এরপরও লোডশেডিংমুক্ত একটি ‘আলোকিত’ জীবনযাপনের স্বপ্ন ছিলই মানুষের। বিশেষ করে দেশ যখন ধীরে ধীরে উৎপাদনমুখী শিল্পের দিকে আরও বেশি ধাবিত হচ্ছিল আর নগরায়ণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং মানুষ আরও বেশি আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেতে থাকল। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদেরও প্রতিশ্রুতি ছিল বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রধানতম অনুষঙ্গ ছিল সেটি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ইশতেহারের পাতাতেই থেকে যেত। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো কিন্তু বিদ্যুৎ না পাওয়ার কাণ্ড এখনো সমালোচিত হয়। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। টানা তৃতীয়বারে ক্ষমতায় থেকে এ বছর মার্চ মাসে বাংলাদেশকে শতভাগ বিদ্যুতের দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। সেই সাফল্য উদ্‌যাপনে রাজধানীর হাতিরঝিলে কনসার্ট, লেজার শো, আতশবাজিরও আয়োজন করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই জাতি ঢুকে গেল আবার ‘অন্ধকার যুগে’! সেই যুগের অভিজ্ঞতা যাঁদের নেই, তাঁদের জন্য যেন এক ‘অদ্ভুত আঁধার’ নেমে এসেছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে সরকারকে। এ মুহূর্তে লোডশেডিংই সমাধান। কী অদ্ভুত কাণ্ড, একসময় ব্যাকরণ বইয়ের রচনায় যেটি ছিল সমস্যা, সেটিই এখন হয়ে গেছে সমাধান! কিন্তু এতেও ‘শর্ষের মধ্যে ভূত’ দেখতি পাচ্ছি আমরা। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ে এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টার লোডশেডিং শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। আগের দিন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহ আমরা এ পরিস্থিতি দেখব। এতে যদি দেখি এক ঘণ্টা আমাদের জন্য যথেষ্ট, তাহলে আমরা সেভাবে রাখব। আর যদি দেখি এক ঘণ্টা পর্যাপ্ত না, তাহলে আরও এক ঘণ্টা অর্থাৎ দুই ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে যাব।’

জ্বালানিসংকটকে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারের রেন্টাল-কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতিকেও এ সংকটের জন্য দায়ী করছেন অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। অনেক আগে থেকে সতর্ক করে আসছিলেন তাঁরা। এদিকে লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করা মানুষের মধ্যে নানা আশঙ্কাও ভর করেছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঋণগ্রস্ত দেশগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্কতা দিয়েছে।

কিন্তু প্রথম দিনই আমরা দেখলাম কী? লোডশেডিংয়ের রুটিন ও সময়সীমা মানতে পারেনি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এদিন ঢাকায় কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন ঘণ্টা আর ঢাকার বাইরে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা এমনকি আরও বেশি সময় পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। যদিও হাজার হাজার অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি ও অফিস ঠিকই লোডশেডিংমুক্ত থেকেছে ডিজেলে জেনারেটর চালিয়ে। ডিজেল বাঁচাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে কতটা সুফল মিলল তাহলে?

রাজধানীতে বিকেল পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের শিডিউল মানা সম্ভব হলেও সন্ধ্যায় ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ‘লন্ডভন্ড’ হয়ে যায় শিডিউল। যেমন রংপুরের পায়রা চত্বর এলাকায় শিডিউল অনুসারে দুপুর বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেই এলাকায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চারবার লোডশেডিং হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যায়। মূলত ঢাকার বাইরে লোডশেডিংয়ের শিডিউল বলতে কিছু ছিল না, যখন খুশি তখন বিদ্যুৎ গেছে। নগর আর গ্রামের মধ্যে সর্বক্ষেত্রেই যে বৈষম্য বিরাজমান, লোডশেডিংয়ের মধ্যেও সেটি প্রকাশ পেল যেন। তবে রাজধানীর বাইরে লোডশেডিং শুধু এখন নয়, অনেকটা নিত্যকার ঘটনাই। এখন জ্বালানিসংকটের সময় সেটি আরও বিপর্যস্ত অবস্থায় চলে গেছে বলতে গেলে। এর মধ্যে বৃষ্টিহীনতার কারণে মানুষের মধ্যে আরও হাহাকার তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের গানের মতো ‘ধূপেতে কলিজা ফাটে’ মানুষের। বৃষ্টির জন্য সেখানে বিশেষ নামাজ ও দোয়াও অনুষ্ঠিত হয়েছে, ‘বৃষ্টির দেবতা’কে সন্তুষ্ট করতে ব্যাঙের বিয়েও দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানিসংকটকে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারের রেন্টাল-কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতিকেও এ সংকটের জন্য দায়ী করছেন অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। অনেক আগে থেকে সতর্ক করে আসছিলেন তাঁরা। ‘উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর’ সরকারের কি সেসব শোনার সময় আছে! এদিকে লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করা মানুষের মধ্যে নানা আশঙ্কাও ভর করেছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঋণগ্রস্ত দেশগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্কতা দিয়েছে। সেই সূত্র ধরে বিবিসির এক প্রতিবেদনে কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও এসেছে। আমরা জানি না, লোডশেডিংয়ের পর আমাদের জন্য আর কোন ‘অদ্ভুত আঁধার’ অপেক্ষা করছে।

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন