদ্ধ থেকে শুরু করে বারবার সীমান্ত সংকট ও বড় সন্ত্রাসী হামলা পর্যন্ত নয়াদিল্লি তার আঞ্চলিক অবস্থান প্রায় পুরোপুরি ইসলামাবাদকে ঘিরেই নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এখন বাস্তবতা আলাদা।

এমন নয় যে দেশ দুটির বিরোধ মিটে গেছে, বরং ভারত মনে করছে, পাকিস্তান আর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পৃক্ততার যোগ্য নয়।

প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় এসেছে কৌশলগত উদাসীনতা। অর্থাৎ আলোচনা নয়, বরং প্রতিরোধ, শাস্তি ও দূরত্ব বজায় রাখাই এখন নীতি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা হামলা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামের কাছে সন্ত্রাসী হামলার পর যে সীমিত ভারত পাকিস্তান মুখোমুখি সংঘাত হয়েছে, তা এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ।

আরও পড়ুন

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় আধা সামরিক সদস্য নিহত হন। জবাবে পাকিস্তানের ভেতরে বালাকোটে তথাকথিত সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে বিমান হামলা চালায় ভারত। ১৯৭১ সালের পর এ ধরনের পদক্ষেপ ছিল নজিরবিহীন। বালাকোট হামলার মাধ্যমে ভারত দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের অলিখিত সীমা অতিক্রম করতেও তারা প্রস্তুত এবং সেটি করতে দীর্ঘ আলোচনার পথে হাঁটার প্রয়োজন নেই। পুলওয়ামা ছিল সংযমের অবসান।

নয়াদিল্লিতে এ ঘটনার পর দুটি ধারণা আরও জোরালো হয়। এক. পাকিস্তানের পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। দুই. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকাশ্যে সংযমের আহ্বান জানালেও শেষ পর্যন্ত ভারতের পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে মেনে নেবে। ফলে উত্তেজনা বাড়লেও তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা জুড়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

বহু বছরের সংলাপও যে সংকট ঠেকাতে পারেনি বা জঙ্গি সহিংসতা কমাতে পারেনি, এই যুক্তি থেকে উদাসীনতাকেই তুলনামূলকভাবে কার্যকর মনে করা হয়।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালের এপ্রিলের পেহেলগাম হামলা এ অবস্থান টেকসই কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। বেসামরিক মানুষ ও পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে, পাকিস্তান তা অস্বীকার করে। ৭ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত কোনো প্রকাশ্য সংলাপের আহ্বান জানায়নি, মধ্যস্থতার অনুরোধ করেনি এবং ঘটনাকে আলোচনার প্রয়োজনীয় সংকট হিসেবে তুলে ধরেনি। সমাধানের বদলে লক্ষ্য ছিল, বরং শাস্তি দেওয়া ও দৃঢ় বার্তা দেওয়া। সীমিত লক্ষ্য পূরণ হলেই তারা থেমে যায়।

মধ্যস্থতা প্রসঙ্গেও একই মনোভাব দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছে, তখন ভারত তা নাকচ করে। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে আলোচনার মাধ্যমে কোনো যুদ্ধবিরতি হয়নি, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পর সামরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংঘাত থামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যস্থতা মেনে নিলে পাকিস্তানকে আবার সমমর্যাদার কূটনৈতিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা হতো, যা ভারত এখন আর চায় না।

ভারত হয়তো পাকিস্তানের গুরুত্ব কমিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু উদাসীনতা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এটি একটি কৌশলমাত্র। এটি সংকটকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামোগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকি দূর করে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ে প্রচলিত ধারণা থেকেও এই অবস্থান ভিন্ন। ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করেন, উত্তেজনার সিঁড়ি সাধারণত যেভাবে কল্পনা করা হয়, বাস্তবে তা আরও দীর্ঘ। পাকিস্তানের পারমাণবিক হুমকি মূলত চাপ সৃষ্টি ও বার্তা দেওয়ার কৌশল, তাৎক্ষণিক ব্যবহারের ইঙ্গিত নয়। তাই সীমিত প্রচলিত সামরিক হামলার মাধ্যমে উত্তেজনার সীমা পরীক্ষা করা যায় পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। প্রতিরোধ নীতি বাতিল হয়নি, তবে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে—পাকিস্তানকে আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামলানো হবে।

এই পুনর্বিন্যাসে চীন গুরুত্বপূর্ণ। গত এক দশকে হিমালয় সীমান্ত ও ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে বেইজিংই ভারতের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। এই অগ্রাধিকারের তালিকায় পাকিস্তান এখন আর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ হলেও গৌণ সমস্যা। সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ক্রমেই চীন মোকাবিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ সংকট কূটনীতি এখন অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

উদাসীনতার পেছনে আরেকটি লক্ষ্য আছে। ভারত চায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের সঙ্গে তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রবণতা কমুক। মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান করে ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে গিয়ে ভারত বোঝাতে চায়, পাকিস্তান তার সমমানের কৌশলগত প্রতিপক্ষ নয়। সংকট ব্যবস্থাপনা তারা নিজেরাই করবে, বাইরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

এই মনোভাব সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে অন্য জায়গাতেও প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্টে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে ভারত। পাকিস্তান আপত্তি জানায় এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চায়। ভারত এটিকে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরে এবং ইসলামাবাদের আপত্তি উপেক্ষা করে। উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক চাপের অভাব নয়াদিল্লির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

এমনকি ক্রিকেট কূটনীতিও আজ আর আগের মতো নয়। একসময় দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলেও ক্রিকেট ছিল যোগাযোগের একটি স্বল্প খরচের মাধ্যম। এখন বৈশ্বিক ক্রিকেটের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে ভারত দ্বিপক্ষীয় সিরিজ না খেলে কিংবা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে প্রভাব খাটিয়ে খরচ আরোপ করতে পারে, কিন্তু সরাসরি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততায় যায় না।

আরও পড়ুন

তবে ভারতের এ অবস্থান পাকিস্তানের সামনে বিকল্প সীমিত করে দেয় এবং তাকে অসমমিত কৌশলের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। সামনে যেকোনো সংঘাত এখন ক্রমেই ত্রিমুখী কৌশলগত পরিবেশে ঘটবে, যেখানে চীনের স্বার্থও বড় ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে যখন ইসলামাবাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তানির্ভরতা বেইজিংয়ের ওপর বাড়ছে।

ভারত হয়তো পাকিস্তানের গুরুত্ব কমিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু উদাসীনতা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এটি একটি কৌশলমাত্র। এটি সংকটকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামোগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকি দূর করে না। কৌশলগত উদাসীনতা পরবর্তী সংকট ঠেকাতে পারবে কি না, নাকি শুধু তার ধরন বদলে দেবে, সেটিই এখন বৃহত্তর ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

  • অরিজিৎ মজুমদার যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট থমাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।

*দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত