সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী বহিষ্কার করে তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার দপ্তরে পাঠিয়েছে।
আমাদের জানামতে, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন এক পরিস্থিতিতে অতীতে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবু হেনার সংসদ সদস্য খারিজ করেননি। পরে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করেন, কিন্তু কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই জনাব সিদ্দিকী পদত্যাগ করেন। তাই দল থেকে বহিষ্কৃতদের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা বিরাজমান।
তবে আমরা মনে করি, জনাব ইসলামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার স্পিকার হিসেবে আপনার এবং আপনার নেতৃত্বে গঠিত সংসদ ও সংসদ সদস্য ও সংসদীয় ‘বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র।
অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে দুটি স্থায়ী কমিটির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যার একটি সরকারি হিসাবসম্পর্কিত কমিটি এবং আরেকটি সংবিধানের সংসদীয় বিশেষ অধিকার কমিটি। অর্থাৎ এ দুটি কমিটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো গঠিতও হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় বিশেষ অধিকার কমিটি গঠিত হয়েছে স্পিকারের নেতৃত্বে ১০ সদস্য নিয়ে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মো. নুরুল ইসলাম, জয়নুল আবদিন ফারুক ও নাহিদ ইসলাম।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ সংসদীয় বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি–সম্পর্কিত। এর বিধানাবলি অনুযায়ী সংসদ তার কার্যপ্রণালি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত। সংসদ সদস্যদের বাক্স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ এবং এটিও আদালতের এখতিয়ারের বাইরে। এসব বিষয়ে সুরক্ষা প্রদানের জন্য ৭৮(৫) অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। উল্লেখ্য, সংবিধানের ৭৬(২)(গ)(ঘ) ও ৭৬(৩) অনুচ্ছেদও সংসদীয় বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত।
সংসদীয় বিশেষ অধিকারের ধারণা এসেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে। সংসদীয় বিষয়ে পণ্ডিত এরেসকাইন মে তাঁর বিখ্যাত ট্রিটাইজ অন দ্য ল, প্রিভিলেজেস, প্রসিডিংস অ্যান্ড ইউসেজ অব পার্লামেন্ট গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সংসদের বিশেষ অধিকার হলো কতগুলো স্বতন্ত্র অধিকারের সমষ্টি, যা প্রত্যেক সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এবং সংসদের উভয় কক্ষই (যা আমাদের নেই) উপভোগ করে। এগুলো অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভোগ করা অধিকারের চেয়ে অতিরিক্ত অধিকার এবং এগুলো ছাড়া সংসদ ও সংসদ সদস্যরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাই যদিও বিশেষ অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনের অংশ, তবু এগুলোর মাধ্যমে অনেকটা সাধারণ আইনের আওতা থেকে তাঁদেরকে রেহাই দেওয়া হয়।’
সংসদীয় বিশেষ অধিকারগুলোকে দুই ভাগে বিভাজন করা যায়: কতগুলো এককভাবে সংসদের জন্য প্রযোজ্য এবং অন্যগুলো পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আরও সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, ব্যক্তি সংসদের বেলায় প্রযোজ্য বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির ক্ষেত্রগুলো হলো: (ক) বাক্স্বাধীনতা, (খ) দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার থেকে অব্যাহতি, (গ) জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি (যদিও আমাদের দেশে এটি নেই)’, এবং (ঘ) সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি। এগুলো মূলত দায়মুক্তি–সম্পর্কিত অধিকার এবং এগুলোর ফলে ব্যক্তি সংসদদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ১৭২-১৭৬ ধারায় এসব সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
আমরা আশা করি, মাননীয় স্পিকার তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন এবং প্রয়োজনে তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করবেন, যা সংসদের অন্যান্য সদস্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
পুরো সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও ক্ষমতাগুলো হলো: (ক) শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার অধিকার। কোনো ব্যক্তিকে, এমনকি সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করার বা সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান, দুর্নীতি, অপকর্ম ও অসদাচরণের জন্য সংসদ সদস্যদের বহিষ্কার এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। সংসদের এ ধরনের অধিকারকে শাস্তিমূলক ক্ষমতা বলা হয়। (খ) সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যবস্থাপনা বা কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণসম্পর্কিত ক্ষমতা। (গ) সংসদের উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা। (ঘ) তদন্ত, সাক্ষী ও রেকর্ডপত্র তলব করার ক্ষমতা। আমাদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ২০১-২০৩ ধারায় এ–সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। (ঙ) সাক্ষীদের শপথ প্রদানের ক্ষমতা। আমাদের কার্যপ্রণালি-বিধির ২০৪-২০৫ ধারা এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। (চ) মানহানিকর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন কাগজপত্র প্রকাশ করার ক্ষমতা।
আরও সহজভাবে বোঝার জন্য বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা ও দায়মুক্তির মধ্যে বিভাজন করা আবশ্যক। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারের মতে, ‘নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন বা অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে ক্ষমতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সংসদে যেকোনো কিছু বলার জন্য কোনো সংসদ দায়ী না হওয়ার অধিকারই দায়মুক্তি।’ [বিশেষ রেফারেন্স, অনুচ্ছেদ ১৪৩, এআইআর (১৯৬৫) এসসি ৭৪৫]
আমাদের দেশে সংসদীয় বিশেষ অধিকারের বিষয়টিকে সাধারণত সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধারসম্পর্কিত বলে মনে করেন, তাই এটির প্রযোজ্যতা নেই বললেই চলে, যদিও স্বাধীনতার পর কিছু গণপরিষদ সদস্যের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ হয়েছে, বিশেষত যাঁরা পাকিস্তানিদের সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন। তখন কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিরও।
আমাদের জানামতে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল–সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির একটি নির্দেশনা জারি করা হয়, যার আলোকে ১৯৭২ সালের ১৬ এপ্রিল ১৬ জন সদস্যকে দুর্নীতির অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২২ সেপ্টেম্বর আরও ১৯ জনের গণপরিষদ সদস্যপদ খারিজ করা হয়।
পক্ষান্তরে প্রতিবেশী ভারতে অসদাচরণের অভিযোগে অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের এবং স্থানীয় উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগে ২০০৫ সালে একই সঙ্গে ১১ জন সদস্যকে ভারতীয় লোকসভা ও রাজ্যসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়, যা পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়। রাজা রামপাল বনাম স্পিকার [(২০০৭) ৩ (এসসিসি)] মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ ৪-১ ভোটের ব্যবধানে এ বহিষ্কারাদেশের পক্ষে রায় দেন। উল্লেখ্য, বিশেষ অধিকার-সংক্রান্ত ভারতীয় ও বাংলাদেশে সাংবিধানিক বিধান প্রায় একই।
পরিশেষে, মহান জাতীয় সংসদ বা ‘হাউস অব দ্য পিপল’ সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু এবং সংসদের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর আচরণের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে জনসমক্ষে সংসদের মর্যাদা ও সুনাম ভূলুণ্ঠিত করেছেন।
তাই আমরা আশা করি, মাননীয় স্পিকার তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় বিশেষ অধিকার–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন এবং প্রয়োজনে তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করবেন, যা সংসদের অন্যান্য সদস্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
একই সঙ্গে সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে দ্রুত একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করি। প্রসঙ্গত, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে (৪৮ নম্বর বিষয়) এই আইন প্রণয়নের জন্য জনগণ তাঁদের সম্মতি দিয়েছেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
মতামত লেখকের নিজস্ব
