পাকিস্তানে যে সংকটে পড়ল আসিম মুনির ও শরিফ–ভুট্টো পরিবার

প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি (মাঝে) ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (ডানে) বিশেষ সমাবেশে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের হাতে ফিল্ড মার্শাল ব্যাটন তুলে দেন। ইসলামাবাদ, মে ২০২৫ছবি: পাকিস্তানের সরকারি তথ্যবিবরণী/আল–জাজিরার সৌজন্যে

কিছু রাজনৈতিক বন্দীকে শাসকেরা ভয় পান, কারণ তাঁরা জীবিত। আবার কিছু শহীদকে শাসকেরা ভয় পান, কারণ তাঁরা মৃত। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় এক রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছেন। তাঁর অস্তিত্বই বর্তমান ব্যবস্থাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। আবার কারাগারে তাঁর মৃত্যু হলে সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠতে পারে।

ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সামরিক ছাতার নিচে থাকা পাকিস্তানের দুই বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক পরিবার (শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবার) এখন এ সমস্যার মধ্যেই আটকে পড়েছে।

সর্বশেষ বড় ঘটনা হলো পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত তাঁর নিজের চিকিৎসককে মেডিকেল বোর্ডে রাখার নির্দেশও দিয়েছেন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।

আরও পড়ুন

একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক ব্যবস্থায় এগুলোকে বিশেষ কোনো সুবিধা হিসেবে দেখা হতো না। এগুলো একজন বন্দীর স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক অধিকারকে এমনভাবে সীমিত করা হয়েছে যে একজন বন্দীর চিকিৎসার সুযোগও এখন বড় ধরনের সাংবিধানিক অর্জন বলে মনে হচ্ছে।

সরকার আদালতের রায়ের একটি অংশের বিরুদ্ধে আপিল করার চেষ্টা করায় বিষয়টির অস্বাভাবিক দিক আরও স্পষ্ট হয়েছে। মনে হচ্ছে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যাপক মামলা, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল হয়ে পড়া—সবই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো নিয়েই যেন সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষার প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতির চেয়ে অযৌক্তিক কোনো বিষয় কল্পনা করা কঠিন।

কিন্তু এই অযৌক্তিকতার আড়ালে আসলে রয়েছে ভয়।

ইমরান খানকে কারাগারে রাখার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। সরকারের পরিল্পনা ছিল, তাঁকে জনসভা, টেলিভিশন এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হবে। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা চলবে। তাঁর দলকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেওয়া হবে। নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তাঁকে হারানো কঠিন হলে বিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্রীয় চাপের মাধ্যমে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করা হবে—এটাই ছিল পরিকল্পনা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়েছে উল্টোটা।

রাষ্ট্র একজন মানুষকে বন্দী করেছে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রতীককে আরও শক্তিশালী করেছে।

এটাই এখন মুনিরের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সমস্যা।

তিন বছর ধরে কারাগারে বন্দী ইমরান খান।
ইমরান খানের ইনস্টাগ্রাম

একজন সুস্থ বন্দীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু একজন বন্দীকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখা গেলে সেটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত হয়। আর কোনো বন্দী কারাগারে মারা গেলে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

বিদেশে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে মুনির প্রশংসা পেতে পারেন। তিনি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন। কূটনৈতিক মহলে প্রশংসিত হতে পারেন। পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি অস্থির রাষ্ট্রের অপরিহার্য ব্যবস্থাপক হিসেবেও তাঁকে দেখা হতে পারে।

কিন্তু বিদেশে এই জাঁকজমক দেশের ভেতরের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে। নিজের দেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখতে হয় যে ক্ষমতাকে, তা আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ নয়। বরং এটি নিজের ভয় স্বীকার করে নেওয়ার মতো।

রাজনৈতিক কল্পনা যত সংকুচিত হয়, পদক ও সামরিক মর্যাদার প্রদর্শন তত বড় হয়ে ওঠে।

ইমরান খানকে মুক্তি দেওয়া হলে তিনি আর সেই রাজনীতিক থাকবেন না, যিনি কারাগারে গিয়েছিলেন। কারাগারই তাঁকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। তিনি হবেন আরও বয়স্ক, শারীরিকভাবে দুর্বল এবং আরও কিংবদন্তিতুল্য নেতা। তাঁর হাতে থাকবে গণরাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী একটি যুক্তি। তা হলো একজন মানুষকে জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখতে রাষ্ট্রকে তার পুরো দমনমূলক কাঠামো ব্যবহার করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আর যদি কারাগারেই ইমরান খানের মৃত্যু হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকবে না। তা রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।

মৃত্যু এমন এক সত্তা, যে কোনো করুণা দেখায় না।

একজন জীবিত রাজনীতিককে অস্বীকার করা যায়, সমালোচনা করা যায়, উপহাস করা যায়, দায়ী করা যায়। এমনকি নির্বাচনে তাঁকে হারানোও যায়। কিন্তু একজন মৃত রাজনৈতিক বন্দীকে ঘিরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জটিলতা মুছে যায়। স্মৃতি তাঁকে আরও সরল ও প্রতীকী করে তোলে।

