শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কারণে এভাবে চলতে দেওয়া যায় না

প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা কোথাও দেশে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা যায়নি। যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী হঠাৎ করেই নতুন নতুন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়। ফলস্বরূপ, এ দেশের শিক্ষাকাঠামো একধরনের উদ্ভট রূপ নিয়েছে।

দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে হাতেকলমে শিক্ষার সুযোগ ও পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। দেশের মহামারির মতো সংকটময় মুহূর্তেও সমাধান বা গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বা বিজ্ঞানীদের যুক্ত করা হয় না। অন্যদিকে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়েই চলছে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান। এভাবে এগোলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

দেশে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে নির্যাতন চালানো হয়েছে স্কুলপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বরাবরই অবহেলিত। শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ দুর্বল জায়গা হচ্ছে এর ভিত্তি, অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা অপ্রাসঙ্গিক দায়িত্ব।

জনশুমারি করতে হবে, জরিপ করতে হবে, ভোটের দায়িত্ব পালন করতে হবে, সরকারি পরীক্ষার পরিদর্শনে যেতে হবে, সব দায়িত্বই যেন স্কুলশিক্ষকদের ওপর। যেখানে শিক্ষার্থীদের শেখানো এবং শেখার আগ্রহ তৈরি করাই হওয়া উচিত তাঁদের প্রধান কাজ, সেখানে তাঁদের সময়ের বড় অংশ চলে যায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে।

উন্নত দেশগুলোয় স্কুলশিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতনকাঠামো অত্যন্ত সম্মানজনক। অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা স্কুল শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হন। কিন্তু আমাদের দেশে যেন ধারণা করা হয়, স্কুলে ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। যেন যার আর কিছু করার যোগ্যতা নেই, সে-ই স্কুলে পড়াবে। আর তাই তাঁকে দেওয়া হবে সবচেয়ে কম বেতন। এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্কুলশিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না। অথচ কোনো সরকারই মনে রাখে না যে শিক্ষার ভিত্তি যদি মজবুত না হয়, তবে সেই শিক্ষার্থী বড় হয়ে উদ্ভাবক বা দক্ষ নাগরিক হয়ে উঠবে না।

আরও পড়ুন

আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন প্রায়ই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, পরিবর্তনের পরিকল্পনা করার সময় শিক্ষক, অভিভাবক, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন পেশাজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং পূর্ববর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া জরুরি। কিন্তু অদ্ভুত কারণে এসব মানুষকে যুক্ত করতে সব সরকারেরই অনীহা দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘এক শিক্ষক এক ট্যাব’ উদ্যোগ বিবেচনাধীন। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষায় গেজেট অন্তর্ভুক্তির চেয়ে শিক্ষকের তথা শিক্ষাদানের মানোন্নয়ন মাথায় রেখে বাস্তবায়ন করা উচিত। উল্লেখ্য, পাশ্চাত্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক। সেখানে প্রজেক্টরের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বই পড়া ও হাতেকলমে শেখার অভিজ্ঞতাকে। তাই প্রযুক্তিনির্ভরতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন প্রায়ই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, পরিবর্তনের পরিকল্পনা করার সময় শিক্ষক, অভিভাবক, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন পেশাজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং পূর্ববর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া জরুরি। কিন্তু অদ্ভুত কারণে এসব মানুষকে যুক্ত করতে সব সরকারেরই অনীহা দেখা যায়।

হতাশার মাত্রা আরও বাড়ে যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাকাই। যেখানে–সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের কি সত্যি এত গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন? এত শিক্ষার্থী কি উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত বা উপযুক্ত? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

অপ্রয়োজনীয়ভাবে এত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে চাকরির অপ্রাসঙ্গিক সংকট তৈরি হচ্ছে, হতাশা বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ গ্র্যাজুয়েট সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনও দেখা যায়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি বা প্রকৌশলের মতো বিষয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও চার বছরে তাঁরা চার দিনও ঠিকমতো ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগ পায় না। প্রশ্ন জাগে, যথাযথ অবকাঠামো বা প্রস্তুতি ছাড়াই কেন একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজ্ঞানের বিষয় পড়ানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে?

আরও পড়ুন

জীবনপ্রযুক্তি বিষয়ে যেখানে দেশে চাকরি খুবই সীমিত, সেখানে ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই বিভাগ খোলার অনুমতি দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? গত পনেরো বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার সম্মিলিত গবেষণা উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ খুবই সীমিত। বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা নেই, নেই আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের পর্যাপ্ত সুযোগ। ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট নেই, গবেষণার জন্য নেই যথেষ্ট সহযোগিতা বা উৎসাহ। জীববিজ্ঞান বা প্রকৌশলে বড় উদ্ভাবন বা পেটেন্টের জন্য প্রয়োজন কোটি কোটি টাকার গবেষণা। কিন্তু বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের গড় গবেষণা অনুদান কয়েক লাখ টাকা মাত্র।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও অল্পসংখ্যক গবেষককে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার অনুদান দেয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মূলত চিকিৎসকদের জন্য। এর ফলাফল হিসেবে দেশীয় উদ্ভাবন খুবই সীমিত। এর পাশাপাশি বছরের পর বছর একই গবেষককে ব্যক্তিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বড় অনুদান দেওয়া হয়। সেরা বা উদীয়মান গবেষকদের উৎসাহিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা খুবই দুর্বল।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অসন্তোষের কারণ পাঠদানের মান। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মী নিয়োগের অভিযোগ শোনা যায়। কোথাও কোথাও লিখিত পরীক্ষার নামে চলছে প্রহসন। প্রশ্ন ওঠে, কেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে এভাবে রাজনৈতিকীকরণ করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি সেমিস্টার বা শিক্ষাবর্ষ শেষে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করে। এতে শিক্ষক নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন এবং শিক্ষার্থীরাও তাদের মতামত জানাতে পারে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনীহা অগ্রহণযোগ্য।

ছাত্রসংগঠনগুলোর কাজের ক্ষেত্রও সুনির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন। ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষকদের ওপর চড়াও হওয়া কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা হতে পারে না। এই অসভ্যতা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গন হতে হবে শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আস্থার জায়গা।

হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সরকার ও নতুন শিক্ষামন্ত্রীকে বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে, নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। দেশের মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে দাঁড়াবে নাকি ভেঙে পড়বে, সেই সিদ্ধান্তের সময় এখনই।

  • আদনান মান্নান শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

  • মুশতাক ইবনে আইয়ুব শিক্ষক ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • মো. মাহবুব হাসান শিক্ষক ও গবেষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • মো. শাখিনুর ইসলাম মন্ডল শিক্ষক ও গবেষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকদের নিজস্ব