নথি হারিয়ে যেতে পারে। অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কও একসময় গুরুত্ব হারাতে পারে। শেষ পর্যন্ত একটি ছবিই মানুষের মনে থেকে যেতে পারে—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকার পর মারা গেলেন, আর তাঁর সমর্থকেরা পর্যাপ্ত চিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

এমন একটি প্রতিবাদের ব্যানারে রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘ আইনি ব্যাখ্যা বা নানা ফুটনোট বসানো কঠিন।

এ কারণেই মুনিরের ইমরান খানকে জীবিত অবস্থায়ও ভয় পাওয়ার কারণ আছে, আবার মৃত অবস্থায়ও ভয় পাওয়ার কারণ আছে।

একই কারণে শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবারও এ পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

তাঁরা অনির্দিষ্টকাল নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে পারেন না, অথচ যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে তাঁদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাদ পড়েছেন, সেই ব্যবস্থার সুবিধাও নিতে পারেন না।

তাঁদের অবস্থানের মধ্যে একধরনের প্রায় হাস্যকর রাজনৈতিক কপটতা রয়েছে। তাঁরা গণতন্ত্রের কথা বলেন, অথচ এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশ নেন, যার স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিষ্ক্রিয় রাখার ওপর।

তাঁরা বেসামরিক কর্তৃত্বের কথা বলেন, অথচ রাওয়ালপিন্ডির দীর্ঘ ছায়ার নিচেই শাসন করেন। তাঁরা রাজনৈতিক দলের নামকে প্রায় বংশানুক্রমিক সম্পত্তির মতো উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করেন।

দুই পরিবারই এমন একটি ব্যবস্থার রাজনৈতিক ঠিকাদারে পরিণত হয়েছে, যে ব্যবস্থার সমালোচনা তারা মাঝেমধ্যে করে, আবার বারবার সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।

এ কারণেই সুপ্রিম কোর্টের আদেশ শুধু একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার এতটাই সীমিত ও লঙ্ঘিত হয়েছে যে সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিও এখন বিপ্লবী দাবি বলে মনে হচ্ছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কোনো চক্ষুচিকিৎসককে ভয় পায় না।

একটি আত্মবিশ্বাসী সরকার কোনো পরিবারের সদস্যের সঙ্গে একজন বন্দীর সাক্ষাতের বিরোধিতা করে আদালতে যায় না।

একটি আত্মবিশ্বাসী সামরিক প্রতিষ্ঠান ৭৩ বছর বয়সী একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারাগার, মামলা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক সহযোগীদের ওপর নির্ভর করে না।

মুনির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পারেন। শরিফরা মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ভুট্টো-জারদারিরা রাষ্ট্রে নিজেদের বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেন। সম্মিলিতভাবে তাঁদের হাতে রয়েছে সরকারি পদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং দমনমূলক ক্ষমতা।

কিন্তু তাঁদের এমন একটি জিনিস নেই, যা কোনো সরকারি আদেশ, সংবিধান সংশোধন বা নিয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা যায় না। সেটি হলো রাজনৈতিক অর্থ এবং জনগণের কাছে রাজনৈতিক তাৎপর্য।

ইমরান খানকে জীবিত রাখলে সেই রাজনৈতিক তাৎপর্য তাঁদের সামনে বাধা হয়ে দাড়ায়। তাঁকে মুক্তি দিলে সেই রাজনৈতিক শক্তি আবার রাজপথে ফিরে আসতে পারে। আর তাঁকে মরতে দিলে সেই শক্তি তাঁদের সবার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এটি কোনো শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ নয়।

এটি একটি ফাঁদে আটকে পড়ার লক্ষণ।

রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা এমন এক বন্দীকে নিজের হাতে নিয়েছেন, যাঁকে তাঁরা স্বস্তির সঙ্গে মুক্তি দিতে পারেন না, নিরাপদে ভেঙে ফেলতেও পারেন না এবং হারানোর সামর্থ্যও তাঁদের নেই। তাঁর পাশে থাকা দুই রাজনৈতিক বংশেরও একই ভয়াবহ সত্যটি বোঝা উচিত।

যখন কোনো রাষ্ট্র একই সঙ্গে একজন মানুষের হৃৎস্পন্দন এবং তাঁর অনুপস্থিতি—দুটোকেই ভয় পেতে শুরু করে, তখন সেই বন্দী আর ঘরের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি থাকেন না বরং তিনিই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক।

  • জুনায়েদ এস আহমদ আইন, ধর্ম ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ে শিক্ষক ও ইসলামাবাদে অবস্থিত ইসলাম ও উপনিবেশমুক্তি অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া।

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